× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

চ্যাম্পিয়ন আমাদের রাফসান

গোলাম কিবরিয়া

প্রকাশ : ১৭ মে ২০২৬ ১২:২৫ পিএম

ফাউলার গ্লোবাল সোশ্যাল ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ ২০২৬-এ প্রথম হয়েছেন আহমেদ সাজিদান জারজিস (মাঝে)  ছবি: জারজিসের সৌজন্যে

ফাউলার গ্লোবাল সোশ্যাল ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ ২০২৬-এ প্রথম হয়েছেন আহমেদ সাজিদান জারজিস (মাঝে) ছবি: জারজিসের সৌজন্যে

একটা সড়ক দুর্ঘটনা- এক মুহূর্তে থেমে যাওয়া সময়, ভেঙে যাওয়া একটি পরিবারের গল্প। সেই দিনের পর থেকেই আহমেদ সাজিদান রাফসানের জীবন আর আগের মতো নেই; যেন মাঝখান দিয়ে টেনে দেওয়া হয়েছে এক অদৃশ্য রেখা- এক পাশে স্মৃতি, অন্য পাশে শূন্যতা। সেই দুর্ঘটনায় তিনি হারিয়েছেন তার সবচেয়ে আপন দুজন- মা আর বোনকে। শোকের ভাষা হয়তো সংক্ষিপ্ত, কিন্তু তার গভীরতা সীমাহীন। তারপর থেকে একটাই প্রশ্ন তাকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে বেড়ায়- ‘হারানোর ভেতর থেকেও কি কিছু সৃষ্টি করা যায়?’ এই প্রশ্নই তাকে থামতে দেয়নি। এই প্রশ্নই তাকে ভেঙে পড়া থেকে গড়ে ওঠার পথে ঠেলে দিয়েছে। আর আজ, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই তিনি পৌঁছে গেছেন বিশ্বমঞ্চে- যেখানে ব্যক্তিগত বেদনা রূপ নিয়েছে শক্তিতে, আর ক্ষতি হয়ে উঠেছে এক নতুন সূচনার ভিত্তি।

সম্প্রতি ক্যালিফোর্নিয়ার ইউনিভার্সিটি অব সান দিয়েগোতে অনুষ্ঠিত ফাউলার গ্লোবাল সোশ্যাল ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ-এ তিনি প্রথম পুরস্কার হিসেবে $২৫,০০০ ডলার অর্জন করেছেন। সেখানে ২৫টিরও বেশি দেশের উদ্যোক্তারা অংশ নেন। ফাইনালে ছিল এমআইটি এবং হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির মতো প্রতিষ্ঠানের টিম, যাদের অনেকেই ইতোমধ্যে বৈশ্বিক পর্যায়ে কাজ করছে। সেই প্রেক্ষাপটে এই স্বীকৃতি সাধারণ কোনো জয় না। এর আগে মিনেসোটাভিত্তিক ওলে কাপে তিনি $৭,৫০০ ডলার অর্জন করেছিলেন। সপ্তাহ শেষে দেখা যায়, এক সপ্তাহে $৩২,৫০০ ডলারের ফান্ডিং এসেছে তার এই উদ্যোগের জন্য। বর্তমানে এমআইটি এবং হার্ভার্ডের কিছু টিমের সঙ্গে সম্ভাব্য সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা চলছে।

পেশাগতভাবে সাজিদান রাফসান হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের ডানা-ফার্বের ক্যানসার ইনস্টিটিউটে ডাটা অ্যানালিস্ট হিসেবে কাজ করছেন। তার পাবলিক হেলথ বিষয়ক কাজ ইয়েল ইউনিভার্সিটিসহ বিভিন্ন একাডেমিক প্লাটফর্মে উপস্থাপিত হয়েছে। তার উদ্যোগ ApexStride Mobility Systems মূলত প্রস্থেটিক কেয়ারকে নতুনভাবে ভাবার চেষ্টা করছে, বিশেষ করে সেইসব প্রেক্ষাপটে, যেখানে খরচ, অ্যাক্সেস এবং বাস্তব ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা একসাথে কাজ করে। 

তারা এমন একটি সিস্টেম নিয়ে কাজ করছে, যেখানে 3D printing-এর মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করা হলেও ফোকাসটা শুধু টেকনোলজিতে না। তাদের ফোকাস হচ্ছে, ব্যবহারকারীর বাস্তব জীবনে সেটি কতটা কার্যকর হবে, তার ওপরে। ভবিষ্যতে একটি ভালো ল্যাব স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে তার। এই কাজটি সফল হলে, এটি প্রস্থেটিক সেবাকে আরও সাশ্রয়ী ও অ্যাক্সেসযোগ্য করার ক্ষেত্রে একটি কার্যকর মডেল হিসেবে দাঁড়াতে পারে, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য।

