প্রকৌশলী আব্দুল আজিজ
প্রকাশ : ১৮ মে ২০২৬ ১৪:১১ পিএম
আপডেট : ১৮ মে ২০২৬ ১৪:১১ পিএম
প্রকৌশলী আব্দুল আজিজ, চেয়ারম্যান, যাচাই ডট কম লিমিটেড
বাংলাদেশের ই-কমার্স এখন আর শুধুমাত্র 'অনলাইন শপিং' এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির অন্যতম বৃহৎ চালিকাশক্তি, যেখানে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে যুক্ত রয়েছে প্রায় ৫ লাখেরও বেশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (SME), লাখো তরুণ ফ্রিল্যান্সার, ডেলিভারি কর্মী, আইটি পেশাজীবী এবং নারী উদ্যোক্তা। আজকের বাংলাদেশে একটি মোবাইল ফোন, একটি ফেসবুক পেজ এবং একটি ডিজিটাল পেমেন্ট অ্যাকাউন্ট দিয়েই একজন তরুণ উদ্যোক্তা নিজের ব্যবসা শুরু করতে পারছে। এই পরিবর্তনই বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নতুন একটি যুগে প্রবেশ করিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে — আমরা কি এই খাতকে সত্যিকারের 'জাতীয় অর্থনৈতিক শক্তি' হিসেবে গড়ে তুলতে পেরেছি?
বর্তমান বাস্তবতা
বাংলাদেশের ই-কমার্স খাত গত কয়েক বছরে দ্রুত বৃদ্ধি পেলেও এখনও নানা কাঠামোগত সমস্যার মুখোমুখি।
নীতিগত অসামঞ্জস্য
একজন উদ্যোক্তা ব্যবসা করার চেয়ে অনেক সময় নিয়ম-কানুন সামলাতেই বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এটি একটি স্মার্ট ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য বড় বাধা। অথচ সম্ভাবনাটা বিশাল।
বাংলাদেশে বর্তমানে:
এই বাস্তবতায় আগামী ২০২৬–২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ই-কমার্স বাজার ১.৫ ট্রিলিয়ন টাকারও বেশি অর্থনৈতিক কার্যক্রম তৈরি করতে সক্ষম। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন —সমন্বিত জাতীয় ই-কমার্স রোডম্যাপ। এখন সময় এসেছে শুধুমাত্র আলোচনা নয়, বাস্তবভিত্তিক নীতি সংস্কারের।
যে বিষয়গুলো এখন অত্যন্ত জরুরি:
১. জাতীয় ই-কমার্স টাস্কফোর্স: একটি শক্তিশালী, ডাটা-নির্ভর এবং উদ্যোক্তাবান্ধব টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে, যেখানে সরকার, উদ্যোক্তা, লজিস্টিক, ফিনটেক এবং প্রযুক্তি খাত একসাথে কাজ করবে।
২. ওয়ান স্টপ ডিজিটাল কমার্স সার্ভিস : লাইসেন্স, ট্রেড, ট্যাক্স, পেমেন্ট, এক্সপোর্ট — সবকিছু এক প্ল্যাটফর্মে আনতে হবে।
৩. জাতীয় লজিস্টিক ও ফুলফিলমেন্ট নীতি: ডেলিভারি খরচ কমাতে হবে এবং জেলা পর্যায়ে স্মার্ট ফুলফিলমেন্ট হাব তৈরি করতে হবে।
৪. ক্রস-বর্ডার ইকমার্স পলিসি: বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের Amazon, Walmart, eBay, Etsy সহ বৈশ্বিক মার্কেটপ্লেসে প্রবেশ সহজ করতে হবে।
৫. ডিজিটাল কনজিউমার প্রটেকশন ফ্রেমওয়ার্ক: গ্রাহক নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে ই-কমার্সের টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়।
৬. SME ফাইন্যান্সিং এন্ড ফিনটেক ইন্টিগ্রেশন: ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহজ ডিজিটাল ঋণ, BNPL, ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল এবং এআই ভিত্তিক ক্রেডিট স্কোরিং সুবিধা চালু করতে হবে।
৭. বাংলাদেশ পোস্ট অফিস ডিজিটালাইজেশন: পোস্ট অফিসকে জাতীয় ই-কমার্স ডেলিভারি নেটওয়ার্কে রূপান্তর করা সম্ভব।
৮. এআই, অটোমেশন এন্ড স্মার্ট কমার্স: বাংলাদেশকে এখন থেকেই AI-চালিত কমার্স, ভয়েস কমার্স, স্মার্ট লজিস্টিক এবং ডাটা-ড্রিভেন মার্কেটিংয়ের দিকে এগোতে হবে।
বাংলাদেশের ই-কমার্স শুধুমাত্র একটি ব্যবসা খাত নয়; এটি ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক স্বাধীনতার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। যদি সঠিক নীতি, প্রযুক্তি এবং উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়, তাহলে আগামী ১০ বছরে বাংলাদেশের ই-কমার্স দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ ডিজিটাল অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে পারে। সময় এসেছে — আমলাতান্ত্রিক জটিলতার বাংলাদেশ থেকে উদ্যোক্তাবান্ধব স্মার্ট বাংলাদেশের পথে এগিয়ে যাওয়ার।
লেখক: চেয়ারম্যান, যাচাই ডট কম লিমিটেড