শফিকুল ইসলাম খোকন
প্রকাশ : ০৬ মে ২০২৬ ১৪:২৩ পিএম
সাতক্ষীরার একটি সাইক্লোন শেল্টার ছবি : স্বর্না কাজী
দুর্যোগ, বন্যা, সাইক্লোন, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, বেড়িবাঁধ ভাঙনÑ এমন দুর্বিষহ জীবনযাপন করছে উপকূলের মানুষ। প্রতিনিয়তই উপকূলের বাসিন্দারা দুর্যোগের সঙ্গে মোকাবিলা করছেন। ঘূর্ণিঝড়ের সময় প্রাণ বাঁচানোর জন্য উপকূলের আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে আশ্রয় নেয়। উপকূলে আশ্রয়কেন্দ্র অপ্রতুল, যা আছে তাও অব্যবস্থাপনায় বেসামাল। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশ পৃথিবীর একটি অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ। প্রতি বছরই এদেশের কোনো না কোনো অঞ্চল দুর্যোগে আক্রান্ত হয়। জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা ও দারিদ্রের কারণে এই দুর্যোগের মাত্রা ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। দুর্যোগ প্রতিহত করা সম্ভব নয়, তবে দুর্যোগের পূর্বপ্রস্তুতি থাকলে জীবন ও সম্পদের ক্ষতি অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব।
দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি
উপকূলের বাসিন্দাদের জীবন চলে অতি কষ্টে। ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, দুর্যোগের সঙ্গে তাদের বসবাস। প্রতিনিয়ত দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করেই বেঁচে থাকে উপকূলবাসী। নানাবিধ দুর্যোগে ভুক্তভোগী হয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েন এখানকার অধিকাংশ বাসিন্দা। উপকূলবাসীর অন্তহীন দুর্দশা এবং জীবন-জীবিকার এমন চিত্র সব সময়ই।
১৭৬২ সালে, ১৭৯৫ সালের ৩ জুন, ১৮৯৭ সালের ২৪ অক্টোবর, ১৯০৫ সালের ২৯ এপ্রিল, ১৯৬৩ সালের ২৭ মে, ১৯৭২ সালের অক্টোবর, ১৯৯৭ সালের নভেম্বর, ১৯৬৫ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে কুতুবদিয়া দ্বীপসহ উপকূলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ে উপকূলের ৫ লাখেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল এবং ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণহানি ১ লাখ ৩৮ হাজার। সেই অবস্থা থেকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ অভাবনীয় উন্নতি করেছে, যার প্রমাণ ২০০৭ সালে সিডরের মতো সুপার সাইক্লোনেও মানুষের মৃত্যু আটকে রাখা গেছে ১০ হাজারের নিচে। এর পরের ঘূর্ণিঝড়গুলোতে যা একেবারেই কমে এসেছে। এ ছাড়া সিডর-পরবর্তী আইলা, রোয়ানু, নার্গিস, বুলবুল, ফণী, মিডিলি, রিমাল থেকে শুরু করে নানা দুর্যোগ। এসব দুর্যোগে বেশিরভাগই মারা গেছে আশ্রয়কেন্দ্রের অভাবে, আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার সময়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দিন দিন বন্যা, ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সংখ্যা ও তীব্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

উপকূলে আশ্রয়কেন্দ্র থাকার সুবিধা
বাংলাদেশের উপকূলে অসংখ্যা আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রের পাশাপাশি উপকূলের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও বন্যার সময় আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবহার হয়ে থাকে। এত কিছুর পরও এখনও জনসংখ্যার তুলনায় অপর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র; যা আছে তাও অরক্ষিত থাকে। ২০২০ সালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মো. এনামুর রহমানের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, দেশে ১৪ হাজারের বেশি আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার মধ্যে উপকূলীয় অঞ্চলে ৩৬ শতাংশ মানুষের বসবাস। সে অনুযায়ী ধারণক্ষমতার দিক থেকে অপ্রতুল। সংশ্লিষ্টদের মতে, উপকূলে আশ্রয়কেন্দ্র বৃদ্ধি করা দরকার।