মা দিবসে আবেগঘন এক ফেসবুক পোস্টে সাজিদান রাফসান জানান, মা দিবসে পৃথিবীকে সেই মায়ের গল্পটা বলতে ইচ্ছে করছে, যিনি সারা জীবন মৃত্যুর, ক্যানসারের, আর অপমানের সঙ্গে যুদ্ধ করে শেষ পর্যন্ত নিজেকে পুড়িয়ে আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছিলেন।। কারণ আমি চাই মানুষ জানুকÑ  কিছু মা কখনও আলোয় আসেন না, কোনো পুরস্কার পান না, ইতিহাসের বইয়ে নাম ওঠে না; অথচ তারাই নিঃশব্দে এমন মানুষ তৈরি করে যান যারা একদিন পৃথিবীকে একটু ভালো করার চেষ্টা করে। আমি চাই বাংলাদেশের হাজারো সংগ্রামী মা নিজেদের এই গল্পের মধ্যে খুঁজে পান। আজ মানুষ যখন আমাকে গবেষণা, humanitarian work, আন্তর্জাতিক পুরস্কার, কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের Fowler Global Social Innovation Challenge-এ world champion হওয়া prosthetics technology Apex Stride-এর জন্য অভিনন্দন জানায়, তখন আমার মনে খুব অদ্ভুত লাগে। কারণ আমার চোখে সাফল্যের ছবি অন্যরকম।

আমার মনে পড়ে ঢাকা মেডিকেলের করিডোর। আদালতের সিঁড়ি। ক্যানসার ওয়ার্ডের গন্ধ। আর মনে পড়ে একজন মায়ের কথা, যিনি মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করতে করতেও নিশ্চিত করতেন তার ছেলে যেন সময়মতো SSC পরীক্ষা দিতে পারে। তিনি জানান, আমার মা, শিরিন এ. চৌধুরী। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষক। খুব সাধারণ একজন মানুষ। কিন্তু আমার দেখা সবচেয়ে সাহসী মানুষ। ক্যানসার এলো। একবার না, দুইবার না, তিনবার।

কেমোথেরাপি ধীরে ধীরে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্ত মানুষটাকে ক্ষয় করে দিচ্ছিল। চুল পড়ে যাচ্ছিল। শরীর ভেঙে যাচ্ছিল। কিন্তু মৃত্যুভয় থেকেও মা বেশি চিন্তা করতেন আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে। এসএসসি পরীক্ষার আগে ভোরে উঠে আমি মাকে গোসল করিয়ে দিতাম, খাইয়ে দিয়ে পরীক্ষায় যেতাম। হাসপাতালে বসে পড়তাম। অনেক রাত দেখেছি মা কেমোথেরাপি শেষে বাসায় ফিরে নিজের ব্যথা চেপে লেকচার নোট বানাচ্ছেন তার স্টুডেন্টসদের জন্য।

তবুও তিনি আমাকে বলতেন, তুমি পড়াশোনা চালিয়ে যাও। একদিন তুমি অনেক মানুষের কাজে লাগবে। UWC scholarship interview-এর দিনও মা অসুস্থ ছিলেন। patient apron-এর ওপর শাড়ি পরে আমার সঙ্গে interview দিতে গিয়েছিলেন। UWC পৃথিবীর সবচেয়ে prestigious international school systems-গুলোর একটি। interview board নাকি বলেছিল scholarship পুরোটা দেওয়া কঠিন হতে পারে। মা তখন সঙ্গে সঙ্গে বলেছিলেন, ‘আজ না হয় কাল, আমার ছেলে অনেক বড় কিছু হবে। তাকে না নিলে সেটা আপনাদের ক্ষতি।’

আজও কথাটা কানে বাজে। পরে সত্যিই আমি UWC-তে China আর Netherlands-এ পড়ার সুযোগ পাই। তারপর আমেরিকার prestigious liberal arts college St. Olaf College-এ scholarship নিয়ে আন্ডারগ্রাজুয়েট করি। আমার জীবনের এত বড় অংশ জুড়ে যে ক্যানসার ছিল, আজ আমি সরাসরি হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল-এর Dana-Farber Cancer Institute-এ কাজ করি। মাঝে মাঝে হাসপাতাল করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে শুধু মায়ের কথা মনে পড়ে।

কিন্তু ২০২২ সালে আমাদের জীবন পুরো বদলে গেল। ভারতে মেডিকেল চেকআপ শেষে রাস্তা পার হওয়ার সময় আমাদের সামনে এক্সিডেন্টটা হলো। আমি এখনও সেই শব্দ ভুলতে পারি না। কাচ ভাঙার শব্দ। মানুষের চিৎকার। রক্ত। আমার ছোট বোন সাজমিলাকে আমি নিজের হাতে ধরে রেখেছিলাম। সে শুধু কাঁপছিল।

সাজমিলা শুধু আমার বোন ছিল না। সে আমার দ্বিতীয় মা ছিল। মা যখন হাসপাতালে থাকতেন, সেই ছোটবেলা থেকে সে-ই আমাকে সামলেছে। আমার খাবার, আমার বই, আমার জীবনÑ সবকিছুর মধ্যে সে ছিল। আমি তাকে বাঁচানোর জন্য সব করেছি। সব। কিন্তু পরের দিন সে মারা গেল। আমি আজও ভুলতে পারি না সেই মুহূর্তটা। মনে হয় পৃথিবীটা হঠাৎ থেমে গিয়েছিল।

আর আমার মা? যে নারী তিনটা ক্যানসারকে হারিয়েছিলেন, তিনি নিজের মেয়ের মৃত্যুটা সহ্য করতে পারলেন না। পরের ৪০ দিন আমি মৃত্যুর সঙ্গে আমার মায়ের লড়াই দেখেছি। রেপিটেড হার্ট অ্যাটাক। তিনবার কোমাতে গিয়েছিলেন। তিনবার ফিরে এসেছিলেন।

কখনও কখনও মনে হতো, মা যেন মেয়ের কাছে চলে যেতে চাইছেন। আবার কখনও মনে হতো, তিনি শুধু আমাদের জন্য ফিরে আসছেন। শেষ দিকে তিনি কথা বলতে পারতেন না। শুধু চোখ দিয়ে তাকিয়ে থাকতেন। একদিন খুব কষ্ট করে আমাকে বলেছিলেন, ‘পৃথিবীর অন্য মা-বোনদের জন্য কাজ করো। টাকার পেছনে দৌড়াবে না।’ আরেক দিন আমার হাত ধরে বলেছিলেন, ‘মানুষের দোয়া যেন তোমার সবচেয়ে বড় সম্পদ হয়।’ ২২ আগস্ট ২০২২। আমার মা-ও চলে গেলেন। সত্যি বলতে, অনেক দিন আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারিনি। মনে হতো আমি আমার দুই মাকে বাঁচাতে পারিনি। নিজের এই সাফল্যের সময়ে মায়ের কথা স্মরণ করে আবেগতাড়িত এ তরুণ লেখেনÑ ‘আজ মানুষ হয়তো Apex Stride দেখে। শিরিন অ্যান্ড সাজমিলা ফাউন্ডেশন দেখে। ফ্লাড রিলিফ, রিফুজি রিহ্যাবিলিটেশন, ডিসেবিলিটি সাপোর্ট, জুলাই রেভল্যুশন-এর সময় প্রোটেস্টরদের পাশে দাঁড়ানো দেখে। কিন্তু আমি যখন এসব দেখি, তখন আমার শুধু মনে পড়ে কেমোথেরাপি শেষে বাসায় ফিরে আসা একজন মায়ের কথা, যিনি নিজের কষ্ট ভুলে ছেলেকে জিজ্ঞেস করতেন, ‘খেয়েছো?’ আমার মা কখনও ন্যাশনাললি ফেমাস হননি। তিনি নিজের জন্য কোনো পাবলিক ইমেজ বানাননি। কিন্তু বড় হতে হতে আমি বুঝেছি, কিছু মানুষ মনুমেন্ট রেখে যান নাÑ মানুষ রেখে যান। আমি আজ যা কিছু, তার শুরু একজন মায়ের অসম্ভব সাহস থেকে।

রাফসান প্রতিযোগিতার পুরস্কার হিসেবে পেয়েছেন ২৫ হাজার মার্কিন ডলার। তিনি প্রতিযোগিতায় একটি প্রস্থেটিক ডিভাইস উদ্ভাবনের ধারণা উপস্থাপন করেন, যা দক্ষিণ এশিয়ার স্বল্প সম্পদ ও জলবায়ু-সংবেদনশীল অঞ্চলে ব্যবহার উপযোগী। এই সাফল্যের জন্য তিনি ২৫ হাজার মার্কিন ডলারের পুরস্কার পান। বিচারকদের মতে, তার প্রকল্পটি বাস্তবসম্মত, টেকসই এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারযোগ্য সমাধান হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা