× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

মাকালু ডায়েরি

মাকালু শীর্ষে প্রথম বাংলাদেশি

বাবর আলী

প্রকাশ : ১১ মে ২০২৬ ১১:৩০ এএম

প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে এবার বিশ্বের পঞ্চম উঁচু পর্বতশৃঙ্গ মাকালু জয় করলেন বাবর আলী   ছবি: ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স

প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে এবার বিশ্বের পঞ্চম উঁচু পর্বতশৃঙ্গ মাকালু জয় করলেন বাবর আলী ছবি: ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স

প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে এবার বিশ্বের পঞ্চম উঁচু পর্বতশৃঙ্গ মাকালু জয় করলেন বাবর আলী। পৃথিবীতে ৮ হাজার মিটার বা তার বেশি উচ্চতার পর্বত রয়েছে মোট ১৪টি। এর মধ্যে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে পাঁচটি জয় করলেন তিনি। মাকালু জয়ে বাবর আলীর রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা আজ থাকছে ঘুরিয়া পাঠকের জন্য। লিখেছেন বাবর আলী

রাশমি কন্সট্যান্টিনকে নাশতার টেবিলে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি বছরে কয়বার পাহাড়ে যাও?’ কন্সট্যান্টিনের ত্বরিত উত্তর, ‘Whenever my wife allows me! Also she always says yes. But I have to concentrate on how this yes is being pronunced. Not all yes are actual yes!’

এদিকে এই লজের কুকুর কাঞ্চি কন্সট্যান্টিনের ওপর খ্যাপা। লজের ফোম লাগানো কোনার গদিতে কাল থেকেই বসছে কন্সট্যান্টিন। ওটা মূলত কাঞ্চির আসন। ফোম দখল হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা কাঞ্চির ঠিক পছন্দ হচ্ছে না। নেপালি কাঞ্চি শব্দের অর্থ বাড়ির ছোট মেয়ে। 

ফিলিলি শেরপা পিংপং বলের মতো সব সময় কিছু না কিছু করছে। এক জায়গায় স্থির হয়ে বসতে পারে না ও। হয় কারও সাথে ঠাট্টা-তামাশা করছে, নতুবা কিছু না কিছু কাজ করছে। নুরবু আমাকে এক ফাঁকে ফুর্বা অংগেল দাইয়ের গ্রাম দূর থেকে দেখাল। শারীরিক মৃত্যু হয়েছে হয়তো তার, কিন্তু আমার স্মৃতিতে থাকা ফুর্বা অংগেলকে মৃত্যু কখনও নাগালের মধ্যে পাবে না। আর তাশিগাঁওয়ে আমাদের লজের পাশের ঘরটাই ফুর্বা দাইয়ের বোনের। যদিও বাড়িতে তালা ঝুলছে। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার জন্য ওরা সবাই কাঠমান্ডুতে থাকে। 

আটটা নাগাদ পথে বেরোনো। তাশিগাঁও হলো এই অঞ্চলের শেষ স্থায়ী বসতি। ওপরের ছোট ছোট বসতি শুধু অভিযান আর ট্রেকের মৌসুমে চালু থাকে। বর্ষা আর শীতে নিচের গ্রামে নেমে যায় ওরা। পথে নামতেই একের পর এক বেশ কয়েকটা মণি ওয়াল। মিনিট কুড়ি হাঁটতেই একটা বড় ঝোড়া। প্রচুর পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে এদিকে। তিব্বতি স্নোকক, মোনাল, খালিজ ফিজেন্ট নামক নেপালের কিছু পাখি চিনি। অন্য পাখিগুলোর সাথে আমি পরিচিত নই। টানা চড়াই তাশিগাঁও থেকে। মাটির ওপর পাথর ফেলে বানানো পথ। ধীরপায়ে উঠছি। এই পথে কোনো লোকজন নেই। সাড়ে ৮টা নাগাদ আরেকটা মণি ওয়ালে থামা। এই জায়গার উচ্চতা ২২৯৫ মিটার।

এখান থেকে পাথরের সিঁড়ি শুরু। পথের ওপর অনেক গাছ শিকড়সুদ্ধ উপড়ে পড়েছে। এই অঞ্চলের কুখ্যাত হাওয়াকে মনে করাল বিশাল সব মহীরুহের এমন পরিণতি। বিশাল এক পাথর পেরোলাম। এমন সব পাথরকে বলা হয় ঠুলোডুংগা। ঠুলোডুংগা মানে বড় পাথর। কিছুদূর এগোতেই একটা ইয়াক খারকা পড়ল; সাথে ছোট্ট মণি ওয়াল। এখান থেকে এগিয়ে ফের মাটিতে পাথর বসানো রাস্তা। হাতের বামে প্রচুর বাঁশ। বাঁশ থাকা মানেই আসলে রেড পান্ডা দেখার সম্ভাবনা! যদিও প্রাকৃতিক পরিবেশে এই প্রাণী দেখার সম্ভাবনা অতীব ক্ষীণ। বাঁশবাগানের ফাঁকে ফাঁকে আছে এন্তার হিমালয়ান ওক গাছ। অনেকেই বলে থাকেন এ পথে নানান ধরনের গাছের আধিক্যের কারণে প্রচুর অক্সিজেন মেলে। এজন্য উচ্চতাজনিত অসুখে কম ভোগে ট্রেকাররা। অবশ্য ব্যাপারটা প্রমাণিত কিছু নয়। 

চড়াই আর চড়াই। টানা উঠে যাওয়া। পথে দাদি-নাতনির একটা খারকায় থামলাম। বছর ছয়েকের নাতনির সাথে খাতির করার চেষ্টা করেও লাভ হলো না। সে অতীব লাজুক। দাদি-নাতনির ছোট্ট রান্নাঘরে বসে কালো চিয়া তথা রং চায়ে চুমুক দিতে দিতে দেখলাম কন্সট্যান্টিন রান্নাঘরের ভিডিও করছে। আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই বলল, ‘আমার বউকে ভিডিওটা পাঠিয়ে ক্যাপশন দিব’, ‘Appreciate what you have!’ ‘এই উক্তির জন্য কন্সট্যান্টিনকে পিতৃতান্ত্রিক সমাজের প্রতিভূ ভাবার অবকাশ নেই! রাশিয়ানরা আসলে খুবই ঠোঁটকাটা। মাথায় যা চলে, সেটাই মুখে বলে। রাশিয়ানদের এই স্বভাবের জন্য অনেকেই ওদের ভুল বোঝে। অবশ্য কন্সট্যান্টিনের সেন্স অব হিউমার যথেষ্ট ভালো। 

ফের সিঁড়ি। ক্ষণে ক্ষণে মেঘ এসে গা ছুঁয়ে যাচ্ছে। বেশ ভেজা একটি দিন। রডোডেন্ড্রন গাছ দেখলেও ফুলসমেত গাছের দেখা মিলছিল না। এক জায়গায় পেয়ে গেলাম। সেই নুয়ে পড়া পাতা, আর উদ্ধত ফুল। ‘বরুণ মেঘেরে তুচ্ছ, উদ্ধত যত শাখার শিখরে রডোডেন্ড্রনগুচ্ছ!’ মাকালু বরুণ ন্যাশনাল পার্কে আমাদের অবস্থান বলে রবি ঠাকুরের কবিতাকে খানিকটা বদলে দিলাম! এখন রবি বাবুর কোনো পাগলাটে ভক্তের রোষানলে না পড়লেই হয়! 

টানা চড়াই ভেঙে ১০টা বিশ নাগাদ ডান্ডা খারকা। খারকা শব্দের অর্থ ঘাসের ময়দান। ইয়াক, ভেড়া ইত্যাদি চরানোর জন্য মূলত ব্যবহৃত হয় এসব খারকা। এখানে অবশ্য ইয়াক চরানো হয়; সংখ্যায় যদিও বেশি না। দুপুরের খাবার সারতে হবে এখানেই। এই ছোট্ট অস্থায়ী বসতির উচ্চতা ২৯৩০ মিটার। আজকের লক্ষ্য কংমা অবধি পৌঁছানোর আগে আর কোনো লজ নেই। তাই সময়টা দুপুরের খাবারের জন্য তাড়াতাড়ি হলেও অন্য উপায় নেই। ডাইনিংয়ে রাশমির দেখা মিলল। ও আজকে এখানেই থাকবে। ওর ট্রেকিং গাইড পাসাংয়ের ভাষায় ওরা ‘স্নো মোশন’-এ চলছে। তাই এখানে থাকাটাই ওদের জন্য শ্রেয়। 

রাশমিকে বিদায় জানিয়ে ফের পথে। এবার পাথরের ফাঁকে অল্প অল্প তুষারের দেখা মিলতে শুরু করেছে। প্রতি দশ মিটারে তুষারের পরিমাণ বাড়ছে। পত্রপল্লববিহীন বিশাল সব গাছ পথের দুপাশে। খানিকটা এগোতেই রীতিমতো তুষারের রাজ্য। অথচ আমরা সবে ৩০০০ মিটারের কিছুটা বেশি উচ্চতায়। এত অল্প উচ্চতায় এত তুষার সহজে দেখতে পাওয়া যায় না। গত কয়েক দিনের খারাপ আবহাওয়ার কারণে এ রকম বাজে তুষারপাত হয়েছে এখানে। গত কয়েক দিনে অবশ্য হিমালয়জুড়েই বাজে আবহাওয়া। দৃষ্টিসীমার গণ্ডি সবে বিশ মিটার। এর চেয়ে দূরবর্তী সবকিছু আবছা আবছা। অথচ এ পথে দারুণ সব পর্বতের দৃশ্য দেখার কথা আজ। অবশ্য হিমালয় তো এমনই। কোথাও বইয়ের পাতায় পড়া পথের দেখা মেলে, কোথাও লোকমুখে শোনা পথের। আর প্রায়শই হিমালয় হাজির হয় নতুন সব অভিজ্ঞতা নিয়ে। 

টানা চড়াই ভেঙে ৩২০০ মিটার উচ্চতার উনশিশা। এই জায়গাটা দেউরালি নামেও পরিচিত। নেপালি দেউরালি শব্দের অর্থ ছোট পাস। একটাই পরিবার অসংখ্য মুরগির সাথে থাকে এখানে। আর চা-কফি, কোক ইত্যাদি মেলে। মাকালু বরুণ ন্যাশনাল পার্কের কোর এরিয়া শুরু এখান থেকেই।

এখন গাছ বলতে বার্চ আর রডোডেন্ড্রন। তুষারের পরিমাণ আরও বেড়েছে। আজ আমাদের আগে কেউ নেই বলে একবার আমি আর একবার দোরচে দাই ট্রেইল ব্রেক করছি। বয়সের কারণে কন্সট্যান্টিনকে ছাড় দেওয়া হয়েছে। 

প্রচুর রডোডেন্ড্রন পথের দুপাশে। অবশ্য তুষারের ভারে প্রতিটা গাছেরই বেশ সঙ্গিন অবস্থা। বেশিরভাগ স্থানে ৪০-৫০ সেন্টিমিটার পুরু তুষার। এর মধ্য দিয়ে পথচলা মোটেও সহজ নয়। পা মাঝে মাঝেই পিছলে যাচ্ছে। তাই বেশ সাবধানেই চড়াই ভাঙছি। ফেরার সময়ও এমন অবস্থা হলে এই পথে নামতে গিয়ে হাঁটু চূর্ণ হয়ে যাবে নির্ঘাত! অবশ্য যেকোনো যাত্রা শুরুর সময় খারাপ আবহাওয়াতে পড়া ভালো। ফেরার সময় খারাপ আবহাওয়ার শিকার হওয়ার চেয়ে প্রথমেই মন্দ আবহাওয়ায় পড়াটা বহুগুণে ভালো। এক জায়গায় মণি ওয়ালের বুদ্ধকেও কোমর অবধি তুষারে ডোবা দেখলাম। 

১.৪০ নাগাদ কংমা এর প্রথম লজ। প্রথম দুটো লজ ছাড়িয়ে শেষ লজটাই থামলাম। ততক্ষণে ঘড়ির কাঁটায় ১টা ৫০। তাশিগাঁওয়ের মা-মেয়ে মিলে এই লজটা চালায়। তরুণী মেয়েটা খুবই সপ্রতিভ আর দারুণ ইংরেজি বলে। চেহারায় সব সময় একটা সরল ছটফটানি ঝুলছে ওর। আমরা এক কাপ করে লেবু চা নিয়ে বেশ গুছিয়ে বসলাম। আড়াইটা নাগাদ অন্য দলগুলো আসতে শুরু করল। নেপালি গাইড ও মালবাহকরা এসেই ভাত থেকে বানানো ‘বত্তি নামক লোকাল মদে মজে গেল। কন্সট্যান্টিনকে চেখে দেখবে কি না সেটা জিজ্ঞেস করা হলে ও দোরচে দাইকে উত্তর দিলো, ‘There are young people who can drink and climb. For old people, you either drink or climb. I consider myself old!’ 

সোয়া ৩টা নাগাদ ডাইনিংয়ের চিমনি ঘিরে আড্ডা জমে উঠল। ভাঙা বার্চ আর রডোডেন্ড্রনের ডাল হলো ফায়ার প্লেসের জ্বালানি। এদিকে ইয়াক কম বলে ইয়াকের গোবর জ্বালানি হিসেবে খুব একটা ব্যবহৃত হয় না। অন্য ট্রেকিং গ্রুপগুলোও আস্তানা গেড়েছে এখানে। জানা গেল দুই কানাডিয়ানের বয়স ৬৭ আর ৬৫। গত বছর এভারেস্ট আরোহণের প্রচেষ্টা চালানো জার্মান বেনেটের বয়স ৬০। অবশ্য ক্যাম্প-২-এর ওপরে ও আর যায়নি। কন্সট্যান্টিন ওদের বয়স শুনে বলল, ‘Its good to be younger!’ 

জার্মান গ্রুপের গাইডের কাছে জানতে চাইলাম ভিডিও কলে কথা বলা ওই মেয়ের খবর কী? মেয়ে কি রাজি হয়েছে? উত্তর এলো, ‘ওই মেয়ে রাজি হচ্ছে না! তাই আমার সম্ভাব্য প্রেমিকার লিস্টে আট নম্বরে রেখেছি ওকে!’ আমি জানতে চাইলাম ওর লিস্টটা কত বড়? প্রত্যুত্তরে জানাল, ‘আপাতত আট নম্বর পর্যন্তই। তবে এই লজের মেয়েটাকে ৯ নম্বরে রাখতে হবে!’ আমি ফের রগড় করে জানতে চাইলাম, ‘তোমার লিস্টের ১ নম্বরে কে? কবিতা নেপালি নাকি?’

এই লজের মালকিনের দশ মাস বয়সি একটা বাচ্চা আছে; নাম ডোলমা শেরপা। কাল দুপুর থেকে আজ সকাল অবধি একবারও কান্না করতে শুনিনি। এত ভদ্র বাচ্চা সহজে দেখাই যায় না। কন্সট্যান্টিন তুলনা করে বলল, ‘আমার বাচ্চারা শৈশবে ভয়ানক চেঁচামেচি করত।’ অন্যদিকে শৈশবের নানান স্তরে থাকা আমার তিন ভাগ্নি আমাদের বাড়ি এলে রীতিমতো প্রলয়নাচন শুরু হয়! আমার মায়ের ভাষায়, ‘পুরা বাড়ি তুলে বসাইতেছে!’ 

ডোলমা শেরপা নামের এই পিচ্চি জন্মের কয়েক মাসের মাথায় ৩৮০০ মিটারে বসবাস করছে! ভেবে দেখলাম, পৃথিবীর মানুষের একটা বড় অংশেরই কখনও ৩৮০০ মিটার উচ্চতায় আসার সুযোগ হবে না। অবশ্য এসব উথালপাথাল ভাবনায় মাথা ভারী করে লাভ নেই। বুদ্ধ সেই কবে বলে গেছেন, ‘With our thought, we make the world.’ অসামান্য হিমালয়ের কাছে এসে নিজেদের সামান্যতাকে বোঝার দিকে মন দেই। ডোবাটে নামক এই লজের কাঠের দেয়াল পুণ্যকামীদের নানান লেখায় ভর্তি। শিব-পার্বতীর ভক্তদেরই আনাগোনা মূলত এদিকে। এদিকে আসা তীর্থযাত্রীদের মূল উদ্দেশ্য থাকে ‘শিব/শিবা ধারা’ দর্শন। 

ডোবাটে এর তুষারে দিনের প্রথম পদচিহ্ন পড়ল ৮টা দশ নাগাদ। পথ এবার নিচের দিকে নেমে গেছে। আজকের পথ অপেক্ষাকৃত সহজ হওয়ার কথা। পথের দুই পাশে দেদার গাছ। রডোডেন্ড্রন গাছই মূলত। খানিকটা নেমে যেতেই ফুলে ভরা রডোডেন্ড্রন গাছের দেখা মিলল। পথে জমা তুষারের পরিমাণও কমে এসেছে। এমনকি আজ দুপাশের ভিউও ভালো। দূরের পাহাড় দেখা যাচ্ছে বিনাক্লেশেই। রোদ একবার ক্ষণিকের জন্য দেখা দিয়ে ফের গায়েব। আধা ঘণ্টা চলে পৌঁছলাম মুম্বুক। এখানে ছোট্ট একটা ঘর ছিল। মূলত রান্নাঘর হিসেবে ব্যবহৃত হতো। আর অভিযাত্রীরা এর পাশেই ক্যাম্পিং করত। ডোবাটে এর লজ হয়ে যাওয়ায় এর উপযোগিতা একেবারেই নেই হয়ে গেছে। কিচেন তুলে দিয়ে মালিক চলে গেছে। 

এর পর থেকে সিঁড়ির শুরু। স্থানে স্থানে থোক থোক তুষার। শিব ধারা দর্শন করতে আসা তীর্থযাত্রীদের জন্য বানানো এই সিঁড়ি। যেখানেই তীর্থযাত্রা আছে, সেখানে পথের কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব করার চেষ্টা করা হয়। কারণ তীর্থে আসা একটা বড় অংশই বয়সের ভারে ন্যুব্জ থাকে। পথের ধারে এবার পাইন বন। এই সিঁড়ি যেন পাতালপুরীর সিঁড়ি। কোথায় যে নামিয়ে নিয়ে যাচ্ছে! থোক হয়ে থাকা তুষারকে এড়িয়ে পা ফেললেই হলো। টানা নেমেই যাচ্ছি! সিঁড়ির মাঝামাঝি অংশে এসে তুষার উধাও। নামতে নামতে সোজা বরুণ নদীর খাতে। নুম আসার সময় পেয়েছিলাম অরুণ নদীকে। আজ দর্শন হলো মোহিনী বরুণ নদীর। এই নদী সোজা মাকালু পর্বতের বরুণ হিমবাহ থেকে নেমে এসেছে। অরুণ-বরুণ উপত্যকা নিয়ে কত উত্তেজনা কাজ করছিল মনে! সেই বরুণ উপত্যকা এখন একদম চোখের সামনে। পথ খুঁজে খুঁজে ঠিক চলে এসেছি বরুণের কাছে। 

কিছুটা এগিয়ে একটা বড় পাথরের নিচে আজকের দিনে প্রথমবারের মতো থামা। এখান থেকে পথ হালকা চড়াই। এরপরে ইয়াংলে খারকা অবধি অল্পস্বল্প চড়াই-উতরাই। ফের চলা শুরু করতেই এক জায়গায় গোলাপি রডোডেন্ড্রনে চোখ আটকে গেল। এই ট্রেকে এতদিন শুধু লাল রডোডেন্ড্রনই দেখেছি। রডোডেন্ড্রনের শুধু ফুল নয়, পাতাও আমাকে সমানভাবে টানে। পাতাগুলো দেখলেই সপ্তপর্ণী বা ছাতিমের কথা মনে পড়ে। এবার পথ বরুণ নদীর গা ঘেঁষে। ভাটির দিকে এগিয়ে চলা বরুণ নদীর তর্জনগর্জনে কান পাতাই দায়! আমরা চলছি নদীর উৎস তথা উজানে। কালচে পাথরের ফাঁকে ফাঁকে স্বচ্ছ নীলাভ পানি। বেশ উঁচু থেকে একটা বিরাট ঝোড়া লাফ দিয়ে নেমেছে। 

এদিকের বেশিরভাগ রডোডেন্ড্রন গাছই পাথর আঁকড়ে আছে। জড় আর জীবের মধ্যে মিথোজীবিতার দারুণ উদাহরণ। রডোডেন্ড্রনকে নেপালি ভাষায় বলে লালি গোরাস। নেপালি বেশিরভাগ নোটে জলছাপ আছে এই ফুলের। নোট আসল নাকি জাল সেটা নির্ধারণ করা হয় ‘লালি গোরাস’-এর জলছাপ দেখে। বরুণ নদীর ঠিক ওপাশেই আমাদের সমান্তরালে একটা পায়ে চলা পথ দেখা যাচ্ছে। ওই রুটে ট্রেক করার জন্য আলাদা পারমিটের দরকার হয়। 

বরুণ নদীর খাতের সাথে চলে ১০টা চল্লিশ নাগাদ ফেমাতাং। এই স্থানের উচ্চতা ৩৪৮৩ মিটার। আগে এখানে বেশ জমজমাট একটা লজ ছিল। সেডুওয়ার একটা পরিবার চালাত এই লজ। গত জানুয়ারিতে সিলিন্ডার থেকে আগুন লেগে জ্বলে গেছে পুরোটা। বেশ কয়েক মাস বাদেও আগুনের ভয়াবহতা দৃশ্যমান। লজের নানান ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে আছে চারদিকে। আগুন থেকে রেহাই পায়নি পাশের খেতের বাঁধাকপিও। 

একটা খোলা জায়গায় প্রচুর পাথর। খানিক এগিয়ে একটা কাঠের পুল পড়ল। এতক্ষণ হাতের ডানে বরুণ নদীকে নিয়ে চললেও এবার পুল পেরোনোতে নদী চলে এলো বামে। নেপালের যেকোনো ট্রেকের অন্যতম আকর্ষণ থাকে লোহা আর তার নির্মিত সাসপেনশন ব্রিজ নামক ঝোলা পুল। সাসপেনশন ব্রিজগুলোকে আরো আকর্ষণীয় করে তোলে এর গায়ে ঝোলানো বর্ণিল লুংদার বা প্রেয়ার ফ্ল্যাগ। এই ট্রেকে একটাও সাসপেনশন ব্রিজের দেখা পাইনি। পরিবর্তে পেলাম কাঠের পুল।

পুলের এপাশ যেন জুনিপারের রাজ্য। গাছ আর ঝোপ-দুটোই আছে দেবপূজায় ব্যবহৃত এই উদ্ভিদের। খানিকটা এগিয়ে অনেক উঁচু থেকে নিচের উপত্যকায় নেমে আসা সুন্দর একটা ঝরনা পড়ল। এর বিপরীতেই নদীর পাড় ঘেঁষে লাল পাথরের এলাকা। নীল জলের পাশে লালচে পাথর অন্যরকম দ্যোতনার সৃষ্টি করেছে। সামনে এগোতেই দেদার জুনিপার গাছ। কয়েক জায়গায় মাটির দেখাও পেলাম। এগিয়ে মন আরও ভালো হয়ে গেল। কয়েকটা ঘাসের ময়দান রীতিমতো।

বারোটা পাঁচ নাগাদ পৌঁছলাম ইয়াংলে খারকা। ঢুকতেই একটা ছাউনির মতো জায়গা। মাকালু বরুণ ন্যাশনাল পার্কের নানান নিয়মাবলি সাঁটা আছে এর গায়ে। ইয়াংলে খারকার উচ্চতা ৩৫৫৭ মিটার। খারকার নিয়ম মেনে এটি মোটামুটি ঘাসের ময়দান। এখানে একটাই লজ। দোরচে দাই আর নুরবুর বোন এই লজের মালিক; যদিও ওরা থাকে কাঠমান্ডুতে। লজ ছাড়াও ইয়াক পালকদের তিন-চারটা কুটির আছে। আর আছে দুইটা ছোট্ট মনাস্ট্রি। দুটোতেই তালা দেওয়া। একটা মনাস্ট্রির তালা গৌতম বুদ্ধের মুখাবয়বের মতো বানানো। কপালের থার্ড আইয়ের ওখানে চাবি ঢোকানোর ব্যবস্থা। 

এই লজে খাবারের অপশন খুব একটা নেই। খাবার যে পাওয়া যাচ্ছে, এতেই আমি খুশি। দুপুরে ডাল-ভাত তৈরি হতে খানিকটা সময় লাগবে। এই সুযোগে পাড়া বেড়াতে কিংবা বলা যায় খারকায় চরে বেড়াতে বেরোলাম। তাশিগাঁও ছাড়ার পর এখানে এই প্রথম পাখি দেখলাম। অতি উচ্চতার কাক তো আছেই, সাথে চড়ুইয়ের একটা দলও। নানান কিছু খুঁটে খাচ্ছে। দুপুরে খাবার পরে বেরোলাম হাঁটতে। এর মধ্যে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়তে শুরু করায় ইয়াক চরানো রাখালদের একটা ঘরে আশ্রয় নিলাম। এখানে নানান কোল্ড ড্রিংকস আর এনার্জি ড্রিংকস পাওয়া যায়। তবে ওখানে ভিড় ক্যারম বোর্ড ঘিরে। দুজন মালবাহক রীতিমতো সেয়ানে সেয়ানে লড়ে যাচ্ছে। এত ভালো ক্যারম খেলতে আমি কাউকে দেখিনি। একেক দানে চার-পাঁচটা করে গুটি পকেটস্থ করছে। ঘণ্টা দুয়েক ওদের সাথেই কেটে গেল।

কন্সট্যান্টিন আমার পরে বেরিয়েছিল হাঁটতে। ও ফেরার পরে জ্বালানো হলো ফায়ার প্লেসের আগুন। খারকা বলেই জ্বালানি হিসেবে এখানে আছে ইয়াকের গোবর। গপ্পো জমে উঠল পর্বতে হ্যালুসিনেশন হয়েছিল কি না সেটা নিয়ে। কিরগিজস্তানের পিক লেনিনে এমন অনুভূতির মধ্য দিয়ে গিয়েছিল কন্সট্যান্টিন। মস্কোয় কোনো একটা কাজ পড়ে যাওয়ায় নির্ধারিত সময়ের আগেই অভিযান শেষ করার তাড়াহুড়ো ছিল ওর। তাই তড়িঘড়ি সামিট পুশে বেরোয় ও। ভেবেছিল সেদিন রাতে ওর পরে আরও অনেকেই হয়তো বেরোবে। প্রসঙ্গত, ৭০০০ মিটারের এই পর্বত বেশ জনপ্রিয়। কিন্তু সেদিন কেউ সামিট পুশের জন্য সামিট ক্যাম্প থেকে বেরোয়নি। হোয়াইট আউট থাকায় পেছনে কেউ আছে কি না সেটাও বোঝেওনি ও। পরে জেনেছিল, সেদিন আবহাওয়ার পূর্বাভাস খারাপ থাকায় আর কোনো আরোহীই চূড়ার উদ্দেশে বেরোয়নি। 

রাত ২টায় সামিটের উদ্দেশে বেরিয়ে কন্সট্যান্টিন চূড়ায় পৌঁছায় দুপুর ১টা নাগাদ। ফেরার সময় স্বভাবতই খুব ক্লান্ত ছিল সে। এক জায়গায় জিরিয়ে নেওয়ার জন্য বসার পরে ও ঘুমিয়েই পড়েছিল। ঘুম থেকে উঠে চলতে শুরু করার পর ওর পোক্ত ধারণা হয়েছিল, ও আসলে একা নয়! বিশাল একটা গ্রুপের অংশ ও। একই সাথে ওর নিজের ব্যাকপ্যাকটাকে অন্যের ভেবে সেটা ফেলে আসতে মনস্থির করে ফেলেছিল এই রাশিয়ান! পরে কন্সট্যান্টিন এমন অনুভূতির মধ্য দিয়ে যাওয়া অন্য আরোহীদের সাথে ব্যাপারটা নিয়ে লম্বা সময় ধরে কথা বলে। যারাই এ ধরনের অনুভূতির মধ্য দিয়ে গেছে, তারা সবাই একটা জায়গায় এসে ঐকমত্যে পৌঁছেছে। হ্যালুসিনেশন তখনই হয়, যখন আপনি মাত্রাতিরিক্ত ক্লান্ত থাকেন। ওর ক্ষেত্রেও সেটা হয়েছিল বলে ধারণা কন্সট্যান্টিনের। পূর্ব হিমালয়ে বসে পামির পর্বতমালার দৃষ্টিবিভ্রমের গল্প শুনতে মন্দ লাগছিল না মোটেও। 

[লেখার বাকি অংশ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে ঘুরিয়ার অনলাইন বিভাগে]

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা