নাহিদুল ইসলাম
প্রকাশ : ১১ মে ২০২৬ ১১:২৩ এএম
বর্তমান বিশ্বে শিক্ষা কেবল পুঁথিগত জ্ঞান অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তরুণদের জন্য প্রয়োজন আত্মবিশ্বাস, নেতৃত্ব, যোগাযোগ, সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা। এসব গুণাবলি অর্জন করতে হলে তরুণদের পড়াশোনার পাশাপাশি স্কিল ডেভেলপমেন্টের দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে, তরুণদের সংখ্যা ৪ কোটির বেশি। এ বিশাল যুবসমাজ আমাদের সম্ভাবনার বড় শক্তি। কিন্তু তাদের মধ্যে যদি কর্মদক্ষতা, প্রযুক্তিজ্ঞান, কমিউনিকেশন স্কিল না থাকে, তবে তারা জাতীয় সম্পদ না হয়ে সমাজের বোঝায় পরিণত হবে। একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে যেসব দক্ষতা আমাদের তরুণদের এগিয়ে রাখবে-
নেতৃত্ব
একুশ শতকে শিক্ষার একটি অপরিহার্য দিক হলো নেতৃত্ব। যেহেতু বিশ্ব ক্রমাগত বিকশিত হচ্ছে, তাই আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করার জন্য এখনই নেতৃত্বের দক্ষতা অর্জন করা গুরুত্বপূর্ণ। একুশ শতকে নেতৃত্বের গুণাবলির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত থাকে ক্রিটিক্যাল থিংকিং এবং সমস্যা সমাধানের মতো আরও বেশকিছু দক্ষতা। নেতৃত্বের গুণাবলি একজন শিক্ষার্থীকে অনুসন্ধান ভিত্তিক শিক্ষা, প্রকল্প ভিত্তিক শিক্ষা এবং বিভিন্নভাবে সক্রিয় শিক্ষায় জড়িত হওয়ার সুযোগ প্রদান করে এবং এই দক্ষতাগুলো বিকাশে সহায়তা করে।
সক্রিয় নাগরিক
একুশ শতকে নেতৃত্বের একটি অন্যতম দিক হলো সক্রিয় বিশ্ব নাগরিক হয়ে ওঠা। ছোটবেলা থেকে শিক্ষার্থীদের এই বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত করা উচিত। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাংস্কৃতিক সচেতনতা তৈরি হয় এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের গুরুত্ব সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের বোধ জেগে ওঠে। একজন আধুনিক নাগরিকের জন্য সক্রিয় নাগরিকত্ব অপরিহার্য। সমাজ, রাষ্ট্র ও পরিবেশের প্রতি দায়িত্ববোধ থাকা একজন সচেতন মানুষের পরিচয়। সামাজিক সমস্যা নিয়ে ভাবা, মানবিক কাজে অংশগ্রহণ, পরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা রাখা এবং সমাজ উন্নয়নে কাজ করা এসবই একজন সক্রিয় নাগরিকের গুণ। একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এমন নাগরিকের প্রয়োজন, যারা শুধু নিজের জন্য নয়, সমাজের জন্যও কাজ করবে। এই বিষয়গুলো সম্পর্কে শেখার মাধ্যমে তরুণরা তাদের দায়িত্ববোধে জাগিয়ে তুলতে পারবে।
পাবলিক স্পিকিং
পাবলিক স্পিকিং বলতে বোঝায় জনসাধারণের সামনে কথার মাধ্যমে নিজেকে উপস্থাপন করা। আপনি শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী অথবা চাকরিজীবী হন, পাবলিক স্পিকিং আপনার জন্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এটি ব্যক্তির আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, যেকোনো বিষয় নিয়ে তথ্য সংগ্রহের মধ্য দিয়ে ব্যক্তির মধ্যে গবেষণার দক্ষতা গড়ে তোলে। অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্যও পাবলিক স্পিকিংয়ের বিকল্প নেই। পাবলিক স্পিকিং নিজের মধ্যে নেতৃত্বের চর্চা বিকশিত করতে সহায়তা করে। পাবলিক স্পিকিং প্রত্যেকের আত্মবিশ্বাসকে বাড়িয়ে দেয়। মনে রাখতে হবে, গুছিয়ে কথা বলতে পারা একটা আর্ট যা সবাই পারে না। পাবলিক স্পিকিংয়ের মাধ্যমে কমিউনিকেশন স্কিল অনেক সুন্দর করে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব এবং অপরিচিত কারও সঙ্গে খুব সহজেই মিশে কথা বলতে পারার দক্ষতা শেখায়। সুতরাং একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তরুণ প্রজন্মের জন্য পাবলিক স্পিকিং একটি গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা।
দলগত কাজ
একবিংশ শতাব্দীর দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে সফল হওয়ার জন্য দলগত কাজের দক্ষতা অর্জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি কেবল একসঙ্গে কাজ করা নয়, বরং প্রযুক্তি, যোগাযোগ এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জন করা। দলগতভাবে কাজ করলে অনেক কঠিন কাজেও সহজে সফলতা আসে। দলগত কাজ যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একে অন্যের সহায়ক হিসেবে কাজ করে। যেমন, একজন হয়তো যোগাযোগে ভালো, অন্যজন হয়তো সুন্দর করে কথা বলতে পারে, আবার কেউ হয়তো অন্যপক্ষকে বোঝানোর ক্ষমতা রাখেন। এভাবে সবাই মিলে সহজেই সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়ানো যায়। দলগত কাজের মাধ্যমে নতুন সৃজনশীলতার সঙ্গে পরিচিতি, বিভিন্ন ধরনের ওয়ার্কশপ আয়োজন, সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা এবং নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়। সবাই মিলে কাজ করলে নতুন কাজের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়।
চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সক্ষমতা
একুশ শতক তরুণ প্রজন্মের জন্য এক বিস্ময়কর উদ্ভাবনী চ্যালেঞ্জের ভাস্কর। বিপুল সম্ভাবনা আর মারাত্মক আশঙ্কার বার্তা নিয়ে একুশ শতকের আবির্ভাব। একুশ শতক সংকট ও সম্ভাবনার, শ্রম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার, সহিষ্ণু ও ভ্রাতৃত্বের এবং সুষম কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের শতক। এ শতকের পরিবর্তিত পরিবেশ, অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজনীতি, সংস্কৃতি ও প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে তরুণ প্রজন্মকে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। যেকোনো নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্রে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখে উদ্ভাবনের প্রয়াস অব্যাহত রাখতে হবে।
পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন
একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নিজের পেশাগত দক্ষতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে দ্রুততর উপায় হচ্ছে পেশা সংক্রান্ত সেমিনার, কর্মশালা ও বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণ। এ ছাড়া পেশা সংক্রান্ত দেশ-বিদেশি বই, পত্রপত্রিকা, জার্নাল, ম্যাগাজিন এবং গবেষণাপত্র পড়ার মাধ্যমে আপনি আপনার প্রয়োজনীয় দক্ষতার উন্নয়ন করতে পারবেন। সততা, নিষ্ঠা, অধ্যবসায়, পরিশ্রম, সময়ানুবর্তিতা ইত্যাদি যেকোনো পেশাগত দক্ষতার উন্নতিতে বড় ভূমিকা রাখে। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে বিশ্ব এখন হাতের মুঠোয়, জীবন এখন প্রযুক্তিনির্ভর। প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে পেশাগত দক্ষতা অর্জন ক্যারিয়ারে দ্রুত উন্নতি, কাজের মান উন্নয়ন, প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা এবং পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন।
সামাজিক পরিষেবা
একুশ শতকের যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সামাজিক পরিষেবার ভূমিকা অপরিসীম। দেশের যেকোনো সংকটকালীন মুহূর্তে দেশ ও সমাজের উন্নয়নে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করার জন্য মানসিকভাবে নিজেকে প্রস্তুত রাখতে হবে। সামাজিক পরিষেবার দক্ষতা অর্জন তরুণদের আত্মত্যাগ, দায়িত্ববোধ, যোগাযোগ দক্ষতা, ধৈর্য ও সহনশীলতা, সহানুভূতি ও মূল্যবোধকে জাগিয়ে তোলে। সামাজিক পরিষেবায় তরুণদের অংশগ্রহণ একদিকে যেমন তাদের দায়িত্বশীলতা ফুটিয়ে তোলে অন্যদিকে সুপ্ত সৃজনশীল ভাবনা প্রকাশ হয়।
লেখালেখির দক্ষতা অর্জন
কথা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই লেখাও ব্যক্তির পেশাদারত্বের প্রতিচ্ছবি। শুধু কথা নয়, লিখিত ভাষায় সঠিকভাবে প্রকাশ করার ক্ষমতা যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নিজেকে আরও শক্তিশালী করে। তরুণ শিক্ষার্থীদের লেখার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। লেখালেখির জন্য বিভিন্ন প্লাটফর্ম রয়েছে, যেখানে তরুণদের অনলাইন কোর্স বা ওয়ার্কশপের মাধ্যমে ইমেইল, রিপোর্ট, কলাম, ফিচার, নোট লেখা শেখানো হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে তরুণদের লেখালেখির দক্ষতা অর্জনে সবচেয়ে জনপ্রিয় একটি প্লাটফর্ম হচ্ছে বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম।
আইটি দক্ষতা অর্জন
সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বর্তমান বিশ্ব খুব বেশি প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে যাচ্ছে। আমরা অবশ্য প্রযুক্তির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হতে চাই না, তবে এগুলো আমাদের জীবনকে অনেক সহজ করে তুলছে এবং অনেক বেশি সুবিধা দিচ্ছে। এসব প্রযুক্তির ব্যবহার ও প্রয়োগ সম্পর্কে তরুণরা না জানলে যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাধার সম্মুখীন হতে হবে। একবিংশ শতাব্দীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে প্রযুক্তি তথা আইটি জ্ঞান বাড়ানো জরুরি। কম্পিউটার ব্যবহারে দক্ষতা যেমনÑ এমএস ওয়ার্ড, এক্সেল, পাওয়ারপয়েন্ট, গ্রাফিক্স ডিজাইন, ওয়েব ডিজাইন, ভিডিও এডিটিং, প্রোগ্রামিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, এআই প্রযুক্তির মতো দক্ষতাগুলো তরুণদেরকে বাধ্যতামূলক অর্জন করতে হবে।
উল্লিখিত দক্ষতাগুলোর বাইরে তরুণরা ভাষাগত দক্ষতা, উদ্যোক্তা হওয়ার দক্ষতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়েও নিজেকে উন্নত করতে পারে। আমাদের তরুণদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তাদের বর্তমান প্রস্তুতির ওপর। আর সেই প্রস্তুতি কেবল পরীক্ষায় পাসের জন্য নয়, বরং বাস্তব জীবনে দক্ষ হওয়াও অত্যন্ত জরুরি। তাই তরুণদের পাশাপাশি আমাদের অভিভাবক, শিক্ষক, সমাজ ও সরকার সবার সম্মিলিত উদ্যোগে দেশের তরুণ সমাজকে একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষ, কর্মমুখী ও আত্মনির্ভর করে গড়ে তুলতে হবে।