দেশের প্রথম ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা জাদুঘর
আশরাফুল ইসলাম কহিনুর, হবিগঞ্জ
প্রকাশ : ১৩ মে ২০২৬ ১৩:১২ পিএম
আপডেট : ১৩ মে ২০২৬ ১৩:১৮ পিএম
১৯৬৮ সালে হবিগঞ্জ শহরের প্রেস ক্লাব রোডে গড়ে ওঠা আহরণী জাদুঘর
অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে দেশের প্রথম ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা হবিগঞ্জের আহরণী জাদুঘরটি। বিশাল সংগ্রহশালার এ জাদুঘরের সম্পদ ৫৫ বছর আগেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থানান্তর করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধকালীন লুটও হয়েছে অনেক দুর্লভ সংগ্রহ। এখন সেটির অস্তিত্ব টিকে আছে প্রজ্ঞানী নামে একটি গ্রন্থাগারের মধ্যে। বরেণ্য সাহিত্যিক দেওয়ান গোলাম মোর্তাজা প্রতিষ্ঠিত বিশাল সংগ্রহশালার গ্রন্থাগারটির অবস্থা বেশ জীর্ণশীর্ণ। রক্ষণাবেক্ষণ আর প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে নষ্ট হচ্ছে দুর্লভ বইয়ের অমূল্য ভান্ডার। কবি বাসার লাইব্রেরির (গ্রন্থাগার) কথা লোকে জানলেও আহরণী জাদুঘর সম্পর্কে সেভাবে কেউ জানেন না।
এক সময় লোকে লোকারণ্য কবি বাসার লাইব্রেরিটি এখন অনেকটাই পাঠকশূন্য। সাহিত্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি ছাড়া কারও সেভাবে যাতায়াত নেই। ফলে মানুষ একরকম ভুলতে বসেছে বরেণ্য এ সাহিত্যিককে। মহান এই ব্যক্তির লেখা বই ভারতের গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমফিল কোর্সে পাঠ্য হিসেবে পড়ানো হয়। বইগুলোর মধ্যে রয়েছে- ব্রাহ্মী লিপি ও সম্রাট প্রিয়দর্শী এবং বর্ণমালার বোধন বিকাশ ও লিপি সভ্যতার ইতিহাস। ১৯৬৮ সালে হবিগঞ্জ শহরের প্রেস ক্লাব রোডে নিজ বাসার একটি কক্ষে আহরণী জাদুঘর ও প্রজ্ঞানী পাঠাগার গড়ে তোলেন তিনি।
এ ব্যাপারে মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর হবিগঞ্জের কৃতি সন্তান প্রফেসর ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক বলেন, বাংলা ভাষা, লিপি ও সংস্কৃতি গবেষক ভাষা সংগ্রামী দেওয়ান গোলাম মোর্তাজা প্রতিষ্ঠিত ‘প্রজ্ঞানী পাঠাগার’ ও ‘আহরণী জাদুঘর’ বাংলাদেশ তথা পূর্ব পাকিস্তানে ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা প্রথম প্রতিষ্ঠান। আহরণী জাদুঘরে অনেক দুর্লভ ও মহামূল্যবান সংগ্রহ ছিল। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় এ জাদুঘর পাকবাহিনীর আক্রমণের শিকার হলে অনেক সংগ্রহ ধ্বংস হয়ে যায়। পরবর্তীতে আহরণী জাদুঘরের সব সংগ্রহ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জাদুঘরে প্রদর্শন ও গবেষণা কাজে ব্যবহারের জন্য দান করে দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে এ জাদুঘরের পরিসমাপ্তি ঘটে।
ভিসি বলেন, প্রজ্ঞানী পাঠাগারে লিপিতত্ত্বসহ ভাষা, ইতিহাস, রাজনীতি, আইন ও সমাজ বিষয়ে অনেক দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ ছিল। মাওলানা ভাসানী, ড. মুহম্মদ শহিদুলাহ ছাড়া হুমায়ুন আহমেদ, গাজী শামছুর রহমান, শামসুজ্জামান চৌধুরী, আনিসুজ্জামান, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, সেলিনা হোসেন, সৈয়দ আবুল মকসুদসহ দেশের বিভিন্ন কৃতি মানুষজন এসেছেন। ২০০৪ সাল পর্যন্ত আমাদের একটা নিয়মিত আড্ডা ছিল এ পাঠাগারে। বলতে পারেন হবিগঞ্জের কবি সাহিত্যিক সংস্কৃতি ও নাট্যকর্মীদের মিলনমেলা। দেওয়ান গোলাম মোর্তাজা সংস্কৃতি পরিষদের সভাপতি শিক্ষিকা আম্বিয়া খাতুনের মৃত্যুর পর সাবেক পৌর চেয়ারম্যান শহীদ উদ্দিন চৌধুরীর সভাপতি হন। পারভেজ চৌধুরী সাধারণ সম্পাদক। একটা পর্যায়ে জীবন জীবিকার তাগিদে পারভেজ চৌধুরী ঢাকায় বসবাস শুরু করেন। আর এতেই পাঠাগারটি স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এটা হবিগঞ্জের সংস্কৃতি, সাহিত্য ও শিক্ষাঙ্গনের অপূরণীয় ক্ষতি।
তিনি বলেন, আমরা যখন স্কুল কলেজের শিক্ষার্থী তখন আমাদের আড্ডার অন্যতম একটা স্থান ছিল প্রজ্ঞানী পাঠাগারসহ পৌর ও পাবলিক লাইব্রেরি। আজকের তরুণ-তরুণী ও কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে এ চর্চার বড়ই অভাব। এটা দুঃখজনকই কেবল নয়; হতাশারও। সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিমুখ জনপদ সমাজের জন্য সুখকর নয়। আমি যতদূর জানি এ পাঠাগারটি যদি সরকার বা পৌর কর্তৃপক্ষ বা কোনো সংস্থার পক্ষ থেকে চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয় তাহলে কবি পরিবারের অনাগ্রহ থাকার কথা নয়। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্যই এটি চালুর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সুস্থ হবিগঞ্জ নিয়ে যারা ভাবেন তাদের এ ব্যাপারে কার্যকর ভূমিকা রাখা উচিত। আমি দেওয়ান গোলাম মোর্তাজা পদক পুনঃপ্রবর্তনেরও দাবি জানাই।
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব তোফাজ্জল সোহেল বলেন, আমি কবির সান্নিধ্য পেয়েছি। তখন আমার বয়স অনেক কম ছিল। লেখালেখিতে বেশ ঝোঁক ছিল। তাই নিয়মিত আমি কবির বাসায় যাতায়াত করতাম। আহরণী জাদুঘরটি দেখার সৌভাগ্য হয়নি। তবে শুনেছি। তিনি অনেক সময়ই জাদুঘরের গল্প করতেন। তার লাইব্রেরিতে সহস্রাধিক বই আছে। এসব বই আমি নিয়মিত পড়তাম, এখনও পড়া হয়। তখন সাহিত্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত অনেকেই তার বাসায় যাতায়াত করতেন। জ্ঞানের অনেক চর্চা হতো সেখানে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাসাটি এখন মানুষের পদচারণাহীন হয়ে গেছে। এখন তেমন কেউ যাতায়াত করে না, বইও পড়তে আসে না। হাতেগোনা কয়েকজন মাঝে মাঝে এসে বই পড়েন। বই নিয়ে যান। পড়া শেষে আবার ফিরিয়ে দেন। তিনি বলেন, এ বাসাটি কবি বাসা নামেই পরিচিত। কবি দেওয়ান গোলাম মোর্তাজা বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। তার লেখার বিশ্বজোড়া কদর। তিনি আমাদের এ অঞ্চলকে সমৃদ্ধ করেছেন। তার ১৬টি প্রকাশনা গ্রন্থ রয়েছে। আহরণী জাদুঘরে অনেক মূল্যবান সম্পদ ছিল। এর মধ্যে কিছু সামগ্রী মুক্তিযুদ্ধের সময় লুট হয়ে যায়। পরে অবশিষ্টগুলো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি দান করে যান।
কবি ও সাহিত্যিক সিদ্দিকী হারুন বলেন, দেওয়ান গোলাম মোর্তাজা ছিলেন একজন ক্ষণজন্মা। তিনি পাঠাগার ও জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করেছেন। লিপিতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি যেদিকেই হাত দিয়েছেন সেদিকেই অতলস্পর্শী সফলতা পেয়েছেন। রচনাসম্ভার গড়ে তুলেছেন। তার প্রতিষ্ঠিত জাদুঘরটি নিজের জীবদ্দশায়ই এখান থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থানান্তর করা হয়। এটি সম্পর্কে হবিগঞ্জের মানুষ খুব কমই জানে।
তিনি বলেন, কবি দেওয়ান গোলাম মোর্তাজা তার ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। তবে আমরা তাকে সে অনুযায়ী সম্মান জানাতে পারিনি। তার বই ভিনদেশে পড়ানো হয়। আমাদের দেশে তার বইয়ের কদর নেই। এটি আমাদের জন্য সত্যিই দুর্ভাগ্যের।