কামরুজ্জামান বাঁধন, মির্জাগঞ্জ
প্রকাশ : ১৩ মে ২০২৬ ১৩:১৫ পিএম
মাটির চুলা বিক্রি করে চলে খাদিজার সংসার
জীবন-জীবিকার দৈনন্দিন রুটিনে গৃহিণীদের জন্য রন্ধনশালায় চুলার ব্যবহার অপরিহার্য। আধুনিকতার ছোঁয়ায় বর্তমানে বিভিন্ন কোম্পানির স্টিল ও বিদ্যুৎ চালিত কাচের চুলার ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসেছে আমাদের একসময়ের গ্রামীণ ঐতিহ্য মাটির চুলা। সেসব ঐতিহ্য এখন মানুষের মুখে মুখে বা কল্পকাহিনীতে শোনা যায়। মাটির চুলার দেখা পাওয়া এখন প্রায় দুষ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এখনও কিছু কিছু মানুষ এসব ঐহিত্য ধরে রেখেছেন জীবন বাঁচানোর তাগিদে। গ্রামীণ ঐতিহ্য ‘মাটির চুলা’ বানানোর এমনি একজন কারিগর মোসা. খাদিজা বেগম (৪৮)। তিনি পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার ঝাটিবুনিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা।
সরেজিমন দেখা যায়, আশ্রয়ণ প্রকল্পের পাশে শ্রীমন্ত নদের বাঁধের ওপর নানা রকমের মাটির চুলা বানিয়ে সাজিয়ে রেখেছেন। মাটির চুলা পছন্দ হলে ক্রেতারা ক্রয় করে নিয়ে যাচ্ছেন বাড়িতে। জানা যায়, মাটির চুলা তৈরি করতে নদীর পাড়ে জমির এঁটেল মাটি প্রয়োজন হয়। এ মাটির চুলা খুব শক্ত হয় এবং সহজে ভাঙে না। প্রতিটি চুলায় সাধারণত একটি করে জ্বালানি প্রবেশের মুখ থাকে। যেসব চুলায় একটি হাঁড়ি বা পাতিল বসানো যায়, সেটি একমুখো চুলা আর যে চুলায় দুটি হাঁড়ি বা পাতিল বসানো যায়, সেগুলো দুমুখো চুলা বলা হয়। দুমুখো মাটির চুলা দিয়ে সাধারণত গ্রামের বাড়িতে ধান সিদ্ধ করাসহ নানা কাজে ব্যবহার করা হয়।
মাাটির চুলার কারিগর মোসা. খাদিজা বেগমের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, আমাদের জমিজমা নেই, তাই আশ্রয়ণ প্রকল্পে পাওয়া ঘরে সবাইকে নিয়ে বসবাস করছি। স্বামী একটি দুর্ঘটনায় হা-পা ভেঙে যাওয়ায় দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন। আমার পরিবারে ৩ মেয়ে ও এক পুত্রসন্তান রয়েছে। দুই মেয়েকে ধারদেনা করে বিবাহ দিয়েছি, ছোট মেয়েটি একটি মাদ্রাসার অষ্টম শ্রেণিতে এবং একমাত্র ছোট ছেলেটি আরেকটি মাদ্রাসায় হেফজতে পড়াশোনা করছে। টাকার অভাবে মেয়েকে এবারে মাদ্রাসা থেকে নিয়ে এসেছি। এখন সরকারি বিদ্যালয়ে ভর্তি করাব। সেখানে টাকা-পয়সা তো লাগে না। স্বামী এখন কিছুটা সুস্থ হওয়ায় স্থানীয় একটি নার্সারিতে গাছের পরিচর্যার কাজ করাসহ মানুষের বাড়িতে দৈনিক হাজিরায় শ্রমিকের কাজ করেন। স্বামীর উপার্জনে সংসার চালানো কষ্ট হয়, তাই বাড়তি আয়ের জন্য গত বছর থেকে মাটির চুলা বানানোর কাজ শুরু করেছি। এতে আয় ভালো হয়।
মাটির চুলা সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, আমি বিভিন্ন প্রকারের মাটির চুলা তৈরি করতে পারি। এতে নদীর তীরের লাল বা এঁটেল মাটি হলে চুলা বানাতে ভালো হয়। ক্রেতারা যে ডিজাইনের বলে দেন, সেভাবে তৈরি করতে পারি। এ ছাড়া মাটির চুলা বানিয়ে (তৈরি) রাখি, ক্রেতারা এসে পছন্দমতো নিয়ে যান। এলাকাভিত্তিক মাটির চুলার একাধিক নাম রয়েছে। প্রতিটি চুলা ২০০-২৫০ টাকায় বিক্রি করি। মজার বিষয় হলোÑ মাটির চুলা বিক্রি বাকিতেও দিতে হয়। নদীর মাটি আর নিজের পরিশ্রম দিয়ে মাটির চুলা তৈরি করি। স্বামীর পাশাপাশি সংসারে এখন ভালো বাড়তি আয় হচ্ছে। তবে এখন মানুষ গ্যাসের চুলা ব্যবহারের ফলে আমার এ মাটির চুলার কদর কমে গেছে। এখন আগের মতো মানুষ আর মাটির চুলা কিনতে আসে না। গ্রামের কিছু কিছু পরিবারে এখনও মাটির চুলায় রান্না করে। কারণ মাটির চুলার রান্নার খাবারের স্বাদ অনেক ভালো হয়।