× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সাক্ষাৎকার: বাবর আলী

পর্বতে জীবন-মৃত্যু চলে হাত ধরাধরি করে

গোলাম কিবরিয়া

প্রকাশ : ২৪ মে ২০২৬ ১২:৩৮ পিএম

আপডেট : ৩১ মে ২০২৬ ১১:১৫ এএম

পর্বতারোহী বাবর আলী

পর্বতারোহী বাবর আলী

বাবর আলী বাংলাদেশের একজন উদীয়মান পর্বতারোহী, যিনি বিশ্বের ৮,০০০ মিটার উচ্চতার ১৪টি শৃঙ্গের মধ্যে ইতোমধ্যে ৫টিতে সফল অভিযান সম্পন্ন করেছেন। সাহস, অধ্যবসায় এবং অদম্য মানসিক শক্তির মাধ্যমে তিনি দেশের পর্বতারোহণ অঙ্গনে নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। প্রতিকূল আবহাওয়া, ঝুঁকিপূর্ণ পথ এবং কঠিন শারীরিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে তার এই সাফল্য তরুণ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করছে। প্রতিদিন বাংলাদেশের বিশেষ আয়োজনে পর্বতারোহণে তুলে ধরেছেন তিনি তার জীবনদর্শন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন গোলাম কিবরিয়া 

আপনার পর্বতারোহণের শুরুটা কীভাবে? প্রথম অনুপ্রেরণা কোথা থেকে এসেছে?

২০১০ সালের শুরু থেকে ট্রেক করা শুরু করি। বান্দরবানে অনেকগুলো ট্রেকে আমার যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে। তারপর মনে হলো আমি পরের ধাপে যেতে পারি। ২০১৪ সাল থেকে নেপালের বিভিন্ন ট্রেকিং পিক দিয়ে বলা যায় আমার পর্বতারোহণের শুরু। পর্বতারোহণের অনুপ্রেরণা এসেছে আসলে বই পড়া থেকে। ছোটবেলা থেকেই আমাদের বাসায় ভাইবোনদের মাঝে বই পড়ার চল ছিল। বই আমার কাছে ম্যাজিক কার্পেটের মতো। ১ ইঞ্চি মুভ না করেও এই ম্যাজিক কার্পেটে চড়ে লেখকের সঙ্গে পুরো পৃথিবী ঘুরে দেখা যায়। হিমালয় শব্দটা আমি প্রথম শুনি তিব্বতে টিনটিন পড়ে। ছাইচাপা রোমাঞ্চটা বড় হতে হতে উসকে দিয়েছে বিভূতিভূষণের ‘চাঁদের পাহাড়’।

আপনার জীবনের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং অভিযান কোনটি এবং কেন?

আমার কাছে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং অভিযান ছিল অন্নপূর্ণা-১। এর অনেকগুলো কারণ আসলে রয়েছে। অন্নপূর্ণা-১ দশম সর্বোচ্চ পর্বত হলেও টেকনিক্যালি দুনিয়ার অন্যতম কঠিন শৃঙ্গ। পৃথিবীর খুব কম পর্বতারোহীই এই পর্বত চূড়ায় আরোহণ করেছে। অন্নপূর্ণা-১ অভিযানে অনেকগুলো দুর্ঘটনার সম্মুখীন হয়েছি। এই অভিযানেই দুজন শেরপাকে আমরা হারিয়েছি। ৬ হাজার ৪০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত ৩ নম্বর ক্যাম্প থেকে প্রায় ১ হাজার ৭০০ মিটার একটানা আরোহণ করে চূড়ায় পৌঁছাতে হয়েছে। আসা-যাওয়া মিলিয়ে সাড়ে ২৬ ঘণ্টার এই সামিট পুশ শরীরের শেষ শক্তিটুকুরও পরীক্ষা নিয়েছে। অন্নপূর্ণা-১ পর্বতের মতো কঠিন পরীক্ষা আগে আমাকে দিতে হয়নি।

মাউন্ট এভারেস্টের মতো বড় শৃঙ্গে ওঠার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

সব মাউন্টেইনিয়ারের স্বপ্ন থাকে এভারেস্ট চূড়া থেকে পৃথিবী দেখার। আমিও এর ব্যতিক্রম নই। তবে কখনোই মাউন্ট এভারেস্ট আমার ড্রিম মাউন্টেন ছিল না। ২০১৩-এর পর দীর্ঘ বিরতির পর মাউন্ট এভারেস্ট চূড়ায় আরোহণ করা আমার জন্য দারুণ অনুভূতির ছিল।

কখনও কি এমন পরিস্থিতিতে পড়েছেন যেখানে জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন ছিল?

এমন অনেক পরিস্থিতিতে পড়েছি। তবে একটা অভিযানের কথা বলতেই হয়। ভারতের রাজ্য প্রদেশের মাউন্ট রামজাক অভিযানে আমরা গিয়েছিলাম। আমরা ক্যাম্প-১-এ পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পর থেকেই তুষারপাত শুরু হয়। ৪-৫ দিন তাঁবুতে আটকা পড়ি। ভারী তুষারপাতে আমাদের তাঁবুর পোল ভেঙে যায়। ৫ দিন পরে যখন সূর্য উঠে আমরা সিদ্ধান্ত নিই ওপরে যাব। ওই সময় বিশাল এক তুষারধস আমাদের ঠিক ২০ ফিট পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। ঐটা যদি আমাদের হিট করতÑ সেদিনই আমরা যেকজন ছিলাম, একেবারে শেষ হয়ে যেতাম। কিছুক্ষণ পর আরও দুইটা তুষারঝড় হয়। সৌভাগ্যক্রমে আমাদের যাত্রাপথে তা পড়েনি। এরকম অসংখ্য অভিজ্ঞতা আছে পর্বতে। 

বিপদের মুহূর্তে নিজেকে কীভাবে মানসিকভাবে স্থির রাখেন?

পর্বতে সব সময় প্রকৃতির নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে হয়। সঠিক প্রস্তুতি নিয়ে পর্বতে যাওয়া উচিত। আর যা মানুষের নিয়ন্ত্রণে নেই যেমন- প্রাকৃতিক বিপর্যয়, তুষারধস এসব পরিস্থিতিতে আমি যা করি তা হলো মেনে নিই। প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় যেহেতু এখন আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানা যায়, তাই চেষ্টা থাকে ভালো আবহাওয়ায় অভিযান করার। 

পাহাড় আপনাকে জীবনের কী শিক্ষা দিয়েছে?

পাহাড়ে জীবন আর মৃত্যু হাত ধরাধরি করে চলে। অনেক কাছের মানুষকে পাহাড়ে হারিয়েছি। আমি সব সময় বিশ্বাস করি There is no cure for birth and death save to enjoy the interval. পাহাড় থেকে আমি শিখি কীভাবে মিনিমালাইজড হওয়া যায়। পাহাড়ে যখন এক ক্যাম্প থেকে আরেক ক্যাম্পে যাই তখন মাথার ওপর শুধু একটু তাঁবু খুঁজি। আঁটোসাঁটো হয়ে যেখানে থাকতে হয়। কেউ বরফগলা পানি দিলে কৃতজ্ঞচিত্তে নুয়ে পড়ি। সেখানে ক্যারিয়ার-অর্থ নিয়ে ভাবতে হয় না। সীমিত চাওয়া-পাওয়ার এই শিক্ষা পাহাড় আমাকে দেয়। ব্যক্তিজীবনেও তা রাখার চেষ্টা করি।

পাহাড়ে এমন কোনো মুহূর্ত ছিল কি, যা আপনাকে আবেগপ্রবণ করে তুলেছে?

এরকম অসংখ্য মুহূর্ত আছে। যেমন এবার মাকালু অভিযানে যাওয়াটাই আমার কাছে এটা একটা ইমোশনাল এস্পেক্ট ছিল। ফিজিক্যাল ইনটেনসিটি ব্যাপারটুকু তো ছিলই। আবেগের যে জায়গাটা ছিল তা হলো যে, এই পাহাড়েই মাস তিনেক আগে আমি যার সঙ্গে অন্নপূর্ণা ক্লাইম্ব করেছি, আমার যে ক্লাইম্বিং গাইড ছিল, পূর্ববঙ শেরপা, তাকে হারিয়েছি। সে গত জানুয়ারিতে এই পর্বতেই প্রাণ হারিয়েছে। এবার একই সঙ্গে আমি যাদের সঙ্গে এবার ক্লাইম্ব করেছি, ট্র্যাক করেছি যেমন- শেলি জোহানসেন, আমেরিকার তিপ্পান্ন বছর বয়সী ক্লাইম্বার। আমি ক্লাইম্ব করার এক সপ্তাহ পরে ক্লাইম্ব করেছে এবং পরদিন সে একটা avalance-এ পড়ে বা তুষারধসে পড়ে সে প্রাণ হারায়। এবং আমি এবার মাকালু অভিযানের প্রথম দিন থেকে যার সঙ্গে ট্র্যাক করেছি বেস, ক্যাম্পে- সবখানে একসঙ্গে আমরা লম্বা সময় কাটিয়েছি, সেই কনস্ট্যান্টিনের বাম হাতের সবগুলো আঙুল তুষারপাতে কাটা পড়েছে। ডান হাতের দুটো আঙুল হারিয়েছে। এই ব্যাপারগুলো আসলেই অনেক ক্ষেত্রেই ইমোশনাল করে তোলে। এটা একটা মিশ্র অনুভূতি যে, পর্বতটা ক্লাইম্ব করার আনন্দটুকু আছে। আবার একই সঙ্গে এই আমার এত কাছের লোকজনের এরকম সব পরিণতি দেখা সেটা একদমই সুখকর কিছু নয়।

সামনে কোনো নতুন অভিযান বা লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন?

বিশ্বে আট হাজারি ১৪টি পর্বতের মধ্যে ৫টি অভিযান সম্পন্ন হয়েছে। বাকি পর্বতগুলোর ধীরে ধীরে অভিযান করতে চাই। 

একজন বাবর আলী হতে আসলে কী লাগে?

পর্বতারোহণে আমার মতোই হতে হবে এমন কথা নেই। যত ওপরেই কেউ উঠুক না কেন, পা মাটিতে রাখা উচিত। আমি সব সময় বিশ্বাস করিÑ প্রকৃতির যে বিশাল টাইমলাইন তার খুবই ক্ষুদ্র অংশ আমি যাপন করার সুযোগ পাচ্ছি। নিজের পছন্দের জিনিসটাই করা উচিত, তবে যেন তা ইম্প্যাক্টফুল ওয়েতে করার যায়Ñ সেই চেষ্টা করতে হবে। যেন পরবর্তী প্রজন্মের জন্য জীবন সুখকর হয়। প্রাণ-প্রকৃতির ক্ষতি হয় এমন কিছু যেন আমরা না করি। একটা কথা দিয়ে শেষ করতে চাইÑ অনেকে ভাবেন এই পৃথিবী আমরা পূর্বসূরিদের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি, কিন্তু আমি মনে করি বরং ভাবা উচিত পরবর্তী প্রজন্মের কাছ থেকে আমরা এই পৃথিবী ধার হিসেবে পেয়েছি। সেভাবেই জীবনকে যাপন করা উচিত।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা