মোস্তাফিজুর রহমান, কয়রা
প্রকাশ : ১৩ মে ২০২৬ ১৩:০৯ পিএম
দারিদ্র্যতার বেড়াজালে কাটছে উপকূলীয় অঞ্চলের হাজারো শিশুর জীবন
উপকূলের শিশুদের জীবন চলে কপোতাক্ষ শাকবাড়িয়া নদীর জোয়ার-ভাটার সঙ্গে। উপকূলীয় শিশুরা বোঝে না লেখাপড়া শিক্ষাজীবন। রাত পোহাইলে তাদের জীবনের দৈনন্দিন চিন্তা নদীতে জোয়ার-ভাটা কখন হবে। যে সময়টা খেলাধুলা আর পড়াশোনা করার কথা, ঠিক তখনই তাদের কাঁধে সংসারের বোঝা। অবহেলিত আর দরিদ্রতার বেড়াজালে কাটছে উপকূলীয় অঞ্চলের হাজারো শিশুর জীবন। সুন্দরবনঘেঁষা দক্ষিণের জনপদ খুলনার কয়রা উপজেলায় বিভিন্ন এলাকার জেলে পরিবারের অসংখ্য শিশুর দিন কাটে ঘামঝরা রোদ-বৃষ্টির মধ্যে কঠোর জাঁতাকলে। অভাব-অনটনের মধ্যে বেড়ে ওঠা এসব শিশুর শিক্ষা-আনন্দ-খেলাধুলা বিনোদন তো দূরের কথা, সুষম খাবার ও প্রয়োজনীয় বিশ্রামের সুযোগ পর্যন্ত তাদের ভাগ্যে জোটে না।
কপোতাক্ষ নদের ধারে গোবরা গ্রামের আপন দুভাই শিশু যুবায়ের হোসেন ও সুমন হোসেনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ছোটবেলায় তাদের বাবা অন্যত্র বিয়ে করে সংসার করছে। অসুস্থ মা দুভাই মিলে মানবেতর জীবনযাপন করছে। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে যুবায়ের ও সুমন দুবেলা দুমুঠো ভাতের জন্য লেখাপড়ার জীবন শেষ করে জীবিকার তাগিদে বেঁচে নিয়েছে কপোতাক্ষ নদ থেকে ছোট কাঁকড়া ধরে সংসার চালানোর মতো পথ। জানতে চাইলে তারা বলে, প্রতিদিন দুভাই মিলে একশ পিস বা দেড়শ পিস কাঁকড়া ধরতে পারি, প্রতি পিস কাঁকড়া ১ টাকা ৫০ পয়সা মূল্যে বিক্রি করে। তাই দিয়ে চলে অসুস্থ মায়ের চিকিৎসা ও সংসার।
কয়রা সদর ২নং ওয়ার্ডের হাসান, হোসেন নামের দুভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত পাঁচ বছর আগে তাদের বাবা বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেন। তখন দুভাই দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ত। সেই থেকে শুরু হলো সংগ্রামের জীবন, হোসেন বলেন তাদের মা আগে মাইনষের বাড়িতে কাজ করে তাদের দুমুঠো ভাত তুলে দিতেন। কিন্তু গত দুই-তিন বছর মায়ের অসুস্থতা বেশি হওয়ার কারণে এখন কেউ কাজে নিতে চাই না। বাধ্য হয়ে লেখাপড়া ছেড়ে সংসার হাল ধরেন অসহায় পরিবারের দুভাই। লেখাপড়া করে কি না জানতে চাইলে তারা বলেন, দুমুঠো ভাত তিনবেলা খাইতে পারি না, ঠিকমতো তাহলে স্কুলে যাব কী করে।
বাংলাদেশ মানবাধিকার ব্যুরো, কয়রা উপজেলা শাখার সভাপতি তরিকুল ইসলাম বলেন, দারিদ্র্যের কারণে উপকূলের অনেক শিশু শিক্ষার বাইরে থেকে মাছ ধরা ও রেণুপোনা সংগ্রহসহ ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়িয়ে পড়ছে। এ ছাড়া জীবিকার তাগিদে অধিকাংশ পরিবারের সদস্যরা বছরের বড় সময় ইটভাটায় কাজ করায় শিশুরা স্কুল থেকে ঝরে পড়ছে এবং অনেকেই পিতা-মাতার সঙ্গে ভাটায় ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিযুক্ত হচ্ছে।
কাগজে-কলমে শিশু অধিকার থাকলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ নেই। তিনি নারী ও শিশুদের জন্য টেকসই জীবন নিশ্চিতে কার্যকর নীতিমালা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি জোরদারের দাবি জানান।
কয়রা উপজেলা ইমাম পরিষদের সভাপতি মাওলানা মিজানুর রহমান বলেন, অভাব ও দুর্যোগের কারণে স্কুল গমনোপযোগী বিপুলসংখ্যক শিশু শিক্ষাজীবন থেকে ছিটকে পড়ছে। জোয়ার-ভাটা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছ্বাসের নিয়মিত আতঙ্কে বাঁচে উপকূলের শিশুরা। তিনি আরও বলেন, উপকূলেরত শিশুদের স্কুলমুখী করতে তাদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করে কাজ করতে হবে।