× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ত্যাগ ও মায়ার গল্প

তৌকির মুহাইমিন

প্রকাশ : ২১ মে ২০২৬ ১৫:১৩ পিএম

আঁকা : ইবতেসাম মাহবুব ইফাজ, চতুর্থ শ্রেণি, বিএএফ শাহীন কলেজ, ঢাকা

আঁকা : ইবতেসাম মাহবুব ইফাজ, চতুর্থ শ্রেণি, বিএএফ শাহীন কলেজ, ঢাকা

চাঁদ ওঠার খবর পুরো মাধবপুর গ্রামে ছড়িয়ে পড়ল। মসজিদের মাইকে তাকবির ভেসে উঠতেই গ্রামের বাতাসে ভাসতে থাকল আনন্দের আমেজ। বাজারে মানুষের ভিড় বাড়তে লাগল, হাটে হাটে গরু-ছাগল নিয়ে দরদাম চলতে লাগল, আর ছোট ছোট বাচ্চা নতুন জামাকাপড়ের কথা ভেবে আনন্দে মেতে উঠল। চারদিকে ঈদুল আজহার আগমনের উচ্ছ্বাস। অথচ এই আনন্দের মাঝেও আলতাফ মিয়া একটু নীরব হয়ে রইলেন। অন্যদের মতো হৈচৈ না করে তিনি বিকালের বেশিরভাগ সময় নিজের উঠানে বসে থাকেন। তার চোখ বারবার গিয়ে থামে উঠানের এক কোণে বাঁধা কালো রঙের গরুটার দিকে। গরুটার নাম তার নাতনি মিম আদর করে রেখেছে ‘কালু’।

কালুকে কেনার পেছনে আলতাফ মিয়ার রয়েছে অনেক ত্যাগ আর পরিশ্রমের গল্প। বছরজুড়ে তিল তিল করে টাকা জমিয়েছেন। নিজের নতুন লুঙ্গি কেনেননি, কখনও বাজার থেকে ভালো মাছ না কিনে সস্তা ডাল দিয়েই দিন পার করেছেন। শুধু একটা ইচ্ছাÑ এইবার নিজের সামর্থ্যে একটা সুন্দর গরু কোরবানি দেবেন। তার কাছে কোরবানি শুধু ধর্মীয় দায়িত্ব নয়, এটা ছিল আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, ত্যাগ আর কৃতজ্ঞতার প্রতীক।

মিমের বয়স আট বছর। সারাদিন কালুর আশপাশে ঘুরঘুর করত সে। কখনও ঘাস এনে খাওয়ায়, কখনও গলায় হাত দিয়ে গল্প করে। মিমের কাছে কালু যেন একটা পরিবারের সদস্য হয়ে উঠছিল। এক বিকালে সে দৌড়ে এসে দাদুর পাশে বসে নরম গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘দাদু, কালুকে কি সত্যিই কোরবানি দিবা?’

আলতাফ মিয়া কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন। তারপর মিমের মাথায় হাত বুলিয়ে মৃদু হেসে বললেন, ‘হ বোন, আল্লাহর রাস্তায় সবচেয়ে প্রিয় জিনিস দিতেই হয়। এইটাই কোরবানির আসল শিক্ষা।’

মিম পুরো কথাটা বুঝল না, কিন্তু দাদুর কণ্ঠের কোমলতা তার মন ছুঁয়ে গেল। দিন যত গড়াতে লাগল, গ্রামের ব্যস্ততাও তত বাড়তে লাগল। কেউ বাড়ি রঙ করছে, কেউ মসজিদ পরিষ্কার করছে, আবার কেউ আত্মীয়দের জন্য বাজার করছে। সন্ধ্যার পর বাড়ি বাড়ি সেমাই ভাজার গন্ধ ছড়িয়ে পড়ত। ছোটরা নতুন জামা লুকিয়ে রাখত, যেন ঈদের আগ পর্যন্ত কেউ না দেখে। পুরো গ্রাম যেন আনন্দের এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা পড়ছিল। অবশেষে ঈদের সকাল এসে গেল।

ফজরের পর থেকেই গ্রামের রাস্তায় মানুষের চলাফেরা শুরু হলো। সবাই নতুন কাপড় পরে ঈদের নামাজের জন্য মাঠের দিকে রওনা দিল। আকাশটা ছিল পরিষ্কার, হালকা বাতাস বইছিল, আর চারদিকে তাকবিরের ধ্বনি শোনা যাচ্ছিল। নামাজ শেষে সবাই একে অপরের সাথে কোলাকুলি করল। ছোটরা সালাম করে সালামি নিতে ব্যস্ত, বড়রা হাসিমুখে শুভেচ্ছা বিনিময় করছে। এরপর শুরু হলো কোরবানির প্রস্তুতি।

মিম একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখে পানি জমে উঠছিল। কালুর গলায় হাত বুলাইতে বুলাইতে সে চুপচাপ তাকিয়ে ছিল। আলতাফ মিয়া নাতনির মন বুঝতে পারলেন। তিনি ধীরে ধীরে কাছে গিয়ে বললেন, ‘কান্দিস না বোন। কোরবানি মানে শুধু পশু দেওয়া না। মানুষের ভেতরে যে অহংকার, লোভ আর খারাপ চিন্তা থাকে, সেগুলোও ছেড়ে দেওয়ার শিক্ষা।’

মিম দাদুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সে হয়তো পুরো গভীরতা বুঝতে পারল না, কিন্তু তার ছোট্ট মনে কথাগুলো গেঁথে গেল।

কোরবানি শেষ হওয়ার পর গোশত ভাগ করা শুরু হলো। আলতাফ মিয়া খুব যত্ন করে গ্রামের গরিব মানুষদের জন্য আলাদা অংশ রাখলেন। রহিমা খালা, যিনি কয়েক মাস ধরেই অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসা নিয়ে কষ্টে ছিলেন, গোশত হাতে পেয়ে চোখ ভিজে দোয়া করলেন। পাশের বাড়ির সুমনের মা হাসিমুখে বললেন, ‘আল্লাহ আপনাদের ভালো রাখুক ভাই।’

এই দোয়াগুলো শুনে আলতাফ মিয়ার মুখে একধরনের শান্তি ফুটে উঠল। তার মনে হলো, সারা বছরের কষ্ট যেন এই মুহূর্তেই সার্থক হয়ে গেছে।

বিকালের দিকে পুরো গ্রামে উৎসবের আমেজ আরও বেড়ে গেল। বাড়ি বাড়ি রান্নার গন্ধ, অতিথিদের আনাগোনা, আর শিশুদের হাসির শব্দে চারদিক মুখর হয়ে উঠল। বড় একটা পাতিলে গরুর মাংস রান্না হচ্ছিল, পাশে সেমাই আর পোলাওয়ের আয়োজন। সন্ধ্যায় সবাই একসাথে খাওয়া-দাওয়ায় বসল। কেউ গল্প করছে, কেউ পুরনো স্মৃতি মনে করছে। দীর্ঘদিন পর গ্রামের মানুষজন যেন ব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি ভুলে একসাথে আনন্দ ভাগাভাগি করছিল।

রাত গভীর হলে মিম দাদুর কোলে মাথা রাখল। বাইরে তখনও দূর থেকে মানুষের হাসির শব্দ ভেসে আসছিল। মিম আস্তে করে বলল, ‘আজকে অনেক ভালো লাগছে দাদু… মনে হচ্ছে কেউ একা না।’

আলতাফ মিয়া আকাশের দিকে তাকালেন। চাঁদের আলো উঠানের ওপর পড়ে আছে। তিনি নাতনির মাথায় হাত রেখে ধীরে ধীরে বললেন, ‍‘এইটাই তো ঈদের আসল আনন্দ বোনÑ সবাই মিলে থাকা, ভাগাভাগি করা, আর মানুষের মুখে হাসি ফোটানো।’ সেই রাতে মাধবপুর গ্রামের আকাশে শুধু ঈদের আনন্দই ছিল না, ছিল ভালোবাসা, ত্যাগ আর মানুষে মানুষে এক অদৃশ্য বন্ধন।

ষষ্ঠ শ্রেণি, বরিশাল জিলা স্কুল

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা