তরিকুল ইসলাম মিঠু, যশোর
প্রকাশ : ২০ মে ২০২৬ ১২:৪৮ পিএম
যশোরের কাঠ কুটিরশিল্পে শতকোটি টাকার হাতছানি
যশোরের কেশবপুরের আলতাপোল, কন্দর্পপুর, বড়েঙ্গা ও মঙ্গলকোট ঘিরে গড়ে উঠেছে কাঠ কুটির শিল্পের বিপ্লব। চারটি গ্রামের প্রায় ৫০০ পরিবার স্বাবলম্বী হয়েছে কাঠের শিল্পের ছোঁয়ায়। এ শিল্প থেকে বছরে আয় প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা। তবে সরকারিরী পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বছরে শতকোটি টাকা আয় করা সম্ভাব হবে বলে জানিয়েছেন এখানকার একাধিক কারখানার মালিকরা।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেল, কোনো পথযাত্রী গ্রামের মাঝখান দিয়ে হেঁটে গেলে কানে ভেসে আসে কাঠ কুটির শিল্পীদের খুটখুট শব্দ। এ শব্দ শুনেই যে কেউ হঠাৎ কৌতূহলী বনে যাবেন। একটু মনোযোগী হলেই বুঝতে বাকি থাকবে না যেন প্রতিটি বাড়িই একেকটি কারখানা। এসব কারখানায় ঘূর্ণমান কাঠের টুকরায় বাটালির ছোঁয়ায় তৈরি হচ্ছে বাহারি ফুলদানি, মোমদানি, কলমদানি, পাউডার কেস, খুনতি, হামাম, কিংবা রুটি বেলার বেলনসহ নানা আসবাবপত্র।
বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের পল্লী জীবিকা উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় এ চারটি গ্রামকে ‘শিল্পপল্লী’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। তাদের ভাষ্য, বাড়ি বাড়ি বিদ্যুৎ পৌঁছে যাওয়ায় কেশবপুরের এ কুটিরশিল্প এখন চারটি গ্রাম ছাড়াও ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের গ্রামেগুলোতেও। প্রতি পরিবারের নারী-পুরুষ, এমনকি শিশুরাও এখন কাঠের শিল্পে পারদর্শী। নারীরা নিয়মিত এ কাজে যুক্ত হওয়ায় আয় বেড়েছে পরিবারের। বর্তমানে কেশবপুরের ওই চার গ্রামেই রয়েছে এ রকম অন্তত ৪০০ কারখানা। এসব কারখানায় মালিক-শ্রমিক ও কাঠ ব্যবসায়ী মিলিয়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কমপক্ষে ২০ হাজার মানুষ জীবিকা নির্বাহ করছেন।

কুটিরশিল্পের নাসিম বলছেন, এক যুগ আগেও গ্রামগুলোর অনেক মানুষ কাজের অভাবে জীবিকা নির্বাহ করতে হিমশিম খেত। এমনকি অনেকে কাজের সন্ধানে অনেকে গ্রাম ছেড়ে শহরে যেত। এখন তারা গ্রামেই সারা দিন থাকে কর্মমুখর। নিজেদের অর্থনৈতিক সচ্ছলতার পাশাপাশি গ্রামগুলোতেও এসেছে উন্নয়নের ছোঁয়া। তবে সরকারি সহযোগিতা পেলে এ শিল্প আরও সমৃদ্ধ হতো।
আলতাপোল গ্রামের বাসিন্দা কারখানার মালিক সাধন কুমার রায় বলেন, এক যুগ আগেও অন্যের জমিতে কামলা খাটতেন তিনি। গ্রামের ইনসার আলীর দেখাদেখি শুরু করেন কাঠের ব্যবসা। নিজের বাড়িতেই একটি কারখানা স্থাপন করেন। পরে মেহগনি কাঠ থেকে মোমদানি, ফুলদানি, কলমদানি, বাটি, পাউডার কেস, বয়াম, ডিম সেট, আপেল সেট, খুনতি, হামাম, পিঁড়ি, মেয়েদের চুড়ি রাখার আলনা, হারিকেন, পেনসিল, অ্যাশট্রে, সিদুর বক্স, ধামাপাতি, খয়েরদানি, টিফিন বক্সসহ নানা ধরনের শোপিস তৈরি করতে থাকেন। প্রথমে স্থানীয় বাজারে এগুলো বিক্রি শুরু করলেও পরে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, কুষ্টিয়া, বাগেরহাট, পাবনাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করে থাকেন। এখন তার প্রতি মাসে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা বেচাকেনা হয় বলে তিনি জানান।
উজ্জ্বল কুমার দাস নামে এক শ্রমিক বলেন, মূলত এসব জিনিসপত্র তৈরির উপাদান মেহগনি কাঠ। প্রথমে আমাদের মহাজন স’ মিল থেকে কাঠ কেটে নিয়ে আসেন। কাঠ কেটে কাঠের ছাল ওঠানো হয়। সেখান থেকে কাঠগুলো শুকানো হয় দুই থেকে তিন দিন। তারপর কারখানা এনে বিদ্যুচ্চালিত মোটরের চাকায় লাগিয়ে ঘূর্ণমান কাঠের টুকরোতে বাটালির ছোঁয়ায় তৈরি করি নানা রকমের পণ্য। পরে রঙ করে রোদে শুকায়ে মহাজনের কাছে বুঝিয়ে দিই। মহাজন আমাদের পিস হিসেবেই মজুরি দেন।
ভাই ভাই কুটিরশিল্পের শ্রমিক তন্ময় রায় বলেন, প্রতিদিন ভোর থেকে কাজ শুরু করি। দুপুরে ঘণ্টাখানেকের একটা বিরতি দিয়ে কাজ শেষ করি সন্ধ্যায়। আট ইঞ্চি হামাম বানালে আমাদের মজুরি দেন ৩০ টাকা, ৪ ইঞ্চি বানালে ৪ টাকা, ৭ ইঞ্চি বানালে ১৫ টাকা করে দেন। সব মিলিয়ে ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি ওঠে বলে জানান তিনি। প্রতিদিন সব মিলিয়ে ৫০ থেকে ৬০টি তৈজসপত্র তৈরি করতে পারেন শ্রমিক সফিউল। তিনি জানান, গড়ে দিনে ৬০০ টাকা পর্যন্ত আয় হয় তাদের। এ কাজ করে ভালোভাবেই সংসার চলছে তাদের।
কাঠশিল্পী কামরুল ইসলাম জানান, কেশবপুরে এ রকম চার শতাধিক কারখানা গড়ে উঠেছে বাড়িতে বাড়িতে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ কাজে যুক্ত রয়েছে কমপক্ষে ২০ হাজার মানুষ। কেশবপুরের গ্রামে তৈরি এসব কাঠের সামগ্রী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছে। পাইকাররা বাড়ি এসেই কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।
ভাই ভাই কুটিরশিল্পের স্বত্বাধিকারী কবির হোসেন জানান, বেশ আগে থেকেই এ কাজ শুরু হলেও এর ব্যাপকতা লাভ করে এ অঞ্চলে বিদ্যুৎ-সংযোগ আসার পর। তার অধীনে অর্ধ শতাধিক শ্রমিক কাজ করছেন। অনেক শ্রমিক মাসিক বেতনে কাজ করলেও অনেকে কাজ হিসেবে টাকা নিয়ে থাকেন। সব খরচ বাদ দিয়ে মাসে অর্ধ লক্ষাধিক টাকা লাভ থাকে তার।
কেশবপুর কুটিরশিল্প সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোশারফ হোসেন দুলু বলেন, এখানে ৫০ বছর ধরে নিজ উদ্যোগে ছোট ছোট অনেক কুটির শিল্প গড়ে উঠেছে। তবে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা থাকলে এই শিল্পে আরও বিকাশিত হতো।