মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ভারী ধাতুর বিষ সুতাং নদী জুড়ে
আশরাফুল ইসলাম কহিনুর, হবিগঞ্জ
প্রকাশ : ২০ মে ২০২৬ ১২:৫৩ পিএম
মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ভারী ধাতুর বিষ সুতাং নদী জুড়ে
হবিগঞ্জের সুতাং নদী এখন আর শুধু একটি দূষিত নদীর নাম নয়; এটি ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে এক নীরব পরিবেশগত বিপর্যয়ের প্রতীকে। নদীর পানিতে নেই স্বাভাবিক প্রাণচাঞ্চল্য, মাছের শরীরে ঢুকে পড়েছে প্লাস্টিকের কণা, পানির সঙ্গে মিশছে বিষাক্ত ভারী ধাতু। হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক গবেষণায় উঠে এসেছে এই উদ্বেগজনক তথ্য। নদী থেকে সংগৃহীত ৩০টি মাছের পরিপাকতন্ত্র বিশ্লেষণ করে ৫১টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিটি মাছের শরীরে গড়ে প্রায় দুটি করে প্লাস্টিক কণা জমা হয়েছে। এটি কেবল শুরু, দূষণের প্রকৃত মাত্রা আরও গভীর হতে পারে। গবেষকরা বলছেন, পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে শুধু নদী নয়, পুরো হাওরাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ও মানুষের স্বাস্থ্য ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়বে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শাকির আহমেদ।
মাছের শরীরে প্লাস্টিক, পানিতে বিষ
গবেষণায় দেখা গেছে, নদীর প্রতি লিটার পানিতে ৬টি থেকে সর্বোচ্চ ৪৬টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা রয়েছে। এসব কণার আকার শূন্য দশমিক ১ থেকে শূন্য দশমিক ৫ মিলিমিটার পর্যন্ত। রাসায়নিক বিশ্লেষণে শনাক্ত হয়েছে পলিথিন, পলিইথিলিন টেরেফথালেট (পিইটি) ও পলিআমাইড জাতীয় ক্ষতিকর প্লাস্টিক। গবেষকদের মতে, শিল্পকারখানার বর্জ্য, প্লাস্টিক প্যাকেটজাত পণ্য ও অপরিকল্পিত নগর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ফলেই এসব ক্ষুদ্র প্লাস্টিক নদীতে জমা হচ্ছে। দীর্ঘদিন পানিতে ভেসে থাকা এই প্লাস্টিক সূর্যালোক ও রাসায়নিক বিক্রিয়ায় ভেঙে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়ে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করছে। একই সঙ্গে নদীর পানিতে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি মাত্রায় পাওয়া গেছে লোহা, ম্যাঙ্গানিজ ও সিসার মতো ভারী ধাতু। দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়া এবং মোট দ্রবীভূত কঠিন পদার্থের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় গবেষকরা সুতাংয়ের পানিকে ‘অতি নিম্নমানের’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
-6a0d5a6c040fe.jpg)
যেখানে প্রাণ থাকার কথা নয়
হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও গবেষক শাকির আহমেদ বলেন, শিল্পবর্জ্য যেখানে সরাসরি নদীতে মিশেছে, সেখানে গিয়ে তারা কোনো জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব খুঁজে পাননি। ‘যে পরিমাণ ভারী ধাতু পাওয়া গেছে, সেখানে কোনোভাবেই জীবনের অস্তিত্ব থাকার কথা নয়’, বলেন তিনি।
গবেষণার কাজে নদীর বুল্লা অংশ থেকে সুতাং পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে নমুনা সংগ্রহ করতে গিয়ে তারা মাছ তো দূরের কথা, শামুকের উপস্থিতিও পাননি। গবেষকদের ভাষায়, এটি নদীর ‘জীববৈচিত্র্য ধসের’ স্পষ্ট সংকেত।
জলজ সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রভাষক ইফতেখার আহম্মেদ বলেন, নদীর বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে সংগ্রহ করা মাছ, পানি ও পলিতে বিভিন্ন রঙ ও আকারের বিপুল মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। বর্ষা ও শীত দুই মৌসুমেই দূষণের মাত্রা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
হাওরাঞ্চলের খাদ্যশৃঙ্খলেও হুমকি
বিশেষজ্ঞদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে। সুতাং নদীঘেঁষা হাওরাঞ্চলে বোরো মৌসুমে এই নদীর পানি ব্যবহার করে কৃষিকাজ করা হয়। গবেষকরা আশঙ্কা করছেন, নদীর মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ভারী ধাতু ধানসহ কৃষিপণ্যের মাধ্যমে খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে। দীর্ঘমেয়াদে এর ফলে ক্যানসার, স্নায়ুরোগ, কিডনি জটিলতা ও হরমোনজনিত সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন গবেষকরা।
গবেষক শাকির আহম্মেদ বলেন, ‘মিঠাপানির এই দূষণ শুধু পরিবেশ নয়, মানবস্বাস্থ্যের জন্যও বড় বিপদ হয়ে উঠছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।’
দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ জনপদ
সুতাং নদীর তীরবর্তী করাব, ছড়িপুর, উচাইল, রাজিউড়া ও সাধুর বাজার এলাকায় নদীর পানি কালচে হয়ে গেছে। বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে তীব্র দুর্গন্ধ। স্থানীয়দের অভিযোগ, শিল্পকারখানাগুলো বর্জ্য শোধন না করেই সরাসরি খাল ও নদীতে ফেলছে।
স্থানীয় রাজনীতিবিদ অ্যাডভোকেট ইয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘এখন নদীর পানিতে গোসল করলে শরীরে চুলকানি শুরু হয়। দুর্গন্ধে এলাকায় থাকা কষ্টকর হয়ে গেছে। স্কুলে যাতায়াতও দুর্ভোগে পরিণত হয়েছে।’
পরিবেশবাদীরা বলছেন, দূষণের এই প্রভাব এখন শুধু নদীতেই সীমাবদ্ধ নেই; আশপাশের মানুষের জীবনযাত্রা, স্বাস্থ্য ও অর্থনীতিতেও তা ছড়িয়ে পড়ছে।
শিল্পবর্জ্যের কালো স্রোত
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) হবিগঞ্জ শাখার সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল সোহেল বলেন, হবিগঞ্জের বিভিন্ন শিল্পকারখানা থেকে নির্গত বিষাক্ত বর্জ্য সুতাং নদীকে মৃতপ্রায় করে তুলেছে।
তার মতে, নদীর তলদেশে প্লাস্টিক মাইক্রোবিডসের স্তর জমেছে। এসব দূষিত কালো পানি সুতাং-বলভদ্র হয়ে শেষ পর্যন্ত মেঘনা নদীতেও গিয়ে পড়ছে। ফলে একটি নদীর দূষণ ধীরে ধীরে বৃহত্তর জলজ বাস্তুতন্ত্রকে আক্রান্ত করছে।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক বলেন, সুতাং নদীকে বাঁচানো এখন শুধু একটি নদী রক্ষার প্রশ্ন নয়; এটি মানুষের স্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা, হাওরাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষার লড়াই। সুতাং নদীকে রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। শিল্প কারখানায় বাধ্যতামূলক বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) চালু ও কার্যকর করা। নদীতে সরাসরি শিল্পবর্জ্য ফেলা বন্ধ করা। প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। নিয়মিত বৈজ্ঞানিকভাবে পানি, মাছ ও পলি পরীক্ষা করা। নদীর তীরবর্তী জনগণের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি করা। আন্তঃসীমান্ত নদী হিসেবে যৌথ পরিবেশ ব্যবস্থাপনা জোরদার করা।
সীমান্ত পেরিয়ে আসা নদীর করুণ পরিণতি
ভারতের ত্রিপুরা থেকে উৎপন্ন ৮২ কিলোমিটার দীর্ঘ সুতাং নদী হবিগঞ্জ সদর, শায়েস্তাগঞ্জ, লাখাই ও চুনারুঘাট উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এক সময় এটি ছিল হাওরাঞ্চলের যোগাযোগ, মৎস্যসম্পদ ও জীবিকার অন্যতম প্রধান উৎস। কিন্তু শায়েস্তাগঞ্জের অলিপুর শিল্পাঞ্চল গড়ে ওঠার পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে শুরু করে। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে গড়ে ওঠা কারখানাগুলোর বর্জ্য শৈলজুড়া খালের মাধ্যমে সুতাং নদীতে গিয়ে মিশছে। ফলে নদী হারাচ্ছে তার স্বাভাবিক প্রবাহ, প্রাণ ও পরিবেশগত ভারসাম্য।