× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

হারিয়ে যাচ্ছে মধুপুর গড়ের প্রাকৃতিক ‘মুক্তো’ বেতফল

মোহাম্মদ নাজিবুল বাশার, মধুপুর (টাঙ্গাইল)

প্রকাশ : ০৬ মে ২০২৬ ১৪:১৭ পিএম

ঘায়রা গ্রামের নিশিম্রং দোখলা পিকনিক স্পটে বেতফল ও অন্যান্য পণ্য বিক্রি করছেন

ঘায়রা গ্রামের নিশিম্রং দোখলা পিকনিক স্পটে বেতফল ও অন্যান্য পণ্য বিক্রি করছেন

টাঙ্গাইলের মধুপুর গড়। লাল মাটির এই উঁচু-নিচু টিলা আর শাল-গজারির নিবিড় অরণ্য একসময় ছিল প্রাণবৈচিত্র্যের স্বর্গরাজ্য। এই বনের আনাচে-কানাচে প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে উঠত নানা পদের বুনো ফল। তার মধ্যে অন্যতম এবং সম্ভবত সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল দেশি বেত এবং এর থোকায় থোকায় ঝুলে থাকা মুক্তার মতো সাদাটে বেতফল। কিন্তু কালের আবর্তে, বনভূমি উজাড় আর আধুনিক কৃষির আগ্রাসনে মধুপুর গড়ের সেই আদি বেতবন আজ ইতিহাসের পাতায় নাম লেখাতে বসেছে। হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের শৈশব স্মৃতিমাখা টক-মিষ্টি স্বাদের সেই বুনো ফল। এই ফলকে বিভিন্নভাবে চিনে থাকেন যেমন বেতগাছের ফলকে বেতফল, বেত্তুন, বেথুন, বেথুল, বেতুল, বেতগুলা, বেতগুটি, বেত্তুইনটি ইত্যাদি নামে ডাকা হয়। বেতগাছের বৈজ্ঞানিক নাম Calamus tenuis। এটি বাংলাদেশ, ভুটান, কম্বোডিয়া, লাওস, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ভারত, জাভা ও সুমাত্রা অঞ্চেল পাওয়া যায়।

বেতফল একটি বুনো ফল। এটি কণ্টকাকীর্ণ বা কাঁটায় ছাওয়া বেতগাছে থোকায় থোকায় ফলে। দেখতে অনেকটা ছোট মার্বেলের মতো, কাঁচা অবস্থায় সবুজ আর পাকলে ধবধবে সাদা বা ঈষৎ হলদেটে হয়। ফলের ওপরের আবরণটি পাতলা আঁশের মতো, যা ছাড়িয়ে ভেতরের কষযুক্ত শাঁসটি খেতে হয়। এর স্বাদ টক-মিষ্টির এক অদ্ভুত মিশ্রণ।

মধুপুর গড়ের আদিবাসীদের কাছে বেতগাছ কেবল ফলের উৎস নয়, বরং জীবিকার বড় অবলম্বন ছিল। ঘায়রা গ্রামের নিশিম্রং (৩০) প্রতিদিনের ন্যায় পাহাড়ের পাতদেশে গিয়ে এই বেতফল সংগ্রহ করে দোখলা পিকনিক স্পটে দর্শনার্থীদের কাছে বিক্রি করে সংসার চালান। বেতগাছ দিয়ে গোলাকার লাঠি ও বিভিন্ন পণ্য তৈরি করে বিক্রি করে। তিনি আরও বলেন, বেত দিয়ে তৈরি হতো ঘরের বেড়া, ঝুড়ি, কুলা, ধামা ও আসবাবপত্র। একসময় এই গড়ের শালবনের ভেতরে প্রচুর পরিমাণে দেশি বেতগাছ পাওয়া যেত। বর্ষার শেষে যখন বনের ঝোপঝাড়ের আড়ালে থোকায় থোকায় বেতফল উঁকি দিত, তখন এক অন্যরকম দৃশ্যের অবতারণা হতো। স্থানীয় শিশু-কিশোররা দলবেঁধে বনের গভীরে যেত এই ‘প্রকৃতির মুক্তা’ সংগ্রহ করত।

মধুপুর গড়ের এই ঐতিহ্যবাহী ফলটি আজ কেন বিলুপ্তপ্রায়? এর পেছনে কাজ করেছে বহুমুখী কারণ। আবাসস্থল ধ্বংসে মধুপুর গড়ের শালবন আগের মতো অটুট নেই। বনের বড় বড় গাছ কাটার ফলে তার নিচে জন্মানো ছায়াপ্রিয় বেতবন সূর্যের প্রচণ্ড তাপে শুকিয়ে যাচ্ছে। আদি বন উজাড় ও বাণিজ্যিক বাগান তৈরি। একসময় যেখানে প্রাকৃতিকভাবে বেত ও অন্যান্য বুনো গাছ জন্মাত, সেখানে এখন আনারস, কলা বা পেঁপের মতো বাণিজ্যিক চাষাবাদ হচ্ছে। চাষের জমি বের করতে গিয়ে সবার আগে কাটা পড়ে কাঁটাভর্তি এই বেতগাছ। দীর্ঘ উৎপাদন চক্র একটি বেতগাছ ফল দেওয়ার উপযোগী হতে বেশ কয়েক বছর সময় নেয়। দ্রুত মুনাফার আশায় মানুষ আর এই বুনো ঝোপ সংরক্ষণ করতে আগ্রহী নয়। চাহিদার পরিবর্তন, আধুনিক প্রজন্মের কাছে বিদেশি দামি ফলের আধিক্য বুনো ফলের গুরুত্ব কমিয়ে দিয়েছে। ফলে বাজারেও এখন আর আগের মতো বেতফলের দেখা মেলে না।

বেতফল কেবল একটি ফল নয়, এটি ওষুধি গুণে সমৃদ্ধ। স্থানীয় কবিরাজি চিকিৎসায় হজমের সমস্যা দূর করতে এবং রক্তস্বল্পতা নিরাময়ে বেতফল ব্যবহৃত হতো। এ ছাড়া বেতগাছের কচি আগা বা ‘বেত ডগা’ শাক হিসেবেও বেশ জনপ্রিয়, যা শরীরের তিক্ততা দূর করতে এবং কৃমিনাশক হিসেবে কাজ করে। বাস্তুসংস্থানের দিক থেকেও বেতগাছের গুরুত্ব অপরিসীম। ঘন কাঁটাযুক্ত বেতবন বনের ছোট প্রাণীদের যেমনÑ বেজি, শিয়াল বা বুনো মুরগির জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে। বেতবন হারিয়ে যাওয়ার অর্থ হলো এসব প্রাণীর নিরাপদ আবাসনও হারিয়ে যাওয়া।

বিট বন কর্মকর্তা মোশারফ হোসেন বলেন, গায়রা এলাকায় দশ বিঘা জমির ওপর বেতগাছ লাগানো হয়েছে, যেখানে বন্য প্রাণীদের খাবারের জায়গা হিসেবে বেচে নেয় এবং গারো সম্প্রদায়ের লোকেরাও জীবন-জীবিকা নির্ভর করে থাকে। বর্তমানে মধুপুরের জাতীয় উদ্যান এলাকা ছাড়া সংরক্ষিত বনের বাইরে বেতগাছ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। অথচ দুই দশক আগেও টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ মহাসড়কের দুই পাশে পসরা সাজিয়ে বেতফল বিক্রি করতে দেখা যেত। এখন সেই জায়গা দখল করেছে হাইব্রিড সবজি আর প্লাস্টিকের খেলনা। গড়ের প্রবীণরা আক্ষেপ করে বলেন, ‘আগে জঙ্গলে গেলে কাপড়ে কাঁটা আটকানো ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। এখন সেই জঙ্গলও নেই আর কাঁটাওয়ালা বেতও নেই। বেতফল বা দেশি বেতকে হারিয়ে যেতে দেওয়া মানে আমাদের ঐতিহ্যের একটি অংশকে বিসর্জন দেওয়া। 


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা