রওনক জাহান পুষ্প
প্রকাশ : ১২ মে ২০২৬ ১৬:৪০ পিএম
মডেল : রোশান জাহান ছবি : এস এম আরিফুল আমিন
এখনকার আবহাওয়া কেমন যেন কবিতার মতো। হুট করে কিছু সময় ভালো লাগা দিয়ে যায়, আবার কখনও অপেক্ষা করায়। মন ভালো করা বৃষ্টি আবার কখনও কখনও হয়ে ওঠে বিব্রতের কারণ। যেহেতু মৌসুমটাই হুটহাট বৃষ্টির, তাই প্রস্তুতিও নিতে হবে আগে থেকেই।
বাংলাদেশে গ্রীষ্মকালের আবহাওয়া একেবারেই অনিশ্চিত। এই কড়া রোদ, আবার এই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। বাইরে যাওয়ার আগে প্রস্তুতিরও তো একটা ব্যাপার আছে। দেখা গেল খুব সেজেগুজে কোথাও রওনা দিলেন, বৃষ্টি এসে গোটা প্রস্তুতিই মাটি করে দিলো। এতে কার ভালো লাগবে বলুন! এই হুটহাট বৃষ্টি আর রোদের লুকোচুরি চলতেই থাকে। তাই নিজেরই এমন প্রস্তুতি নিয়ে বের হতে হবে, যাতে আবহাওয়া বৈরী হলেও আপনি বিপদে না পড়েন। বেশি না, ব্যাগে অল্প কিছু জিনিস আর সামান্য হিসাব-নিকাশ করে বের হলেই হুটহাট বৃষ্টিতেও বাইরে যেতে পারবেন চিন্তাহীনভাবে।
ব্যাগে থাক ছোট একটা ছাতা
ছাতা কিন্তু শুধু বৃষ্টি নয়, কড়া রোদ থেকেও আপনাকে রক্ষা করবে। দেশের এমন আবহাওয়ায় ছাতা আসলে খুবই জরুরি একটা জিনিস। বিশেষ করে যাদের প্রতিদিন বাইরে বের হতে হয়, তাদের ব্যাগে একটা ছাতা থাকাই উচিত। একটু শক্তপোক্ত দেখে ছোট তিন ফোল্ডের একটা ছাতা ব্যাগে রেখে দিতে পারেন। ছাতা নির্বাচনে ভেতরে ইউভি ফিল্টার দেয়া ছাতাগুলোই সবচেয়ে ভালো। বৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে রোদেও দেবে সুরক্ষা। যদি রঙিন ফ্যাশনেবল ছাতা নিতে চান, তাহলে এমন ছাতা নিন যেটা রোদ আটকাবে।
রেখে দিন কয়েকটা জিপলক ব্যাগ
জিপলক ব্যাগ অথবা ওয়াটারপ্রুফ পাউচ বৃষ্টির দিনে একটা লাইফসেভার। ফোন, গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র, টাকা-পয়সা এই সবকিছুই আমরা ব্যাগে রেখে দিই। আর বৃষ্টির পানিতে যদি ব্যাগ ভিজে যায় তাহলে এগুলোও ভিজে গিয়ে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এজন্য ব্যাগে একটা ওয়াটারপ্রুফ পাউচ, অথবা অন্তত কয়েকটা জিপলক ব্যাগ রেখে দিতে পারেন। বৃষ্টির পানি থেকে দরকারি জিনিসগুলো অনেকটাই বাঁচবে।

ছোট তোয়ালে আর পানির বোতল থাক ব্যাগে
বৃষ্টির দিনে ব্যাগে একটা ছোট তোয়ালে বা রুমাল রাখা ভালো। হুটহাট বৃষ্টিতে জামা-কাপড়, চুল ভিজে গিয়ে অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়তে হয়। প্রাথমিকভাবে একটু শুকানো বা হাত-মুখ মোছার জন্য কাপড়ের একটা ছোট তোয়ালে ব্যাগে রাখা ভালো। তেমনই সঙ্গে রাখতে পারেন ছোট একটা পানির বোতল। বৃষ্টিতে ভিজে বা কাদাপানি লেগে কাপড় নোংরা হয়ে যাওয়া খুব সাধারণ ব্যাপার। এই নোংরা দাগ লেগে থাকলে কাপড়ে পার্মানেন্ট দাগ পড়ে যেতে পারে। একটু পানি দিয়ে ধুয়ে ফেললে কাপড়ে আর দাগ বসে যাবে না।
পরতে হবে মানানসই জুতা
বৃষ্টি আর জলকাদার মাঝে আমরা অনেকটাই ঝামেলায় পড়ে যাই জুতা নিয়ে। বর্ষার উপযোগী ওয়াটারপ্রুফ জুতা না পড়লে কাদা-পানির মধ্যে দিয়ে চলাফেরা করাই কঠিন হয়ে যায়। আর যদি হয় সাদা জুতা, তাহলে তো আর কথাই নেই। বৃষ্টির আবহাওয়ায় চলার জন্য বেছে নিন ওয়াটারপ্রুফ জুতা। রাবারের স্যান্ডেল, ক্রকস অথবা সহজেই শুকিয়ে যায় এমন জুতা বেছে নিন। হাঁটার সময় সাবধানে জলকাদা এড়িয়ে হাঁটার চেষ্টা করুন। আর যেমন জুতাই হোক, দেখে নিতে হবে জুতার নিচে যথেষ্ট গ্রিপ আছে কি না। জুতার তলা ফ্ল্যাট হলে, সেটা যত সুন্দরই হোক, কাদার মধ্যে হাঁটার উপযুক্ত নয়।

শখের আচার-আমসত্ত্ব কিছুদিন তোলা থাক
গ্রীষ্মকাল মানেই বাজারে আমের সমাহার। যেদিকেই চোখ পড়ে, কাঁচা-পাকা আম দিয়ে ভর্তি। বাজারে এত আম দেখে কিনে এনে আচার বা আমসত্ত্ব করার ইচ্ছা হওয়াটাই স্বাভাবিক, এটাই তো সময়। তবে কাজ শুরু করে দেওয়ার আগে একটু আবহাওয়ার পূর্বাভাস জেনে নিন। ৪-৫ দিন টানা রোদ না থাকলে আচার অথবা আমসত্ত্বের মতো জিনিস না করাই ভালো। স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় রোদে দিতে না পারলে খাবার নষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নষ্ট হবে এর পেছনে করা পরিশ্রমও। তাই রসনা বিলাস তো হবেই, কিন্তু একটু সময় বুঝে নিয়ে।
পোষা প্রাণীদের কথাও মনে রাখুন
হুটহাট বৃষ্টি শুধু আমাদের ওপর নয়, আমাদের পোষা প্রাণীদের ওপরেও প্রভাব ফেলে। বৈরী আবহাওয়ায় তাদেরও হতে পারে সমস্যা। পোষা প্রাণীদের বৃষ্টির পানি আর ঠান্ডা বাতাস থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করুন। ঘরে শুকনো তোয়ালে আর নিরাপদ আশ্রয় রাখুন। অনেক পোষা প্রাণী বৃষ্টি আর বজ্রপাতের শব্দে ভয় পায়। তাদের সময় দিন, আশ্বস্ত করার চেষ্টা করুন। প্রিয় ট্রিট বা খেলনা দিয়ে ব্যস্ত রাখতে পারেন। চেষ্টা করবেন তাকেও একটু ভালো রাখার, সাহস দিয়ে রাখার।
বাড়ি ফিরেই বদলে নিন ভেজা কাপড়
বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া খুব স্বাভাবিক, কিন্তু ভেজা কাপড়ে বেশিক্ষণ থাকা হতে পারে শরীর খারাপের কারণ। তাই বাসায় আসার সঙ্গে সঙ্গেই ভেজা জামা কাপড় বদলে ফেলুন। সম্ভব হলে হালকা কুসুম গরম পানিতে গোসল করে নিন, সর্দি-জ্বর হওয়ার ঝুঁকি কমে যাবে। অবশ্যই সবার আগে চুল শুকিয়ে নিতে হবে। দ্রুত চুল শুকাতে হেয়ার ড্রায়ার ব্যবহার করতে পারেন।
রেইনকোট সঙ্গেই রাখুন
যারা মোটরসাইকেল বা সাইকেল ব্যবহার করেন তারা অবশ্যই সঙ্গে রেইনকোট রাখবেন। কারণ এ ধরনের যান চালানোর সময় ছাতা ব্যবহার করা সম্ভব নয়। বৃষ্টির হাত থেকে রেহাই পেতে তাই রেইনকোট সঙ্গে রাখুন। চলতি পথে বৃষ্টি এলে সঙ্গে সঙ্গে রেইনকোট পরে নিন। এতে ভিজে যাওয়ার ভয় থাকবে না।
খাবারে আনুন নিয়ম

এই হঠাৎ রোদ আবার হঠাৎ বৃষ্টি, এ ধরনের আবহাওয়াতেই সাধারণত আমরা বেশি অসুস্থ হই। সর্দি জ্বর তো ঘরে ঘরেই, এ ছাড়া ডাস্ট এলার্জি, কোল্ড এলার্জি এসবও খুব সমস্যা করে ঋতু বদলের এই সময়টায়। তাই নিজের স্বাস্থ্যের একটু বেশি খেয়াল রাখাটা জরুরি। বাইরে গেলে মাস্ক ব্যবহার করুন, ঠান্ডা কিছু খাওয়া এড়িয়ে চলুন। হ্যাঁ, হুটহাট এই প্রচণ্ড গরমে ঠান্ডা খেতে তো মন চাইবেই, তবে সেটা যেন সহনীয় মাত্রায় হয়। খাবারের তালিকায় রাখতে পারেন মসলা চা, গরম স্যুপ, শাকসবজিসহ স্বাস্থ্যসম্মত খাবার। নিয়ম মেনে চললে বৈরী আবহাওয়ায়ও থাকবেন সুস্থ। অনেকের বৃষ্টিতে ভেজার পর মাথাব্যথা শুরু হয়। সেই সঙ্গে হাঁচি-কাশি, শারীরিক অস্বস্তি তো আছেই। এ সময় লেবু-পুদিনার শরবত, তুলসি পাতা দিয়ে গরম চা খেতে পারেন। এতে অনেকটাই আরাম পাওয়া যাবে।
আরামদায়ক পোশাক বেছে নিন
হুটহাট বৃষ্টির মধ্যে ভারী কাপড়চোপড় না পরাই ভালো। এমনিতেই ভারী কাপড় শুকাতে সময় নেয় বেশি, আর মেঘলা আবহাওয়ায় তো কথাই নেই! তাই হালকা আর দ্রুত শুকায় এমন কাপড় বেছে নিন। গাঢ় রঙের কাপড় বেছে নেওয়া ভালো, কারণ সাদা কাপড় ভিজলে অনেক সময় স্বচ্ছ হয়ে যায়, যেটা অস্বস্তির কারণ হয়। গাঢ় রঙের জর্জেট, সিনথেটিক অথবা নরম সুতি কাপড় বৃষ্টির দিনে বেশ আরামদায়ক, বেশিক্ষণ ভেজা থাকার চিন্তাও থাকে না।
ব্যাগে রেখে দিন হালকা কিছু মেকআপ
খুব আনন্দ নিয়ে, সেজেগুজে বের হলেন আর একটু পরেই বৃষ্টি এসে সব ধুয়ে দিলো। খুব মন খারাপের ব্যাপার, তাই না? এজন্য ব্যাগে রেখে দিন অল্প কিছু মেকআপ আইটেম। ট্রাভেল সাইজের মিনি কন্টেইনার অথবা পাউচে করে আলাদা রেখে দিতে পারেন। এতে ভিজে গেলেও পরে কুইক টাচ-আপ করে নিতে পারবেন।

ফোনে যথেষ্ট চার্জ নিয়ে বের হওয়া ভালো
হুটহাট বৃষ্টি বাদলার দিনে বিদ্যুৎ চলে যাওয়াটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। আর যদি ঝড়ে কোনো সমস্যা হয়, বিদ্যুৎ আসতে লাগতে পারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। অথবা বৃষ্টিতে আটকে যেতে পারেন কোথাও। বাসা থেকে বের হওয়ার আগে মোবাইল ফোন ফুল চার্জ করে বের হওয়াটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। এতে জরুরি দরকারে কাউকে ফোন করা অথবা রাইড শেয়ারিং অ্যাপ ব্যবহার করার সুযোগ থাকে। যদি বাসায় পাওয়ার ব্যাংক থাকে, তাহলে সেটাকেও ফুল চার্জ করে সঙ্গে রাখার চেষ্টা করুন।
বৃষ্টির দিনে গৃহস্থালির কাজে সাবধানতা
বৃষ্টির দিনটাও উপভোগ্য হয়ে উঠুক

বৃষ্টির দিন নিয়ে যে যেমন কথাই বলুক না কেন, এই বৃষ্টিকে উপভোগ্য করে তোলার জন্যও কিন্তু অনেক উপায় আছে। কেউ হয়তো জানালার পাশে বসে বই পড়ে, কেউ চা-কফি খায়, কেউ পছন্দের গান শোনে, কেউ হোম জার্নালিং করে, আবার এসব কিছু না করে কেউ হয়তো বেশ খানিকটা সময় ঘুমিয়ে নেয়। বৃষ্টির শব্দ অনেকের কাছেই খুব শান্তিদায়ক, যা মনকে প্রশান্ত করে। কাজের চাপ না রেখে এই সময়টাকে নিজের সঙ্গে কাটানোর সুযোগ হিসেবেও নেওয়া যায়। নিজের ভাবনা-চিন্তা গুছিয়ে নেওয়া, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করাÑ এসবও করা যায় এই নিরিবিলি সময়ে।