মৃন্ময় মণ্ডল চঞ্চল
প্রকাশ : ১৭ মে ২০২৬ ১৮:০৫ পিএম
আপডেট : ১৭ মে ২০২৬ ১৯:০৭ পিএম
বর্তমান বিশ্বের প্রযুক্তি খাতে সবচেয়ে বড় আলোচনার নাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। কয়েক বছর আগেও এআই ছিল মূলত গবেষণাগার, বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান কিংবা বিশেষজ্ঞদের সীমিত ব্যবহারের প্রযুক্তি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রযুক্তি এখন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের জন্য তৈরি অ্যাপগুলোতে এখন সবচেয়ে বেশি যুক্ত হচ্ছে এআইভিত্তিক সুবিধা। ফলে বিশ্বের জনপ্রিয় অ্যাপ স্টোরগুলো যেন এখন এআই অ্যাপের বিশাল সমুদ্রে পরিণত হয়েছে।
আরও পড়ুন: ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারীদের উপর এখন এআই ক্যামেরার নজরদারি |
গুগল প্লে স্টোর কিংবা অ্যাপলের অ্যাপ স্টোরে ঢুকলেই এখন দেখা যায় অসংখ্য এআইচালিত অ্যাপ। ছবি সম্পাদনা, ভিডিও তৈরি, ভয়েস পরিবর্তন, লেখালেখি, অনুবাদ, স্বাস্থ্য পরামর্শ, পড়াশোনা কিংবা অফিসের কাজÑ সব ক্ষেত্রেই এখন এআই অ্যাপের ছড়াছড়ি।
মানুষের হাতের মুঠোয় এআই
একসময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে অনেক কৌতূহল থাকলেও এর ব্যবহার ছিল সীমিত। কিন্তু ChatGPT, Gemini, Copilot কিংবা Midjourney-এর মতো প্রযুক্তি জনপ্রিয় হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। মানুষ বুঝতে শুরু করে, এআই শুধু বড় কোম্পানির প্রযুক্তি নয়, বরং এটি সাধারণ কাজেও গুরুত্বপূর্ণ সহকারী হতে পারে।
এখন একজন শিক্ষার্থী এআই অ্যাপ ব্যবহার করে সহজে নোট তৈরি করতে পারছেন, কঠিন বিষয়ের ব্যাখ্যা জানতে পারছেন কিংবা ভাষা শেখার সুযোগ পাচ্ছেন। অন্যদিকে একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর কয়েক মিনিটে ভিডিও স্ক্রিপ্ট, পোস্ট ক্যাপশন কিংবা ডিজাইন তৈরি করতে পারছেন। এমনকি ছোট ব্যবসায়ীরাও এআই অ্যাপ ব্যবহার করে নিজেদের পণ্যের প্রচারণামূলক কনটেন্ট তৈরি করছেন খুব সহজেই।
এআই অ্যাপ ও কার্যকারিতা
বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত এআই অ্যাপগুলোর মধ্যে রয়েছে ChatGPT, Google Gemini, Canva AI, CapCut AI, Grammarly এবং Remini। ChatGPT ব্যবহার করা হচ্ছে লেখালেখি, তথ্য সংগ্রহ, প্রশ্নের উত্তর কিংবা আইডিয়া তৈরির কাজে। Google Gemini বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ ও দ্রুত অনুসন্ধানে সাহায্য করছে। Canva AI এবং CapCut AI ছবি ও ভিডিও সম্পাদনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। খুব কম সময়েই পেশাদার মানের ডিজাইন ও ভিডিও তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে এসব অ্যাপের মাধ্যমে।
অন্যদিকে Grammarly-এর মতো এআই অ্যাপ লেখার ভুল সংশোধন ও ভাষার মান উন্নত করতে সাহায্য করছে। Remini-এর মতো অ্যাপ পুরনো বা ঝাপসা ছবিকে পরিষ্কার ও আকর্ষণীয় করে তুলছে। এসব অ্যাপের কারণে প্রযুক্তিনির্ভর কাজ এখন অনেক সহজ হয়ে গেছে।
ছবি ও ভিডিও তৈরিতে এআই
বর্তমানে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছে এআই ছবি ও ভিডিও এডিটিং অ্যাপগুলো। আগে একটি ভালো ডিজাইন বা ভিডিও তৈরি করতে পেশাদার সফটওয়্যার এবং দক্ষতার প্রয়োজন হতো। এখন এআইচালিত অ্যাপ কয়েক সেকেন্ডেই ছবি পরিবর্তন, ব্যাকগ্রাউন্ড সরানো, ভিডিও সম্পাদনা কিংবা ভয়েস যোগ করার মতো কাজ করে দিচ্ছে।
অনেক অ্যাপে শুধু একটি নির্দেশনা লিখলেই এআই সেই অনুযায়ী ছবি তৈরি করছে। কেউ চাইলে নিজের সাধারণ ছবিকেও সিনেমাটিক বা আর্টিস্টিক রূপ দিতে পারছেন। এতে সামাজিক মাধ্যমে কনটেন্ট তৈরির প্রবণতাও বেড়েছে।
ডেটা ও অর্থনৈতিক প্রভাব
অ্যাপ মার্কেট অ্যানালিটিক্স প্লাটফর্মগুলোর তথ্যমতে, গত এক বছরে অ্যাপল ও গুগল প্লে স্টোরে ‘AI’ শব্দটি যুক্ত অ্যাপের ডাউনলোড সংখ্যা প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে অ্যাপ স্টোরগুলো কেবল সেবার মাধ্যম নয়, বরং বিশাল এক আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে। প্রিমিয়াম সাবস্ক্রিপশন বা ‘ইন-অ্যাপ পারচেজ’-এর মাধ্যমে এআই অ্যাপগুলো এখন বিলিয়ন ডলারের বাজার তৈরি করছে।
সুবিধা ও ঝুঁকি
এআই অ্যাপের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো সময় ও শ্রম সাশ্রয়। আগে যে কাজ করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগত, এখন তা কয়েক মিনিটেই করা সম্ভব হচ্ছে। অফিসের রিপোর্ট লেখা, ডিজাইন তৈরি, অনুবাদ, ভিডিও সম্পাদনা কিংবা তথ্য বিশ্লেষণের মতো কাজ এখন অনেক সহজ হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, যাদের বিশেষ প্রযুক্তিগত দক্ষতা নেই তারাও এআই অ্যাপ ব্যবহার করে ভালো মানের কাজ করতে পারছেন। ফলে ছোট ব্যবসায়ী, ফ্রিল্যান্সার এবং শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রেও এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, কারণ শিক্ষার্থীরা সহজে তথ্য সংগ্রহ, ভাষা শেখা এবং জটিল বিষয় বুঝতে সাহায্য পাচ্ছেন।
ভবিষ্যতের এআই-নির্ভর অ্যাপ বাজার
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক বছরে এআইভিত্তিক অ্যাপের সংখ্যা আরও দ্রুত বাড়বে। স্বাস্থ্যসেবা, ব্যাংকিং, শিক্ষা, বিনোদন, ব্যবসাÑ সব ক্ষেত্রেই এআই অ্যাপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ভবিষ্যতে এমনও হতে পারে, অধিকাংশ স্মার্টফোন অ্যাপেই কোনো না কোনোভাবে এআই যুক্ত থাকবে। এখনকার অ্যাপ স্টোরগুলোতে যে এআই জোয়ার দেখা যাচ্ছে, তা শুধু সাময়িক প্রবণতা নয়। বরং এটি প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা দিচ্ছে। মানুষের কাজকে সহজ করা, সময় বাঁচানো এবং নতুন সৃজনশীল সুযোগ তৈরি করার মাধ্যমে এআই অ্যাপ ডিজিটাল জীবনকে বদলে দিচ্ছে।