তৌকির মুহাইমিন
প্রকাশ : ০৭ মে ২০২৬ ১৩:০৩ পিএম
আপডেট : ০৭ মে ২০২৬ ১৩:০৩ পিএম
অলংকরণ : ইবতেসাম মাহবুব ইফাজ, চতুর্থ শ্রেণি, বিএএফ শাহীন কলেজ, ঢাকা
ভোরবেলার আলো তখনও পুরোপুরি ফোটেনি। আকাশের কোণে একটুখানি গোলাপি আভা, যেন কেউ রঙতুলি দিয়ে আলতো করে ছুঁয়ে দিয়েছে। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে চালের ফ্যান আর হলুদের মিষ্টি গন্ধ। পুরো বাড়িটা তখনও ঘুমিয়ে, কিন্তু একটা মানুষ জেগে আছেনÑ সেই মানুষটার নাম মা।
নাসরিন বেগম প্রতিদিন ভোর ৫টায় ওঠেন। শীতের কনকনে ঠান্ডাতেও, ঝড়ের রাতেও, জ্বরের মাথাতেও। তার দিন শুরু হয় অন্যদের জন্য। সন্তানের টিফিন, স্বামীর চা, বৃদ্ধ শাশুড়ির ওষুধÑ সবকিছু গুছিয়ে দিয়ে তারপর তিনি নিজের জন্য একটু ভাবেন। আসলে ভাবেন কি? নাকি ভুলেই যান?
ছেলেবেলার স্মৃতি
তানভীরের বয়স তখন আট। স্কুলে অঙ্কে ফেল করে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরেছিল সে। ভয় ছিল বাবার বকা খাওয়ার, লজ্জা ছিল নিজের কাছেই। কিন্তু দরজা খুলতেই মা বুকে টেনে নিলেন। কোনো প্রশ্ন নেই, কোনো রাগ নেই।
‘আমার ছেলে কাঁদছে কেন?’ মা শুধু জিজ্ঞেস করলেন, কণ্ঠে ছিল এত মায়া যে তানভীর আরও জোরে কেঁদে ফেলল।
সেদিন বিকালে মা পাশে বসে অঙ্ক করিয়ে দিয়েছিলেন। নিজে বেশি পড়াশোনা না করলেও সন্তানকে বোঝাতে তার কোনো কষ্ট হয়নি। ভালোবাসা দিয়ে বোঝানো যায়Ñ এটা সেদিন তানভীর বুঝেছিল।
কঠিন সময়
বছর দশেক আগে পরিবারে নেমে এসেছিল ভয়ানক এক সংকট। বাবার ব্যবসায় ধস, বাড়িতে টানাটানি। তানভীর তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছিল।
একদিন রাতে সে দেখল, মা চুপচাপ তার সোনার চুড়ি খুলে রাখছেন একটা কাপড়ে মুড়িয়ে। বিক্রি করবেন। তানভীর থমকে গেল।
‘মা, এটা কী করছ?’
‘তোর বেতন দিতে হবে না? পড়া বন্ধ করলে আমি বাঁচব না রে।’ মা মুচকি হাসলেন, চোখ দুটো একটু চকচকে, কিন্তু কণ্ঠ দৃঢ়।
সেই রাতে তানভীর বুঝলÑ মায়ের কাছে সোনার চেয়ে সন্তানের স্বপ্ন অনেক বেশি দামি।
দূরত্বের বেদনা
পড়াশোনা শেষে তানভীর চলে গেল ঢাকায়, তারপর বিদেশে। মায়ের কাছ থেকে হাজার মাইল দূরে। ফোনে কথা হয়, ভিডিও কলে দেখা হয়, কিন্তু মায়ের হাতের রান্নার গন্ধ পৌঁছায় না স্ক্রিনের ওপারে।
একবার দীর্ঘ অসুস্থতায় শয্যাশায়ী হয়ে পড়ল তানভীর। একা ঘরে জ্বরে গা পুড়ছে, মাথায় যন্ত্রণা। সেই মুহূর্তে শুধু একটাই ইচ্ছে করছিলÑ মা যদি একবার মাথায় হাত দিতেন। সেই ঠান্ডা নরম হাত, যে হাত সারা জীবন সব ব্যথা সারিয়েছে।
ফোন করল মাকে। মা ফোন ধরতেই কণ্ঠ বেরোল না। শুধু বলল, ‘মা।’
মা বুঝে গেলেন। ‘কাঁদছিস কেন? পাশে আছি রে। সবসময় পাশে আছি।’
হাজার মাইল দূর থেকেও মায়ের কণ্ঠ সব ব্যথা সারিয়ে দিল।
ফিরে আসা
এবার মা দিবসে তানভীর সারপ্রাইজ দিল মাকে। আগে না জানিয়ে উড়ে এলো দেশে। ভোরবেলা গ্রামের বাড়ির উঠোনে পা দিল সে।
মা তখন উঠোনে বসে মটরশুঁটি ছাড়াচ্ছিলেন। চুলে কিছু পাক ধরেছে, কপালে বলিরেখা পড়েছে। কিন্তু চোখ দুটো সেই একই, সেই চিরচেনা মমতার আলোয় ভরা।
তানভীর ডাকল, ‘মা।’
মা তাকালেন। একটা মুহূর্ত চুপ। তারপর মটরশুঁটির বাটি মাটিতে রেখে উঠে দাঁড়ালেন। দৌড়াতে পারলেন না, পা দুটো বয়সের ভারে ধীরÑ কিন্তু চোখের জল দৌড়াল।
‘আয়, আয় রে আমার বাবা।’ বলে জড়িয়ে ধরলেন ছেলেকে।
তানভীর সেই বুকে মুখ লুকিয়ে ভাবল, সারা পৃথিবী ঘুরেও এই বুকের মতো নিরাপদ জায়গা সে কোথাও পায়নি।
মায়ের উপহার
দুপুরে মা রান্না করলেনÑ তানভীরের পছন্দের সব পদ। ইলিশ মাছের ঝোল, মসুর ডাল, কচু শাক। ছেলে বিদেশে থেকে কত কী খায়, কত রেস্টুরেন্টে যায়। কিন্তু মায়ের হাতের এই রান্নার সামনে সব ম্লান।
খেতে খেতে তানভীর বলল, ‘মা, তোমাকে কী দিই বলো? মা দিবসে কী চাও?’
মা একটু হাসলেন। বললেন, ‘তুই এসেছিস, এটাই সব পেয়েছি।’
‘মায়েরা কিছু চায় না রে। শুধু চায় ছেলেমেয়ে ভালো থাকুক, সুখী হোক। এটুকুই তো সারা জীবনের পুরস্কার।’
সন্ধ্যার কথা
বিকালে মা-ছেলে পাশাপাশি বসে আছেন উঠোনে। সোনালি রোদ নামছে। মা তানভীরের মাথায় হাত বোলাচ্ছেন, ছোটবেলার মতো। তানভীরের চোখ বন্ধ।
সে ভাবছে, এই হাত দুটো কত কাজ করেছে তার জন্য। কত রাত জেগেছেন মা তার জ্বরে, কত কষ্ট করেছেন নীরবে, কত স্বপ্ন ছেড়ে দিয়েছেন নিজেরÑ শুধু যাতে ছেলের স্বপ্ন পূরণ হয়।
মা কখনও সে কথা বলেননি। কখনও অভিযোগ করেননি। শুধু দিয়েছেন, দিয়েই গেছেন।
‘মা’ তানভীর আস্তে ডাকল।
‘বল।’
‘তোমাকে অনেক ভালোবাসি।’
মা কিছু বললেন না। শুধু একটু জোরে চাপ দিলেন ছেলের মাথায়। সেই স্পর্শে ছিল সারা জীবনের কথাÑ সব ত্যাগ, সব ভালোবাসা, সব আশীর্বাদ।
‘মা মানে শুধু একটি শব্দ নয়,
মা মানে একটি পৃথিবীÑ যেখানে সবসময় ফেরা যায়।’
ষষ্ঠ শ্রেণি, বরিশাল জিলা স্কুল