দেশ স্বাধীনের আগে উপকূলজুড়ে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। যার ফল পাওয়া যায় ১৯৭০ ও ১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে আশ্রয়কেন্দ্র বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণ বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলার প্রধান স্তম্ভ হিসেবে আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ বিশেষভাবে বিবেচিত হতে থাকে। উপকূলজুড়ে মোট কতগুলো ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র আছে, তার সঠিক হিসাব পাওয়া না গেলেও ধারণা করা হয় এ সংখ্যা সব মিলিয়ে ১৪ হাজারের বেশি। ২০০৭ সাল পর্যন্ত মোট ৩ হাজার ৯৭৬টি আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। ১৯৯১ সালের মাস্টারপ্ল্যান অনুয়ায়ী প্রতিটি আশ্রয়কেন্দ্র স্বাভাবিক সময়ে পাঠদান কেন্দ্র (স্কুল কাম সাইক্লোন শেল্টার) হিসেবে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত হয়, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল বছরের স্বাভাবিক সময়ে ভবনের রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা। পরবর্তী সময়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় আরও ২০০০ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের ঘোষণা দেয়; এর মধ্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ ও বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ৮০৭টি আশ্রয়কেন্দ্র বাানানোর দায়িত্ব নেয়। কিন্তু উপকূলের তিন কোটি মানুষের জন্য এ সংখ্যা পর্যাপ্ত নয়। ২০০৭ সালের পর আশ্রয়কেন্দ্রের নকশায়ও কিছু পরিবর্তন আনা হয়। দ্বিতল ভবনের পরিবর্তে জলোচ্ছ্বাসের কথা বিবেচনায় বহুতল ভবন নির্মাণের প্রস্তাব আনা হয়, যার নিচতলার পুরোটা খোলা থাকবে, প্রতিটি ভবনে ৫০০ থেকে ২৫০০ মানুষের ধারণক্ষমতা থাকবে।
২০১১ সালে প্রণীত ‘ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা নীতিমালা’ অনুযায়ী তিন ধরনের ভবনকে দুর্যোগকালীন আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয় কাম আশ্রয়কেন্দ্র, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও মাদ্রাসা কাম আশ্রয়কেন্দ্র এবং সমগ্র উপজেলায় অবস্থিত বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি পাকা ভবন। জেলা প্রশাসনকে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রের প্রধান সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এ নীতিমালা অনুসারে, ব্যক্তি মালিকানাধীন বিভিন্ন পাকা দালান, সরকারি-বেসরকারি অফিস, বাণিজ্যিক ভবনও দুর্যোগকালীন আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার হওয়ার কথা। এতসব নীতিমালা ও উদ্যোগ সত্ত্বেও উপকূলজুড়ে দুর্যোগকালীন মানুষের বিপদাপন্নতা রয়ে গেছে। প্রধান কারণগুলো হলোÑ জনসংখ্যা বৃদ্ধি সাপেক্ষে আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়েনি, উপকূলের জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে আশ্রয়কেন্দ্রের অপর্যাপ্ততা, দুর্যোগের সময় জরুরি সাড়াদানকারী সংস্থাগুলোর সমতা ও তাদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাব, স্বেচ্ছাসেবকদের সমতা বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের অভাব, সতর্কসংকেত ব্যবস্থায় অসামঞ্জস্যতা ও দুর্যোগকালীন গবাদিপশু রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগের অভাব ইত্যাদি। যদিও বিগত সরকার নতুন নতুন অসংখ্য আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করেছেন। কিন্তু সেগুলো অব্যবস্থাপনায় পূর্ণ ও অরক্ষিত।
আশ্রয়কেন্দ্র কতটুকু নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীবান্ধব
উপকূল জুড়ে বন্যার সময় এক ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়। বন্যা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উপকূলের মানুষজন আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার পথে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। আর যারা আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে আশ্রয় নেয়, সেই সব আশ্রয়কেন্দ্র কতটুকু নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীবান্ধব, তা নিয়ে সংশয় রয়ে যায়। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে নারীদের ব্রেস্ট ফিডিং বা নারী কর্নার নেই। এ ছাড়া শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য নেই আলাদা কোনো ব্যবস্থা। ফলে দুর্যোগের সময় আশ্রয়কেন্দ্রে নানা রকমের হয়রানির শিকার হচ্ছে। তা ছাড়াও দুর্যোগকালীন নারী ও কন্যাশিশুরাও সহিংসতার শিকার হয়ে থাকে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলো আধুনিকায়নসহ নতুন করে গবেষণার দাবি করছে উপকূলবাসী। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় আশ্রয়কেন্দ্রে নারী ও শিশুরাই বেশি দুর্ভোগের শিকার হয়। এ ছাড়া আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের জন্য এলাকা নির্বাচনের ক্ষেত্রেও সহজ যোগাযোগব্যবস্থা জরুরি বলেও মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
আশ্রয়কেন্দ্রের সঙ্গে পর্যাপ্ত সংযোগ সড়ক নেই
বাংলাদেশের ১৯টি জেলা নিয়ে উপকূল। স্বভাবতই উপকূলীয় অঞ্চল উন্নয়নের দিক থেকে সব সময়ই পেছনে থাকে। বেশিরভাগ আশ্রয়কেন্দ্র বেড়িবাঁধ ও গ্রামীণ অঞ্চলে অবস্থিত। এসব আশ্রয়কেন্দ্রের সঙ্গে সংযোগ সড়ক না থাকায় অনেকাংশে দুর্যোগের সময় আশ্রয়কেন্দ্রে আসার পথে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে থাকেন উপকূলবাসী। প্রায় দুর্যোগের সময়ই আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার পথে আহত ও মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। একাধিক স্থানীয় বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যেসব এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্র আছে সেখানে জনবসতি কম। ওইসব আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য অধিকাংশ জায়গায় সংযোগ সড়ক না থাকার কারণে দুর্যোগের সময় আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার পথে নানা দুর্ঘটনা ঘটে। এসব সমাধানে দ্রুত ও স্থায়ী সংযোগ সড়ক নির্মাণের দাবি উপকূলবাসীর।
বিদ্যুৎ, নিরাপদ পানি ও স্যানিটারির অপ্রতুলতা
এমনিতেই উপকূলজুড়ে নিরাপদ পানির সংকট থাকে প্রকট। তার ওপর দুর্যোগের সময় মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে আসে নিরাপদ পানি ও স্যানিটারি অসুবিধা। দুর্যোগের সময় উপকূলে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা একেবারেই নাজুক থাকে। ঘূর্ণিঝড় বা বন্যা পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ্বাস একযোগে আসে। প্রবল বাতাস আর পানির তোড়ে ঘর ও অন্যান্য সবকিছুর সঙ্গে পায়খানা ও নলকূপ ভেসে যায়, বিশেষ করে নিচু জায়গার। নলকূপের পানি দূষিত হয়ে পড়ে; পায়খানার কাঠামো সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়ে। এগুলো তখন আর ব্যবহার করা যায় না। প্রতিটি আশ্রয়কেন্দ্রে দুর্যোগকালীন ও দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে শুকনা খাবার, নিরাপদ খাবার দেওয়ার ঘোষণা সরকার থেকে থাকলেও বরাবরের মতো না পাওয়ার অভিযোগও থাকে। তা ছাড়া আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে অন্য সময় বিদ্যুৎ সংযোগ থাকলেও সরবরাহ বন্ধ থাকে, দুর্যোগকালীন বিদুৎ সংযোগের কথা চিন্তাই করা যায় না। দুর্যোগের সময় পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি, বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, জেরিক্যান, অস্থায়ী নলকূপ স্থাপনের মালামাল, অস্থায়ী ল্যাট্রিন স্থাপনের মালামাল, ব্লিচিং পাউডার, হাইজিন কিট, মোবাইল ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টসহ দুর্যোগকালীন প্রয়োজনীয় মালামাল মজুদের জন্য বলা হলেও তা যথাযথ থাকে না। বরাবরের মতো এমন অভিযোগ থাকে উপকূলবাসীর। দুর্যোগকালীন বিদ্যুতের বিকল্প সৌরবিদ্যুৎ দেওয়ার দাবি করছেন উপকূলবাসী। তা ছাড়া নিরাপদ পানির জন্য স্থায়ী পানির ট্যাংকি স্থাপন এবং স্যানিটেশন ব্যবস্থা করার জন্য জোরালো দাবি জানান স্থানীয় বাসিন্দারা।
আশ্রয়কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা কমিটি কতটুকু কার্যকর
যেকোনো কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা যেমন থাকে; তেমনি থাকে একটি কার্যকরী কমিটি, যে কমিটি সঠিকভাবে আশ্রয়কেন্দ্রের কাজ পরিচালনা করবেন। উপকূলজুড়ে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর ব্যবস্থাপনা বা কার্যকরী কমিটি রয়েছে। কিন্তু বহু পুরাতন কমিটি দিয়েই চলছে এসব আশ্রয়কেন্দ্র। অনেক আশ্রয়কেন্দ্রে কমিটিই নেই। দুর্যোগের সময় অনেক আশ্রয়কেন্দ্রে দেখা যায় তালাবদ্ধ, আশ্রয়কেন্দ্রের সরঞ্জামাদি আশ্রয়কেন্দ্রে থাকে নাÑ প্রভাবশালী কমিটির সদস্যদের বাড়িতে থাকে, কিছু আশ্রয়কেন্দ্র প্রভাবশালীদের দখলে থাকে। এ ধরনের অব্যবস্থাপনা বিপুল আকারে দেখা যায়। অনেকের মতে, মান্ধাতা আমলের কমিটিই আছে কাগজ-কলমে। ঘূর্ণিঝড় ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০১৩ অনুসারে প্রতিটি আশ্রয়কেন্দ্র রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ৮ থেকে ১০ সদস্যের একটি কমিটি থাকবে। দুর্যোগকলীন আশ্রয়কেন্দ্র খুলে দেওয়াসহ বছরের স্বাভাবিক সময়ে এ কমিটি আশ্রয়কেন্দ্রের দেখভাল করার কথা। এ ছাড়া যেসব আশ্রয়কেন্দ্র বিদ্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়, সেগুলোর দেখভাল বিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। কিন্তু যেসব আশ্রয়কেন্দ্র বিদ্যালয় হিসেবে ব্যবহার করা হয় না, সেগুলো সারা বছর অব্যবহৃত পড়ে থাকে। ফলে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১২ এর ১৮। (১) এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে স্থানীয় পর্যায়ে নিম্নবর্ণিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি বা ক্ষেত্রমতে, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠিত হওয়ার কথা থাকলেও কতটুকু কার্যকর হয়ে থাকে সেটিও দেখার বিষয়।
ব্যবস্থাপনা কমিটিতে যুবদের অংশগ্রহণ
দুর্যোগসহ যেকোনো উদ্ধারকাজে যুবকদের অংশগ্রহণ প্রশংসনীয়। দুর্যোগের সময় দেখা যায়, যুবকরাই উদ্ধারকাজে বেশি সম্পৃক্ত থাকে এবং উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। অথচ আশ্রয়কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা কমিটিতে যুবকদের তেমন কোনো অংশগ্রহণ দেখা যায় না। দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাসে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে তরুণ সমাজ। এই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হলো দুর্যোগের সময় তারা দ্রুত সচেতনতা বার্তা ছড়িয়ে দিতে পারে। সেই সঙ্গে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং ঝুঁকি হ্রাস উদ্যোগে অংশ নিয়ে আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর সেবার জন্য যুবসমাজ সহায়তা প্রদান করে থাকে। তাই এই কাজে তাদের সম্পৃক্ততা আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা কমিটিতে যুবকদের অংশগ্রহণ বাড়ানোসহ দুর্যোগকালীন আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া নারী ও শিশুদের নানা ধরনের সহিংসতা এড়াতেও তাদের ভূমিকা জরুরি। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে অনেক ক্ষেত্রে কিশোরীরা মানসিক, শারীরিক, যৌন ও সামাজিক হয়রানির মুখোমুখি হচ্ছে, বিশেষ করে রাতের বেলায়। দুর্যোগকালীন কিশোরীদের অংশগ্রহণও জোরদার করা উচিত। দুর্যোগ পরিস্থিতিতে আশ্রয়, খাবার ও সাধারণ স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করা যেমন জরুরি, তেমনই প্রত্যেকের যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্যের সুস্থতা নিশ্চিত করাটাও অপরিহার্য ও গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ কথা
বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার প্রধান দলিল হিসেবে সরকার ‘দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন ২০১২’ আইন প্রণয়ন করে। পাশাপাশি ‘দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ২০১৫’ অনুমোদিত হয়েছে। এসব যেমন দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের আইনি পরিসীমা সম্পর্কে নির্দেশনা প্রদান করে; তেমনি সামগ্রিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমকে ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে সহায়ক হিসেবে ভূমিকা রাখছে। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট সব অংশীদারকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সব পর্যায়ে নিজেদের দায়িত্ব, কর্তব্য ও করণীয় সম্পর্কে অবহিত করার উদ্দেশ্যে ‘দুর্যোগ বিষয়ক স্থায়ী আদেশাবলি ২০১৯’ প্রণীত হয়। কিন্তু এতকিছু থাকার পরও কেমন যেন ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে তোড়জোড় কম দেখা যাচ্ছে, চাহিদার চেয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে কম হলেও তা যথাযথভাবে ব্যবহার উপযোগী থাকলেও সমস্যা হতো না, কিন্তু অব্যবস্থাপনা থাকায় তা একেবারেই অব্যবহারযোগ্য হয়ে থাকে। যদিও গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে। বাংলাদেশের এসব উদ্যোগ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হয়েছে; যেখানে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছে স্থানীয় জনগোষ্ঠী। অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি জনগণের সচেতনতা বেড়েছে; ফলে দুর্যোগে ক্ষতি উল্লেখযোগ্য হারে কমে এসেছে। সরকার ও বেসরকারি সংগঠন এবং জনগণের যৌথ উদ্যোগের ফলেই তা সম্ভব হয়েছে। এ ধারা অব্যাহত রাখতে হলে অবকাঠামো ও সচেতনতা বৃদ্ধি- এ দুই ক্ষেত্রেই সমতা আরও বাড়াতে হবে; উপকূল নিয়ে গবেষণা বাড়াতে হবে, আশ্রয়কেন্দ্র আধুনিকায়নসহ সময়োপযোগী নকশা করে তৈরি করতে হবে, টেকসই বেড়িবাঁধ করতে হবে, বেড়িবাঁধের বাইরে টেকসই বনায়ন করতে হবে।