× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

মধুর আমার মায়ের হাসি

আমিরুল আবেদিন

প্রকাশ : ১০ মে ২০২৬ ১১:১৭ এএম

মধুর আমার মায়ের হাসি

শান্তিবাদী সমাজকর্মী ভার্জিনিয়া অ্যান এক শান্তিবাদী সমাজকর্মী ছিলেন। একবার তার মেয়ের সামনেই অ্যান হাত জোড় করে বলেছিলেন, 'আমি প্রার্থণা করি, একদিন কেউ না কেউ কোনো মায়েদের জন্য একটি দিন উৎসর্গ করুক। কারণ তারা প্রতিদিন মনুষ্যত্বের জন্য নিজেদের উৎসর্গ করেছেন। অ্যানের ইচ্ছে পূরণ হয়েছিল। তরুণদের জীবনের পুরো অংশজুড়ে থাকা মায়েদের উপস্থিতির কথা স্বীকার করে নেন সবাই। সে স্বীকারের বাইরে থাকে না সাহিত্যের পাতাও। লিখেছেন আমিরুল আবেদিন

প্রতিটি সন্তানের প্রথম শিক্ষক মা- এটা পুরোনো কথা। তার পরও পুরোনো কথাটি বলতে হয়, নতুন সময়ের স্বার্থেই বলতে হয়। বিশেষত মা আমাদের কাছে সময়ের হিসাবে পুরোনো মানুষ হলেও এই সময়ের স্বার্থে কত গুরুত্বপূর্ণ তা নতুন করে বলে দিতে হবে না। মা সবার জন্যই খুব গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ। মাকে নিয়ে আবেগঘন হওয়ার কিংবা তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সবচেয়ে বড় মাধ্যম আমাদের কাছে সব সময়ই সাহিত্য। আজ অবশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বরাতে সে কাজটি আরও সহজ কিন্তু সেখানেও এক-আধ খানি বাক্য আকারে লেখার তাগিদটা আমরা পাই। মাকে কেন্দ্র করে অনেক গল্প, উপন্যাস, কবিতা, নাটক লেখা হয়েছে। কিছু সাহিত্যে লেখকের মা সরাসরি আবির্ভূতও হয়েছেন। মা নিয়ে সাহিত্যকর্মের বিষয়ে আমাদের অনেক কিছু জানা থাকলেও লেখকের মা সরাসরি কীভাবে তার জীবনে সংযুক্ত হয়েছে তা আমাদের অনেকেরই জানা নেই। সাহিত্য যেহেতু সমাজের দর্পণ তাই সাহিত্যিকের জীবনে মায়ের উপস্থিতিটুকুও আমরা দেখতে চাই। ওই জাদুর কথা ভেবেই প্রথমে ওই পুরোনো কথাটি তোলা।

বিদ্যাসাগরের মা

কোনো খবর থাকুক আর না থাকুক। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের গল্পটি আমাদের খুব চেনা। নবজাগরণের এই পুরোধা ব্যক্তিত্ব প্রচণ্ড বর্ষার রাতে উত্তাল দামোদর নদ সাঁতরে মাকে দেখতে গিয়েছিলেন। অসুস্থ মাকে দেখার জন্য ছুটির আবেদন করেও না পেয়ে চাকরিই ছেড়ে দিয়েছিলেন। ঈশ্বরচন্দ্রের মা ভগবতী দেবী নিজেও ছিলেন পশ্চাৎপদ সময়ের আলোকিত মানুষ। পাড়াগাঁর অভাবী লোকের খোঁজখবর নিয়মিত নিতেন, নিজের পাতের ভাত অন্যকে খাওয়াতেন, মাত্র ১০০ টাকার জন্য কোনো মেয়ের বিয়ে ঠেকে রয়েছে, ধার করে হলেও টাকাটা জোগাড় করে দিতেন। বিদ্যাসাগরের মধ্যে মায়ের এই কল্যাণকর দিকটি কীভাবে এসেছে তা কি বোঝা যায়? বিদ্যাসাগর মাকে নিয়ে না লিখলেও তাঁর জীবন দিয়ে মাকে প্রকাশ করেছিলেন।

রবীন্দ্রনাথের ‘অন্য মা’

সাহিত্যের কথাই যখন এলো, তখন সবার প্রথমেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা তুলতে হয়। রবীন্দ্রনাথ কি মাকে নিয়ে লেখেননি? ঠিক এভাবে মায়ের সঙ্গে রবিঠাকুরের সম্পর্ক খোঁজার চেষ্টা করেন অনেকে। রবীন্দ্রনাথ কিন্তু মাকে নিয়ে ঠিকই লিখেছেন। ‘আমার মা না হয়ে তুমি/আর কারো মা হলে/ভাবছ তোমায় চিনতেম না,/যেতেম না ঐ কোলে?/মজা আরো হত ভারি,/দুই জায়গায় থাকত বাড়ি,/আমি থাকতেম এই গাঁয়েতে,/তুমি পারের গাঁয়ে।’ মাত্র ১৪ বছর বয়সে মা সারদা দেবীকে হারিয়েছিলেন কবিগুরু। সারদা দেবী প্রায়ই অসুস্থ থাকতেন কিংবা সাংসারিক কাজে ব্যস্ত থাকতেন। বনেদিয়ানার কাঠামোয় তাই রবীন্দ্রনাথের মনে মাকে ঘিরে বোধহয় শিশুসুলভ অভিমানটিই ছিল। সেজন্যই বোধহয় ‘অন্য মা’ কবিতাটি লিখেছেন। এ ছাড়া আরও কয়েকটি কবিতায় মায়ের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও অভিমানী মিশেলের কবিতা আছে।

হুমায়ুন আজাদের ‘আমাদের মা’

‘আমাদের মাকে আমরা বলতাম তুমি, বাবাকে আপনি। আমাদের মা গরিব প্রজার মতো দাঁড়াতো বাবার সামনে, কথা বলতে গিয়ে কখনোই কথা শেষ করে উঠতে পারতো না। আমাদের মাকে বাবার সামনে এমন তুচ্ছ দেখাতো যে মাকে আপনি বলার কথা আমাদের কোনো দিন মনেই হয়নি। আমাদের মা আমাদের থেকে বড় ছিলো, কিন্তু ছিলো আমাদের সমান...।’ হুমায়ুন আজাদও মাকে নিয়ে একটি প্রবন্ধ লেখার তাড়না অনুভব করেছিলেন। তিনি মায়ের যে চিত্র উপস্থাপন করেন তা তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ছাপিয়ে মধ্যবিত্ত পরিবারের মায়ের চিত্র হিসেবে দেখা দেয়। মধ্যবিত্ত পরিবারে মা সন্তানদের বন্ধু। সেখানে মায়ের কাছে সব বলা যায়। তাঁর সঙ্গে সম্পর্কের দূরত্বটাও কম নয়।

আল মাহমুদের শৈশব যেভাবে কেটেছে

আল মাহমুদের শৈশব কেটেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। শৈশবের বহু ঘটনা তাঁর মনে দাগ কেটেছে। তাঁর আত্মজীবনীর মাধ্যমে আমরা জেনেছি তাঁর দাদির মৃত্যুর ঘটনা আবার ছোট বয়সে অলকা নামে এক মেয়ের প্রতি মানবিক অনুভূতির গল্প। এই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোয় আল মাহমুদের সঙ্গে তাঁর মায়ের উপস্থিতি সব সময়ই ছিল। এমনকি মা সম্পর্কে আল মাহমুদের ধারণাটি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অটুট ছিল। মা সম্পর্কে তাঁর বর্ণনাটিও তাই অসম্ভবসুন্দরÑ ‘আমি উঠোনের ধুলো-কাদায়, রোদ-বৃষ্টিতে খেলতে খেলতে হঠাৎ দৌড়ে এসে আমার মায়ের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারতাম না। মনে হতো পরীর মতো সেজেগুজে তার শরীরটা নোংরা হয়ে যাবে। তার পাটভাঙা জংলিপাড়ের সুন্দর শাড়িটা মলিন করে ফেলব আমি। আমি দূর থেকে তাঁকে দেখে সুখ পেতাম। মাঝেমধ্যে তাঁর খুব কাছে গেলে তাঁকে খুব অবাক হয়ে দেখতাম। তিনি তাঁর সখীদের সাথে আমাদের বারান্দায় আড্ডায় বসলে আমি একটা বেড়ালছানার মতো তাঁর পায়ের কাছে বসতাম। তাঁর পায়ের নখের ওপর লুটিয়ে পড়া শাড়ির সোনালি পাড়টা সাবধানে সরিয়ে দেখতাম আলতাপরা সুন্দর পা দুটি। চীনা মেয়েদের মতো খুদে আর ধবধবে ফরসা। নখগুলো সমান কর কাটা। একটা সামান্য দাগ বা মলিনতা নেই।’ এবার কি বোঝা যায় নোলকের অনুপ্রেরণা কোথা থেকে পেলেন কবি?

মা বুড়িয়ে যাচ্ছেন, কমলা দাস

একটু দেশি সীমানার বাইরে যাওয়া যাক। অনেক লেখকই তাঁর বহু লেখায় মাকে উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু একটি পুরো কবিতার বই-ই মাকে তাঁর অনুভূতির বৈচিত্র্য দেখিয়েছে এমনটা খুব কমই পাওয়া যাবে। মালয়ালাম কবি কমলা দাসের ‘মাই মাদার অ্যাট সিক্সটি সিক্স’ কাব্যগ্রন্থটি বের হওয়ার পর কবিতাজগতে আলোড়ন তৈরি হয়। মূলত নিজের মায়ের প্রতি তাঁর অনুভূতি জানাতেই তিনি কবিতাগুলো লিখেছিলেন। বয়সের এক পর্যায়ে কমলা অনুধাবন করলেন তাঁর মায়ের বয়স বেড়ে যাচ্ছে। তিনি আর আগের মতো ছায়া হয়ে সবকিছু গুছিয়ে ফেলতে পারেন না। এক হাতে যে সংসার সামলাতেন তা যে আর তিনি নিয়ন্ত্রণ করছেন না! মা মারা যাবেন! মাকে হারানোর এই শঙ্কা থেকে জেগে ওঠা অনুভূতিগুলোর প্রকাশ করেছেন কবিতাগুলোয়। একদমই বাস্তব, কোনো কল্পনা নয়। মাকে একটি নির্দিষ্ট বয়সে দেখার এই অনুভূতি আমাদেরও কি অপরিচিত?

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা