পেপ্যাল
রকিবুল হাসান রকেট
প্রকাশ : ১৭ মে ২০২৬ ১৮:০০ পিএম
বর্তমান বিশ্বে ডিজিটাল অর্থনীতির মেরুদণ্ড বলা হয় অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেমকে। আর এই খাতে যে নামটি সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়, তা হলো ‘পেপ্যাল’ (PayPal)। ১৯৯৮ সালে যাত্রা শুরু করা এই মার্কিন প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে ২০০টিরও বেশি বাজারে তাদের সেবা পরিচালনা করছে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে তাৎক্ষণিক অর্থ আদান-প্রদান এবং নিরাপদ অনলাইন কেনাকাটার জন্য পেপ্যাল এখন বিশ্বস্ততার প্রতীক। তবে বাংলাদেশে এই সেবাটির পূর্ণাঙ্গ পথচলা এখনও আলোচনার টেবিলেই আটকে আছে।
পেপ্যালের সম্ভাবনা : ফ্রিল্যান্সিং ও ই-কমার্সের নতুন দিগন্ত
বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় অংশ এখন ফ্রিল্যান্সিং খাতের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সারদের শক্ত অবস্থান থাকলেও, উপার্জিত অর্থ দেশে আনার ক্ষেত্রে তারা প্রায়ই জটিলতার সম্মুখীন হন। পেপ্যাল চালু হলে এই চিত্রটি আমূল বদলে যেতে পারে। প্রথমত, পেপ্যাল থাকলে আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্টদের সঙ্গে লেনদেন করা অনেক সহজ ও সাশ্রয়ী হয়। অনেক বিদেশি বায়ার পেপ্যাল ছাড়া অন্য কোনো মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করতে চান না। ফলে পেপ্যাল না থাকায় বাংলাদেশের অনেক দক্ষ ফ্রিল্যান্সার কাজ হারান। এটি চালু হলে রেমিট্যান্স প্রবাহে নতুন জোয়ার আসবে। দ্বিতীয়ত, ক্রস-বর্ডার ই-কমার্সের কথা বলা যায়। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা (SME) সহজেই তাদের পণ্য বিদেশে সরাসরি বিক্রি করতে পারবেন এবং পেপ্যালের মাধ্যমে পেমেন্ট গ্রহণ করতে পারবেন। এটি কেবল রপ্তানি আয়ই বাড়াবে না, বরং গ্লোবাল মার্কেটপ্লেসে দেশের ব্র্যান্ডিংকেও শক্তিশালী করবে।
নিরাপত্তার চাদর
পেপ্যালের জনপ্রিয়তার প্রধান কারণ এর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ব্যবহারকারীর ব্যাংক তথ্য বা ক্রেডিট কার্ডের নম্বর সরাসরি বিক্রেতার কাছে পৌঁছায় না, যা সাইবার জালিয়াতির ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে দেয়। এ ছাড়া তাদের ‘বায়ার প্রোটেকশন’ বা ক্রেতা সুরক্ষা নীতি অত্যন্ত কড়া। যদি কোনো পণ্য অর্ডার করার পর তা হাতে না আসে বা ভুল পণ্য আসে, তবে পেপ্যাল সেই অর্থ ফেরত পেতে গ্রাহককে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করে।
চ্যালেঞ্জ যেখানে পাহাড়সম
এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে পেপ্যালের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম চালু হওয়ার পথে কিছু কাঠামোগত ও নীতিগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন : বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর ‘ফরেন এক্সচেঞ্জ রেগুলেশন অ্যাক্ট’ পেপ্যালের মতো গ্লোবাল প্লাটফর্মগুলোর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। পেপ্যালের নীতি হলো অর্থ কেবল গ্রহণ নয়, বরং তা বিদেশে পাঠানোর (Outward Remittance) সুবিধাও দেওয়া। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবং ডলার সংকটের কারণে অর্থ দেশের বাইরে পাঠানোয় ব্যাপক কড়াকড়ি রয়েছে।
মানি লন্ডারিং ও কমপ্লায়েন্স : অবৈধভাবে অর্থ পাচার বা মানি লন্ডারিং প্রতিরোধের ক্ষেত্রে পেপ্যাল এবং বাংলাদেশ ব্যাংকÑ উভয় পক্ষই অত্যন্ত কঠোর। পেপ্যাল কোনো দেশে প্রবেশের আগে সেই দেশের ব্যাংকিং সিস্টেমের স্বচ্ছতা ও ডিজিটাল অবকাঠামো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে। বাংলাদেশের অনেক ক্ষেত্রে ডাটা ক্লিনিং এবং স্বচ্ছতার অভাব পেপ্যালের মতো প্রতিষ্ঠানকে নিরুৎসাহিত করে।
বাজারের লাভজনকতা : পেপ্যাল একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। তারা যখন কোনো নতুন দেশে যায়, তখন সেখান থেকে সম্ভাব্য আয়ের হিসাবটি আগে কষে। বাংলাদেশের ব্যাংকিং চার্জ এবং ট্যাক্স সংক্রান্ত জটিলতা অনেক সময় তাদের প্রত্যাশার সঙ্গে মেলে না। বিকল্পের দাপট ও আগামীর ভাবনা পেপ্যালের অনুপস্থিতিতে বর্তমানে বাংলাদেশে পায়োনিয়ার (Payoneer) বা ওয়াইজের (Wise) মতো মাধ্যমগুলো বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে ‘জুম’ (Xoom) সেবার মাধ্যমে পেপ্যালের একটি সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তা পূর্ণাঙ্গ পেপ্যাল অ্যাকাউন্টের অভাব মেটাতে পারেনি। জুমের মাধ্যমে শুধু টাকা আনা যায়, কিন্তু অনলাইন কেনাকাটা বা ক্লায়েন্টের ইনভয়েস ম্যানেজমেন্ট করা যায় না।
তবে কেবল পেপ্যাল এলেই যে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, বিষয়টি তা নয়। প্রযুক্তির এই সময়ে ব্লকচেইন বা স্টেবলকয়েন-ভিত্তিক লেনদেনের যে জোয়ার আসছে, তাতে পেপ্যাল তার একাধিপত্য কতদিন ধরে রাখতে পারবে সেটিও একটি বড় প্রশ্ন। বিশেষজ্ঞের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংক যদি পেপ্যালের জন্য বিশেষ ‘রেগুলেটরি স্যান্ডবক্স’ বা নমনীয় নীতিমালা তৈরি করে, তবেই এই বহুজাতিক কোম্পানিটি বাংলাদেশে আসতে আগ্রহী হবে।
পরিশেষে, স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে ফ্রিল্যান্সার ও উদ্যোক্তাদের এই প্রাণের দাবি দীর্ঘদিনের। পেপ্যালের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জের এই ভারসাম্য রক্ষার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথ।