সৌন্দর্যময় চা বাগান
রাসেল আহমেদ
প্রকাশ : ১৩ মে ২০২৬ ১৩:১৭ পিএম
চা পাতা সংগ্রহে নারী শ্রমিকরা ছবি : মোসাব্বির হোসাইন
প্রকৃতির সবুজ চাদরে মোড়ানো চা বাগান শুধু ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষী নয়। প্রায় দেড়শ বছর ধরে সেখানে বসবাসরত লাখ লাখ চা শ্রমিকের ঘামে-শ্রমে প্রতি বছর কোটি কোটি কেজি চা উৎপাদন হলেও আজও দরিদ্রতার সঙ্গে সংগ্রাম করতে হচ্ছে তাদের। কিন্তু তাদের মৌলিক অধিকার, নিজস্ব ভূমি থেকে শুরু করে জীবনযাত্রার কোনো বদল হয়নি আজও। অনেক ন্যায্য দাবিদাওয়া থেকে আজও তারা বঞ্চিত হচ্ছেন।
চা দেশের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি হচ্ছে বিদেশেও। সেই শিল্পে নিরলসভাবে শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন দেশের মোট নিবন্ধিত ১৭১টি চা বাগানের লক্ষাধিক চা শ্রমিক। তাদের পরিবার-পরিজন মিলিয়ে চা শ্রমিক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ১০ লাখের ওপরে। বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের তথ্যমতে, সারা দেশে কর্মরত চা শ্রমিকদের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার। তার মধ্যে নারী শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৬০ শতাংশ। দেশের মোট চা বাগানের মধ্যে ৯২টি বাগান রয়েছে মৌলভীবাজার জেলায়। এসব চা বাগানে নিয়মিত-অনিয়মিত মিলিয়ে কাজ করছেন প্রায় ৯০ হাজার চা শ্রমিক। তাদের মধ্যে বাগানে পাতা তোলার কাজ করেন নারী শ্রমিকরা। আর ফ্যাক্টরিসহ অন্যান্য কাজ করেন পুরুষরা।
বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে ১৭১টি বাণিজ্যিক চা বাগান রয়েছে (০৫.১০.২০২৫ তারিখ পর্যন্ত)। দেশের অধিকাংশ চা বাগান মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সিলেট জেলায় অবস্থিত।

চা শিল্পের দুইশ বছর
শিল্পের মোড়কে মধ্যযুগীয় শ্রমদাসত্বে বন্দি জীবন। ১৮৫৪ সালে সিলেটের মালনীছড়া চা বাগানে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে চা উৎপাদন শুরু হয়। এর পরপরই ১৭৫৭ সালে ব্রিটিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক বাংলা-বিহার-ওড়িশাকে পদানত করে কোম্পানি রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করে। এ সময় ব্রিটেনে শিল্পবিপ্লব শুরু হয়েছে। এমন এক প্রেক্ষাপটে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৮৪০-৫০-এর দশকে সিলেট তথা আসামে লাভজনক চা উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ভারতের বিহার, মাদ্রাজ, উত্তর প্রদেশ, ওড়িশা প্রভৃতি অঞ্চল থেকে কানু, তেলেগু, লোহার, রবিদাস, গোয়ালাসহ প্রায় ১১৬টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে চা বাগানের শ্রমিক হিসেবে বাংলাদেশে নিয়ে এসেছিল।
ব্রিটিশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের নলেজ, এভিডেন্স অ্যান্ড লার্নিং ফর ডেভেলপমেন্টের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে চা বাগানের কর্মীদের নিয়ে আসা হতো। তাদের বেশিরভাগ ছিলেন গরিব এবং দুর্বল, সাধারণত নিম্নবর্ণের হিন্দু বা সম্প্রদায়ের বাসিন্দা।
মূলত প্রলোভন, ভয় দেখিয়ে, অপহরণ করে, ভুল বুঝিয়ে, অনেক সময় সহিংসতার মাধ্যমে বাসিন্দাদের ধরে আনা হতো। সেসময় কলকাতায় শ্রমিক সংগ্রহের কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছিল। তাদের এনে প্রথমে এসব কেন্দ্রে জড়ো করা হতো। এই শ্রমিকদের বলা হতো কুলি। এরপর সেখান থেকে শ্রমিকদের চা বাগানগুলোয় পাঠিয়ে দেওয়া হতো। যারা এগুলো করত, তাদের বলা হতো আরকাত্তি বা আড়কাঠি।
এরপর ঔপনিবেশিক ভারতে ব্রিটিশ কোম্পানি এককভাবে চায়ের বিশ্ববাজার প্রতিষ্ঠা ও অধিকতর মুনাফার লক্ষ্যে চা শিল্প গড়ে তোলার প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হয়। এজন্য প্রয়োজন পড়ে শ্রমিক, আর শ্রমিক, আরও আরও বেশি শ্রমিক। তাই ক্রমান্বয়ে ভারতের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর গরিব কৃষকদের জোরপূর্বক ধরে এনে বাগানে জড়ো করে দাসত্বে বন্ধনে আড়িকাঠি ও গিরমিট প্রথা দ্বারা আবদ্ধ করে।
চা শ্রমিকদের ওই অভিবাসন ছিল অনেকটা দাস ব্যবসার মতো। বাগান মালিকরা তাদের সম্পত্তি বলে মনে করতেন, মালিকরাই তাদের স্বাধীনতা নির্ধারণ করতেন, তাদের বিভিন্ন বাগানে আনা-নেওয়া করা হতো। তাদের এমনকি বাগানের বাইরে যেতে দেওয়া হতো না।
এসব প্রথার কারণে চা ম্যানেজার এই অসহায় মানুষগুলোর ওপর একচ্ছত্র নির্যাতন করার অধিকার পায়। কোনো শ্রমিক ইচ্ছে করলেই চাকরি থেকে ইস্তফা দিতে পারতেন না। বাগান থেকে পালিয়ে গেলে তাদের ধরে আনা হতো। দেওয়া হতো অমানবিক শাস্তি, যা অপরাধ হিসেবে গণ্য হতো। চাবুক-বুটের লাথি ছিল এই নিরীহ মানুষগুলোর নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। এভাবে মালিকদের হাতে শ্রমিকের মৃত্যুকেও সাধারণ ঘটনা হিসেবে দেখা হতো। মালিকদের কথাই সেখানে রাষ্ট্রীয় আদেশ হিসেবে গণ্য হতো। শ্রমিকদের ইচ্ছা-অনিচ্ছা বলতে কোনো কিছু কল্পনাই করা যেত না। বাগানের ভেতরে ছাতা মাথায় হাঁটাও অপরাধ হিসেবে গণ্য হতো। একই সময়ে গড়ে ওঠা শহরগুলোর পয়ঃনিষ্কাশন ও পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থাপনার জন্য গরিব কৃষকদের একইভাবে নিয়ে এসে বানানো হয় পরিচ্ছন্নতাকর্মী।
এভাবে শুরু হয় মজুরি দাসত্বের যুগ বা পর্যায়। পুঁজিবাদ বিকাশের যুগে ভারতে যেমন এই ঘটনা ঘটানো হয়, তেমনি ইউরোপের বিভিন্ন দেশের কোম্পানিগুলো আফ্রিকা থেকে মানুষ ধরে জাহাজভর্তি করে আমেরিকায় নিয়ে গিয়ে দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে। এসব দাস ব্যবসায়ীরা আহত নিহত মৃত দাসদের আটলান্টিক মহাসাগরে ভাসিয়ে দেওয়া ছিল যুক্তরাষ্ট্রের দাসদের ইতিহাস। সুতরাং এতদ্বাঞ্চলের চা শিল্পের শ্রমিকদের এবং শ্রমিক আন্দোলনকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না, রবং তা হচ্ছে মজুরি দাসত্ব এবং শ্রম-পুঁজির দ্বন্দ্বের অপরিহার্যতা।
মৃত্যুর মিছিলে শিল্পের সূচনা
চা শ্রমিক শিল্পীয় শ্রমিক হিসেবে গড়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় পাহাড়-জঙ্গল পরিষ্কার করে চা আবাদের উপযোগী করতে গিয়ে বাঘ-ভাল্লুকসহ বন্য প্রাণীর আক্রমণ, সাপের বিষাক্ত ছোবল, রক্তচোষা জোঁকের কামড়, মশার কামড় ইত্যাদিতে অগণিত শ্রমিকের প্রাণের বিনিময়ে গড়ে ওঠে চা শিল্প।
দাসত্বের শেকল ছেঁড়ার পণ, মুল্লুকে ফিরে যেতে গিয়েও হলো না ফেরা
নির্মম শোষণ অমানুষিক নির্যাতন মানবেতর জীবন-জীবিকায় অতিষ্ঠ বিক্ষুব্ধ চা শ্রমিকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন-সংগ্রাম গড়ে তুললেও মজুরি দাসত্বে জীবন যন্ত্রণা থেকে বের হতে না পেরে অবশেষে আগের জীবনে ফিরে যাওয়ার প্রবণতা তীব্রতর হয়।
ওই সময়ে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে গড়ে তোলা রাজনৈতিক দল কংগ্রেস ও মুসলিম লিগের তথাকথিত ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রভাবও সামনে থাকে। কংগ্রেসের অভ্যন্তরে গান্ধীর শান্তিবাদী অহিংস নীতির বিপরীতে সহিংস সন্ত্রাসবাদী স্বদেশি আন্দোলনের প্রভাব থাকে বঙ্গদেশ ও আসামে।
উনিশশ একুশ সালের ২০ মে ১২ হাজার চা শ্রমিক জন্মভূমিতে ফেরত যাওয়ার উদ্দেশ্যে সিলেট ও আসামের বিভিন্ন বাগান থেকে এসে চাঁদপুরে জড়ো হন। সেখান থেকে স্টিমারে করে গোয়ালন্দে পৌঁছে রেলে করে তারা জন্মভূমিতে ফিরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে তখনকার ইউরোপিয়ান টি অ্যাসোসিয়েশন ও স্থানীয় ম্যাজিস্ট্রেট। তাড়াহুড়ো করে স্টিমারে উঠতে গিয়ে অনেকে পদদলিত হয়ে মারা যান।
হিস্টোরি অব টি গার্ডেনস অ্যান্ড টি ওয়ার্কার্স অব বাংলাদেশ বইয়ে রিয়াদ মাহমুদ ও আলিদা বিনতে সাকি লিখেছেন, বাকিরা আর বাগানে না ফিরে চাঁদপুর থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু সেখানে তাদের মধ্যে কলেরা ছড়িয়ে পড়ে।
তখন সরকার কলেরা ঠেকানোর নামে বিদ্রোহ দমনের চেষ্টা করে। রাতের বেলায় গুর্খা সৈন্যরা তাদের ওপর হামলা করে এবং গুলি চালায়। সেদিনই প্রায় ৩০০ চা শ্রমিক নিহত হন। সেই ঘটনার পর থেকে আর কখনও নিজেদের জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করেননি চা শ্রমিকরা।
এই হত্যাযজ্ঞ বঙ্গদেশ-আসামসহ সমগ্র ভারতবর্ষ এমনকি ব্রিটেনে আলোড়ন সৃষ্টি করলেও ব্রিটিশ সরকার চা শ্রমিকদের চা বাগানে ফিরে যেতে বাধ্য করে। এভাবে চা শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকদের প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-উত্তরকাল অগ্রসর হয়। এর ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও বিশ্বযুদ্ধ-উত্তরকাল, দেশভাগ এবং পাকিস্তান আমলে চা কোম্পানির নির্মম শোষণ নির্যাতনে মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হন চা শ্রমিকরা।
ঘর আছে, জমি আছে, নেই মালিকানাস্বত্ব
চা শ্রমিকদের উল্লেখযোগ্য সমস্যা হলো ভূমি অধিকারের অভাব। এই জনগোষ্ঠীর নিজস্ব জায়গা-জমির কোনো আইনগত দলিল না থাকায় তারা নানাবিধ আর্থসামাজিকের মুখোমুখি হচ্ছেন।
শুরু থেকে তারা বাগান শ্রমিক। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের বংশধররা একই বাগানে কাজ করে আসছেন, কিন্তু জমির মালিকানার স্বীকৃতি পাননি। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ ও পরবর্তীতে পাকিস্তান আমলে তাদের শুধুমাত্র শ্রমিক হিসেবেই দেখা হতো, স্থানীয় সম্প্রদায়ের অংশ হিসেবে নয়। ফলে তারা ভূমিহীন হয়ে পড়েন। স্বাধীনতার পরও এই ব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। বরং রাষ্ট্রীয়করণের পর বাগানগুলো সরকারি মালিকানায় এলেও শ্রমিকদের ভূমি অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। পরবর্তীতে বেসরকারীকরণের মাধ্যমে বাগানগুলো আবার ব্যক্তিগত মালিকানায় ফিরে গেলেও শ্রমিকদের অবস্থান অপরিবর্তিত থেকে যায়।
বাংলাদেশের ভূমি আইন ফ্রেমওয়ার্কে চা শ্রমিকদের ভূমি অধিকার অস্পষ্ট। ভূমি সংস্কার আইন, ২০২৩-এ বর্গাচুক্তি ও চাষাবাদ সংক্রান্ত বিধিনিষেধ রয়েছে, কিন্তু চা শ্রমিকদের ভূমি অধিকারের সরাসরি উল্লেখ নেই। অন্যান্য প্রাসঙ্গিক কানুনে, যেমন বাংলাদেশ চা শ্রমিক কল্যাণ তহবিল আইন, ২০১৬, তাদের ওয়েলফেয়ারের কথা বলে, কিন্তু ভূমি অধিকার নয়। ভূমি আপিল বোর্ড বিধিমালা, ২০২৫ ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির রুলস করেছে, কিন্তু চা বাগানের শ্রমিকদের জন্য নির্দিষ্ট বিধান নেই।
ভূমির দলিল না থাকায় চা শ্রমিকরা ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিতে পারেন না। জমিকে জামানত হিসেবে রাখার সুযোগ না থাকায় তারা ক্ষুদ্র ব্যবসা, শিক্ষা বা স্বাস্থ্যসেবার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংস্থান করতে পারেন না। এর ফলে দারিদ্র্যের চক্র থেকে বের হওয়া তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতি-ভূমিহীনতার যন্ত্রণা : বর্তমানে চা শ্রমিকরা বাগানের জমিতে কেবল ‘অনুমতিপ্রাপ্ত বাসিন্দা’ হিসেবে বসবাস করেন। তাদের কোনো দলিল, পাট্টা বা আইনগত মালিকানা নেই। ১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন অনুযায়ী খাসজমির ওপর তাদের কোনো অধিকার স্বীকৃত নয়। এমনকি তারা যে ঘরবাড়ি নির্মাণ করেছেন, যে জমি চাষ করেন, তার কোনোটিতেই তাদের আইনগত অধিকার নেই।
স্বাস্থ্যঝুঁকির পরিসংখ্যানে শীর্ষে চা শ্রমিক
চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে দেশের চা শ্রমিকরা। কুষ্ঠ, ম্যালেরিয়া ও জরায়ূ ক্যানসারের সঙ্গে তাদের বসবাস। চা শ্রমিকদের মধ্যে ১৫ শতাংশ নারী প্রাথমিকভাবে জরায়ুমুখে ক্যানসারে আক্রান্তÑ এমন ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে গবেষণামূলক সংস্থা সিআইপিআরবির এক জরিপে। দেশে মোট চা বাগান ১৬৪টি। এতে প্রায় ৮ লাখ জনগোষ্ঠীর অর্ধেক নারী শ্রমিক।
এই অর্ধেক নারী শ্রমিকের ১৫ শতাংশের শরীরে বাসা বেঁধেছে মরণব্যাধি ক্যানসার। মৌলভীবাজারের রাজঘাট, খেজুরীছড়া, আমরাইলছড়া, সাতগাঁও, হোসেনাবাদ, আলীনগর, শমসেরনগর, মিরতিংগা, মাধবপুরসহ ১০টি বাগানে পরিচালিত এক জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেহেতু দেশের সব চা বাগানে একই কাজ ও বাসস্থানের পরিবেশ বিদ্যমান, সেহেতু চা বাগানগুলোতে একই অবস্থা থাকার সম্ভাবনা প্রবল।
ইতোমধ্যে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) অর্থায়নে জাতীয় স্বাস্থ্য উন্নয়ন ও গবেষণামূলক সংস্থা সিআইপিআরবির কারিগরি সহযোগিতায় ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে মৌলভীবাজার জেলার চা বাগানে প্রজনন ও মাতৃস্বাস্থ্য সেবার মান উন্নয়নে বিবাহিত নারীদের জরায়ুমুখের ক্যানসার শনাক্তকরণের জন্য বিনামূল্যে ভায়া টেস্ট কার্যক্রম শুরু হয়েছে। মৌলভীবাজার জেলার ফাঁড়ি বাগানসহ ৯৩টি চা বাগানের মধ্যে দশটি চা বাগানে মোট তিন হাজার নারীর ভায়া টেস্ট সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে ৫১৯ জন দুরারোগ্য ক্যানসার নামক ব্যাধিটি পজিটিভও এসেছে। এই ভায়া টেস্টের যে ভয়াবহ ফলাফল এসেছে তা চমকে দেওয়ার মতো। তথ্যমতে, চা বাগানে কর্মরত নারীদের শতকরা ১৫ জনের জরায়ুমুখে ক্যানসারের লক্ষণ পাওয়া গেছে। এই কার্যক্রমে অংশ নেওয়া নারীরা সাধারণত ২১ থেকে ৬৫ বছরের।
বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডে বসবাসকারী পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর নাম চা শ্রমিক। যেসব কারণে নারীদের জরায়ুমুখের ক্যানসার হয় তার সব লক্ষণ রয়েছে চা বাগানে। দিনের পর দিন চা বাগানের শ্রমিকরা তাদের স্বাস্থ্যসেবাসহ মৌলিক অধিকার নিয়ে আন্দোলন করেও স্বাভাবিক জীবন পাচ্ছেন না। চা বাগানে শিক্ষার অভাব থেকে ক্যানসার তথা স্বাস্থ্য নিয়ে অসচেতনতা, কাজের নোংরা পরিবেশ, অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্নতা; যা জরায়ুমুখে ক্যানসারের জন্য দায়ী।
দেশে যক্ষ্মা, কুষ্ঠ, ম্যালেরিয়া ও জরায়ু ক্যানসারের প্রবণতাও চা শ্রমিকদের মধ্যে বেশি বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। মৌলভীবাজার জেলায় প্রতি বছর যে পরিমাণ যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত হয়, এর অন্তত ৩৬ শতাংশ চা জনগোষ্ঠীর মানুষ। মৌলভীবাজার সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জেলায় গত চার বছরে ১৯ হাজার ১১৪ যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত হয়। এর মধ্যে শুধু চা বাগানের বাসিন্দা ৭ হাজার ২২০ বা ৩৬ শতাংশের বেশি।
কুষ্ঠরোগের চিত্রটা আরও ভয়াবহ। গত চার বছরে মৌলভীবাজারে ৭৬১ কুষ্ঠরোগী শনাক্ত হয়। এর মধ্যে ৬৩১ জনই চা বাগানের বাসিন্দা। মোট শনাক্তের ৮৩ ভাগই চা জনগোষ্ঠীর মানুষ।
২০১৯ সালে সিলেট অঞ্চলের চা বাগানগুলোর স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে প্রথমবারের মতো জরিপ চালায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বুরো (বিবিএস)। জরিপের তথ্যানুযায়ী, অপুষ্টির কারণে চা বাগানের ৪৫ শতাংশ শিশুই খর্বকায়। ২৭ শতাংশ শীর্ণকায়। স্বল্প ওজনের শিশু ৪৭ দশমিক ৫ শতাংশ। তা ছাড়া ১৮ বছরের আগে বিয়ে হয়ে যাচ্ছে ৪৬ শতাংশ কিশোরীর এবং মা হয়ে যাচ্ছে ২২ শতাংশ। এ ছাড়া ন্যূনতম স্যানিটেশন সুবিধা নেই ৬৭ শতাংশ পরিবারের।
অনুন্নত জীবন ও পরিমিত খাবারের অভাবে অপুষ্টিতে ভোগে চা শ্রমিকরা। এ কারণে এদের মধ্যে যক্ষ্মা, কুষ্ঠরোগের হার তুলনামূলক বেশি। তা ছাড়া কোনো রোগ হলে তারা সহ্য করে চাপিয়ে রবে। অসহ্য না হলে চিকিৎসকের কাছে আসেন না, কারণ ওই দিনের মজুরি পাওয়া যাবে না এই ভয়ে। যার কারণে তাদের রোগ শনাক্ত হয় অনেক দেরিতে, অনেক জটিলতাসহ। তবে আমরা বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে চা বাগানে গিয়ে রোগ নির্ণয়ের কাজ করছি, যার কারণে রোগ শনাক্তের হার বেড়েছে।
বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা ২০১৫-এর বিধি ৯৬, তফসিল ৫ চা বাগানের লোকদের জন্য চিকিৎসাসেবা সম্পর্কিত সব নির্দেশনাই দেওয়া আছে। প্রত্যেক বাগানে ক্লিনিক বা হাসপাতাল, চিকিৎসক, মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ধাত্রী, ইনডোর ও আউটডোর চিকিৎসা সুবিধার কথা বলা হয়েছে। তবে বাস্তবে চা বাগানে চিকিৎসাসেবার স্বরূপ আজও বায়বীয়।