মাসুম মাহমুদ
প্রকাশ : ১৪ মে ২০২৬ ১৩:২৫ পিএম
অলংকরণ : নিশা আক্তার
এই মেঘ, এই রোদ। চলছে প্রকৃতির মিলিজুলি খেলা। আর চলছে মেহেরীমাদের বহন করা রিকশা। মেহেরীমা বাবার সাথে নিউমার্কেট যাচ্ছে। কিছু কেনাকাটা আছে। এমনিতে অনেক কথা বলে সে। এখন চুপচাপ। মেয়েকে এমন চুপচাপ থাকতে দেখলে বাবার কৌতূহল বেড়ে যায়! এই না মেয়ে মেঘের হয়ে কথা বলতে শুরু করে, রোদের হয়ে কথা বলতে শুরু করে। মেহেরীমার অভ্যেস আছে হঠাৎ ফুলের হয়ে কথা বলার, নদীর হয়ে কথা বলার। যখন যাকে মনে ধরে তার।
তাদের রিকশা কাঁটাবন মোড় পার হয়ে নীলক্ষেতের দিকে চলছে। এবারই প্রথম এই পথে যাচ্ছে মেহেরীমা। চারপাশে তাকিয়ে কত কী দেখছে! কত রকম মানুষ, কত রকম দোকান। ভালোই লাগছে তার। নতুন নতুন জায়গায় ঘুরতে ভালোই লাগে। হঠাৎ যেন শুনতে পেল কেউ তাকে ডাকছে। সাথে সাথে বলল, ‘রিকশা মামা, থামো থামো!’
ব্যস! মেহেরীমার বাবা বুঝে গেল মেয়ে এখন কারও হয়ে কথা বলতে শুরু করবে। কিন্তু কার! প্রবল কৌতূহলে রিকশাওয়ালার পিঠে হাত রেখে বলল, ‘বাম পাশে চাপিয়ে রেখে দিন, ভাই।’
রিকশা ভাড়া মিটিয়ে বাপ-বেটি সোজা চলে গেল একটি পেট শপে। দোকানের সামনে দাঁড়াতেই দেখতে পেল অনেক রকমের পশুপাখি। পশুপাখির বিভিন্ন পদের খাবার! খাঁচা, অ্যাকোয়ারিয়াম, মাছ, মাছের খাবার, বিড়ালের জন্য ক্যাট লিটার, সাপ্লিমেন্ট, বিড়ালের বিছানা, কলার, খেলনা। আরও আছে অসুস্থ পোষা প্রাণীর জন্য বিশেষ খাবার ও ওষুধ। সবকিছু ছাড়িয়ে মেহেরীমার চোখ আটকাল খাঁচায় বন্দি একটি পাখির দিকে। মেহেরীমাকে পাখিটার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে বাবা বলল, ‘এই পাখিটার নাম ককাটিল। এটি টিয়া আর কাকাতুয়াÑ দুইয়ের মিশ্রিত একটি পাখি। এই পাখিটা ভারী আরামপ্রিয়। আবার দুষ্টুও বটে। ভালোই দুষ্টুমি করতে পারে। চেষ্টা করলে ককাটিলকে কথা শেখানো সম্ভব। তবে কথার চেয়ে গান বেশি ভালো গাইতে পারে এই পাখি।’
পাখিটার নাম জানা হয়ে গেল মেহেরীমার। ককাটিল পাখি হয়ে কথাও বলতে শুরু করে দিল, ‘আমাকে নেবে তোমাদের সঙ্গে, মেহেরীমা?’
‘এমা! তুমি আমাদের সঙ্গে কোথায় যাবে? আমরা তো যাব নিউমার্কেট। চুলে বাঁধার ফিতে, পুতুল বানানোর মাটি, ছবি আঁকার রঙ আর আম্মুর জন্য কিছু সদাই কিনতে। তোমারও বুঝি এসব কিনতে হবে? তুমিও চুলে ফিতে বাঁধবে? পুতুল বানাবে? ছবি এঁকে রঙ করবে?’
‘আরে না না! ওসব কিছু নয়! আমি যাব তোমাদের বাড়ি!’
‘আমাদের বাড়ি! সেখানে একটা বারান্দায় সারাদিন খাঁচায় একা থাকতে ভালো লাগবে তোমার? তার চেয়ে এখানে কত ভালো আছ। তোমার আশপাশে লোকজন তো আছেই, চারপাশেও সারাদিন কত লোকের আনাগোনা দেখতে পাও।’
‘তা পাই বটে। তবে তার চেয়েও বেশি ভালো লাগবে তোমাদের বাড়ি গেলে।’
‘কেন বলো তো?’
‘রোজ সকালে আমি তোমার আম্মু, মানে খালামণির কণ্ঠে গান শুনতে পাব। গান শিখতে পারব। পাশের ছাদে যে জেঠুটা রোজ সকালে ব্যায়াম করে, তাকে দেখে দেখে আমিও ব্যায়াম করতে শিখে যাব। তোমার বারান্দার সামনে দিয়ে যাওয়া ইলেকট্রিকের তারে বসা কাকের সাথে গল্প করতে পারব। আর খুব ভালো লাগবে যখন খালামণি রান্না করবে, রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা তরকারির ঘ্রাণ নিতে পারব বুক ভরে। এবার বলো, নেবে তো আমায়?’
বলতে বলতে মেহেরীমা বাবার দিকে তাকাল। বাবা বলল, ‘কী নেবে?’
মেহেরীমা মাথা ঝাঁকাল। বলল, ‘হ্যাঁ।’
খাঁচায় করে ককাটিল পাখিটা নিয়ে তারা ফের রিকশায় উঠল। পাখি পাওয়ার আনন্দে আজ নিউমার্কেট যাওয়া বাতিল। গন্তব্য সোজা বাড়ি। কাঁটাবন মোড় পেরিয়ে রিকশা হাতিরঝিল বাজারের দিকে যাচ্ছে। চারপাশে অসংখ্য গাড়ির হর্নে কান ঝালাপালা তাদের। পাখিটারও নিশ্চয়! মেহেরীমা নিজের দুই হাত কানের ওপর রেখে মনে মনে ভাবল, পাখিটার কান থাকলে বোধহয় সেও কান ধরে রাখত শব্দদূষণ থেকে বাঁচতে। ভাবতে ভাবতে কথা বলতে শুরু করল, ‘ও মেহেরীমা! তোমার এই পাখিটা আমায় দিয়ে দাও। জানোই তো তোমাদের ওই অতটুকু বারান্দা নই আমি। আমি অবারিত, দৃশ্যমান, বন্ধনহীন। আমায় দিয়ে দিলে পাখিটাকে আর বারান্দায় খাঁচায় বন্দি থাকতে হবে না। শুধু খালামণির কণ্ঠে কেন, আমাতে উড়ে উড়ে কতজনের গান শুনতে পাবে পাখি; পাহাড়ের গান, সমুদ্রের গান, গাছেদের গান। আর শুধু কি খালামণির করা রান্নার ঘ্রাণ! পাখি উড়ে উড়ে বুক ভরে মেঘের ঘ্রাণ নেবে, রোদের ঘ্রাণ নেবে, হাওয়ার ঘ্রাণ নেবে। পাখিকে ওড়া ওড়া ব্যায়াম করতে দেখে পাশের ছাদের জেঠু নিজেই আরও উৎসাহী হবে ব্যায়াম করতে। শুধু ইলেকট্রিকের তারে বসা কাকেরা কেন! পাখি গল্প করবে ফুলের সাথে, ফলের সাথে, ঘাসের সাথে, মাটির সাথে। এবার বলো, দেবে তো আমায়?’
বলতে বলতে মেহেরীমা বাবার দিকে তাকাল। বাবা বুঝে গেছে মেয়ে এতক্ষণ আকাশের হয়ে কথা বলছিল। বলল, ‘কি, দেবে?’
মেহেরীমা মাথা ঝাঁকাল। বলল, ‘হ্যাঁ।’
সাথে সাথে বাবা খাঁচার বাঁধনটা খুলে দিল। মেহেরীমা তার কচি হাতের মুঠোয় ভরে খাঁচা থেকে বের করে আনল পাখিটা। হাসতে হাসতে উড়িয়ে দিল তাকে। অসীম আকাশে পাখিটা ভাসতে ভাসতে শূন্যে মিলিয়ে গেল।