পরশন জাহিদ
প্রকাশ : ২১ মে ২০২৬ ১৫:৩২ পিএম
আপডেট : ২১ মে ২০২৬ ১৫:৩৬ পিএম
আঁকা : নিশা আক্তার। কাজী নজরুল ইসলাম ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬-১২ ভাদ্র ১৩৮৩
সালটা ১৮৯৯, চলছে ঔপনিবেশিক শাসন। সে সময় ভারতবর্ষের মানুষের দিন কাটছে অতি কষ্টে। চারদিকে রোগবালাই। শিশুমৃত্যুর হার অনেক বেশি। এমন সময় আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামের কাজী ফকির আহমদ ও জাহেদা খাতুনের ঘর আলো করে জন্ম নিল এক শিশু। তার নাম রাখা হলো কাজী নজরুল ইসলাম। এটা তার পোশাকি নাম। অভাবের সংসারে জন্ম নেওয়া কাজী নজরুল ইসলাম দুখু মিয়া নাম নিয়ে বেড়ে উঠতে থাকেন। এই দুখু মিয়ার জীবনসংগ্রামের কথা তো আমরা সবাই কমবেশি জানি। এই দুখু মিয়াই যে বড় হয়ে অনেক বই লিখবেন! গান, কবিতায় ভবিষ্যতের কথা জানিয়ে যাবেন, তা কি কেউ জানত!
আমরা তার লেখা পড়ি আর ব্যাপক বিস্ময় জাগে মনে। কী প্রখর স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন একজন কবি। ভবিষ্যৎ এঁকে গেলেন তার কলমে। আমি এখন এই লেখাটি লিখছি যে ডিভাইসে, সেটির কথা একজন কবি কত আগে লিখে রেখেছেন তার ‘সংকল্প’ কবিতায়Ñ ‘পাতাল ফেড়ে নামব নিচে, উঠব আবার আকাশ ফুঁড়ে; বিশ্ব-জগৎ দেখব আমি আপন হাতের মুঠোয় পুরে।’
কী দুর্দান্ত কবির দূরদৃষ্টি। মহান কবি ছিলেন কৌতূহলী এবং দূরদর্শী। রক্ত-মাংসের মগজের কৌতূহল ও দূরদৃষ্টি প্রকাশ করেছিলেন কলমের অঞ্জন রক্তে, কবিতার খাতার পাতায়। তার লেখা কবিতাগুলোর মধ্যে আমার দারুণ প্রিয় কবিতা, ‘সংকল্প’। কবিতাটি তিনি অসুস্থ হওয়ার আগে ১৯৪২ সালে রচনা করেন।
সংকল্প কবিতাটি আমরা চিনি শিশুতোষ কবিতা হিসেবে। কিন্তু এর সম্পূর্ণরূপ কবির কৌতূহল ও পরিণামদর্শিতার ভান্ডার।
‘কেমন করে মথলে পাথার লক্ষ্মী ওঠেন পাতাল ফুঁড়ে, কিসের অভিযানে মানুষ চলছে ওই হিমালয়ের চূড়ে।’
পৌরাণিক যুগে সমুদ্র মন্থনের সময় ধনরত্নের দেবী লক্ষ্মী পাথার অর্থাৎ সমুদ্রের জলরাশি ভেদ করে উঠে আসেন। কিন্তু এখন বীর ডুবুরি সিন্ধু সেচে আনেন ধনরত্ন, মণি-মুক্তা। ঢেউয়ের ঝুঁটি জাপটে ধরে রত্নাকরের বুকে চলে যুদ্ধজাহাজ, সিন্ধু যান। একসময় হিমালয় ছিল মানুষের কল্পনার রূপকথা এবং ভয়ের স্থান। কিন্তু এখন মানুষ সেই হিমালয়কেই করেছে জয়। কৌতূহলী কবির আগ্রহ, কেন হিমালয় জয় করে, কেন সন্ধানীরা তুহিন মেরু পার হয়ে অভিযানে যায়। মানুষ চাঁদে গেল কবে? এই তো সেদিন, অর্ধ শতাব্দী আগে। কিন্তু তারও বহু আগে এক কবি তার কবিতার দূরদৃষ্টিতে কল্পনা করলেন হাউই চড়ে চন্দ্রলোকের অচিনপুর জয় করার। আজকের রকেট যেন তার স্বপ্নের হাউই। কবির শ্রবণেচ্ছা মঙ্গল গ্রহ থেকে উড়ে আসা ইঙ্গিত শোনার। এই ইঙ্গিত বর্তমানে বিজ্ঞানীদের রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি, যা শুনতে এখনও মানুষের আকাঙ্ক্ষা অটুট। সেই সময় একজন বাঙালি কবি তার ভবিষ্যৎমুখী কবিতায় পেশ করলেন মঙ্গলে প্রাণ থাকার ধারণা।
কে চায় অজ্ঞানতার বদ্ধ খাঁচায় বন্দি হয়ে থাকতে। সকলের আকাঙ্ক্ষা শশধর, তারকারাজি, জলধি কিংবা গিরি সব সম্পর্কে জ্ঞান ধারণ করা। কবিও ব্যতিক্রম নন। সীমার বাঁধন টুটে দশ দিকেতে লুটিয়ে জ্ঞান আহরণ করতে চাইছেন, মেটাতে চাইছেন কৌতূহল। তিনি চাইছেন তার সীমার বাঁধন ছিন্ন করতে। বিশ্বজগৎ আজ আমাদের হাতের মুঠোয়, আমাদের হাতের এক স্মার্টফোনে বন্দি পুরো বসুন্ধরা। এক হাতের মুঠোয় আমরা দেখতে পারি সারা পৃথিবীর আবহাওয়া, মানচিত্র, পৃথিবীর আনাচ-কানাচের তথ্য। এ সবই সম্ভব হয়েছে বিজ্ঞানের অবদানে, বিজ্ঞানের সৃষ্টির স্মার্টফোনের দৌলতে। কিন্তু এই সৃষ্টির অনেক আগে, এক ভবিষ্যৎমুখী দূরদৃষ্টি সম্পন্ন কবি চিন্তা করেছিলেন বিশ্বজগৎ হাতের মুঠোয় পেরোনোর কথা। বিশ্বকে কমলা লেবুর মতো হাতের মুঠোয় বন্দি করার কথা। তিনি ভেবেছিলেন বিশ্বজগৎকে হাতের মুঠোয় পুরে রাখার দুর্ভাবনীয় কথা। এই দূরদর্শী ভবিষ্যৎমুখী কবি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। আজ থেকে বহুকাল আগে, এক কবি চিন্তা করেছিলেন এতসব, ভেবেছিলেন এত রকম বিজ্ঞানমনস্ক কথা। এই কবিতা ছিল তার বৈজ্ঞানিক, রাজনৈতিক, মহাজাগতিক, ভৌগোলিক, পৌরাণিক ও আধ্যাত্মিক কৌতূহল ভান্ডার।
এই কবিতাটি পড়ে আমার দারুণ লেগেছে। কবি কাজী নজরুল ইসলাম সম্পর্কে আমার ধারণার আরেকটি দ্বার খুলে দিয়েছে কবিতাটি। এই কবিতাটি পড়ে উপলব্ধি করা যায় শুধু বিদ্রোহী কবি নন তিনি, একজন দূরদর্শী কবি।
ষষ্ঠ শ্রেণি, উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজ, কাকরাইল, ঢাকা