× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

লাওসের লোককাহিনী

নুড়ি ছুড়ে ছবি আঁকা

রূপান্তর : আসাদ মিরণ

প্রকাশ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:৪৪ পিএম

অলংকরণ : নিশা আক্তার

অলংকরণ : নিশা আক্তার

লাওস ‘লক্ষ হাতির দেশ’। এই দেশে মানসে নামে দশ বছরের এক অনাথ বালক ছিল। গ্রামের দয়ালু মানুষরা তাকে খেতে দিত। এভাবে কোনোরকম দিন কাটাত তার। 

মানসে জন্ম থেকেই পঙ্গু। হাঁটতে পারত না। তবু গ্রামের ছেলেরা তাকে খেলতে নিত।

একটি খেলায় মানসে ছিল সবার সেরা। একা একা সময় কাটাতে গিয়ে সে পাথর ছোড়ায় অসাধারণ দক্ষ হয়ে ওঠে। দূরের কোনো লক্ষ্য ঠিক করে সে নুড়িপাথর ছোড়ার প্র্যাকটিস করত। প্রায় চোখে দেখা যায় নাÑ এমন দূরের গাছের ডাল কিংবা পাতাকে লক্ষ্য বানিয়েও সে নিঁখুতভাবে আঘাত করতে পারত। ছোট ছেলেরা পাথরের ঢিবি বানিয়ে তাকে চ্যালেঞ্জ দিত। তার নিশানা কখনেও ভুল হতো না।

এক দিন সকালে মানসে মজা করে বড় একটি বটপাতায় পাথর ছুড়তে লাগল। ছুড়তে ছুড়তে পাতাটিতে অনেকগুলো ছোট ছোট ছিদ্র হয়ে গেল। দেখা গেল, ছিদ্রগুলো মিলে যেন একটি ছেলের আকার ফুটে উঠেছে। সূর্যের আলো সেই ছিদ্র দিয়ে মাটিতে পড়তে লাগল আর বাতাসে পাতাটি নড়তে থাকায় আলো-ছায়ার ছেলেটি যেন নাচতে শুরু করল।

সেদিন গ্রামের ছেলেরা অবাক হয়ে সেই অসাধারণ দৃশ্য দেখল।

তারা মানসের জন্য একটি চাকাওয়ালা গাড়ি বানাল। তারপর তাকে ঠেলে নিয়ে গেল বড় একটি বটগাছের নিচে। গাছটির অসংখ্য পাতা ঘন ছায়া তৈরি করেছিল। ফলে মানসের পক্ষে এখানে আগের চেয়েও আরও বেশি চমকপ্রদ খেলা দেখানো সম্ভব।

মানসে প্রথমে পাথর ছুড়ে একটি পাতায় হাতির আকার বানাল। তারপর আরেকটি পাতায় সে এমনভাবে ছিদ্র করল, যেন একটি বাচ্চা হাতি তার মায়ের পেছনে হাঁটছে। এভাবে কিছুক্ষণের মধ্যেই পাতায় পাতায় পুরো একটি হাতির পাল জীবন্ত হয়ে উঠল। বাতাস বইলে মনে হতো, হাতিরা যেন সত্যিই দৌড়ে আসছে।

ছেলেরা এই খেলায় এতটাই মগ্ন যে, তারা খেয়ালই করেনি, কখন একটি মিছিলের শব্দ তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। তিনি ছিলেন রাজা, কাছের একটি শহর পরিদর্শনে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ সৈন্যদের আগমনে ছেলেরা ভয় পেয়ে গেল। তারা তাড়াতাড়ি মানসের গাড়িটিকে আড়ালে নিয়ে গেল এবং নিজেরা গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল।

প্রচণ্ড গরমে বটগাছের শীতল ছায়ায় রাজা তার সৈন্যদের বিশ্রাম নেওয়ার আদেশ দিলেন। ঠিক তখনই হালকা বাতাস বইতে শুরু করল। রাজা অবাক হয়ে দেখলেনÑ মাটিতে হাতির ছবিগুলো নড়ছে, যেন তারা সত্যিই জীবন্ত!

রাজা তার রক্ষীদের ডেকে বললেন,

‘এ কেমন আশ্চর্য শিল্পকর্ম? যে এই বিস্ময় সৃষ্টি করেছেÑ তাকে খুঁজে বের করো।’

কিন্তু ছেলেরা দূর থেকে শুধু শুনতে পেল রাজার গম্ভীর নির্দেশ,

‘ওদের খুঁজে বের করো!’

এ কথা শুনে ভয়ে কাঁপতে লাগল ওরা। মানসেকে ফেলে যে যার মতো দৌড়ে পালিয়ে গেল। 

কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সৈন্যরা মানসেকে খুঁজে পেল। কাঁপতে কাঁপতে তাকে রাজার সামনে আনা হলো। যদিও লাওসের সবাই জানত, রাজা একজন ন্যায়পরায়ণ ও ভালো শাসক। তিনি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে চুক্তি করে দেশে শান্তি এনেছিলেন। তবুও রাজাকে সামনে দেখলে যে কারও ভয় লাগতেই পারে।

রাজা মাটির ছবিগুলোর দিকে আঙুল তুলে গম্ভীর স্বরে বললেন, 

‘এ কাজ কে করেছে?’

মানসে ভয়ে ফিসফিস করে বলল,

‘আমি করেছি।’

রাজা চিবুকে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, ‘তাই নাকি? প্রমাণ দিতে পারবে?’

তিনি সৈন্যদের কিছু পাথর জোগাড় করতে বললেন। তারপর আদেশ দিলেন, ‘এখন, আরেকটি ছবি বানাও।’

ঠিক তখনই একটি ছোট্ট গানের পাখি এসে নিচু ডালটিতে বসল। সেটিকে দেখে মানসের মাথায় একটি বুদ্ধি এলো। সে একটি বাঁকানো বটপাতায় পাথর ছুড়ে গোল গোল ছিদ্র করল। অল্প সময়ের মধ্যেই পাতাটিতে একটি পাখির সুন্দর আকার ফুটে উঠল। 

পাখিটির শরীর সে বাঁকানো পাতার এক পাশে আর মাথাটি অন্য পাশে এমনভাবে তৈরি করল, যাতে সেটি একটু নড়াচড়া করছে বলে মনে হয়। 

যখন বাতাস বইতে শুরু করল, মাটিতে পড়া আলোর পাখিটি এমনভাবে নড়তে লাগল যে মনে হলোÑ সেটি যেন সত্যিই গান গাইছে!

রাজা হাততালি দিয়ে হো হো করে হেসে উঠলেন। সঙ্গে সঙ্গে তার সৈন্যরাও হাসতে শুরু করল।

রাজা বললেন, ‘বৎস, তোমার অসাধারণ প্রতিভা!’

কিছুক্ষণ ভেবে তিনি আবার বললেন, ‘তুমি আমার কী কাজে লাগতে পার, সেটা আমি বুঝে গেছি।’

তিনি সৈন্যদের আদেশ দিলেন মানসেকে একটি হাতির পিঠে তুলে দিতে। রাজকীয় শোভাযাত্রায় চুপচাপ বসে মানসে কিছুই বুঝতে পারছিল না, তাকে কোথায় বা কেন নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

বেশ কয়েক দিন ভ্রমণের পর লাওসের রাজধানীতে পৌঁছাল। বিশাল বিশাল ভবনগুলো শহর জুড়ে ঝলমল করছিল। শহরটি ছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গর্ব। আর তার মাঝখানে রাজার প্রাসাদটি পুরো ভূখণ্ডের ওপর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, যেন সবার ওপরে রাজত্ব করছে।

প্রাসাদে পৌঁছে রাজা তার কর্মচারীদের আদেশ দিলেন মানসেকে গোসল করিয়ে সুন্দর জামা-কাপড় পরিয়ে দিতে।

সবকিছু শেষ হলে রাজা মানসেকে কাছে ডেকে বললেন,

‘শোনো বৎস, এখন তোমার জন্য আমার একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে। খুব শিগগিরই আমি আমার উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠক করব। তাদের মধ্যে একজনকে আমি খুব পছন্দ করি, কিন্তু সে অতিরিক্ত কথা বলে। অন্যদের সে কোনো কথা বলার সুযোগই দেয় না। তাই তাকে একটু সরানো দরকার, যাতে আমি অন্যদের কথা মন দিয়ে শুনতে পারি।’

রাজা একটু ঝুঁকে নিচু স্বরে বললেন, ‘আমি আমার সিংহাসনের পেছনে একটি পর্দা টাঙানোর ব্যবস্থা করব। তুমি সেই পর্দার আড়ালে বসবে। মনে রেখো, পর্দায় একটি ছোট ছিদ্র থাকবে। আমি যে উপদেষ্টার কথা বলেছি, সে তোমার ঠিক সামনেই বসবে। তাকে তুমি ছিদ্র দিয়ে দেখতে পাবে।’

তিনি আরও বললেন, ‘তাকে প্রথমে দশ সেকেন্ড কথা বলতে দেবে। তারপর তুমি সেই ছিদ্র দিয়ে কাদার ছোট্ট গোলা ছুড়ে সরাসরি তার মুখে ফেলবে। এরপর যখনই সে কথা বলতে চাইবে, তুমি একই কাজ করবে।’

এরপর মানসেকে পর্দার পেছনে একটি চেয়ারে বসানো হলো। তার হাতে দেওয়া হলো কাদার ছোট ছোট গোলাভর্তি একটি ঝুড়ি। মানসে চুপচাপ বসে রইল। তার মনে একটু ভয় আবার একটু উত্তেজনাও কাজ করছিল।

রাজা যখন উপদেষ্টাদের সামনে একটি প্রশ্ন তুললেন, তখন সেই উপদেষ্টা সুযোগ পেয়ে কথা বলতে শুরু করল। ঠিক দশ সেকেন্ডের মাথায় ‘ঠাস!’ করে একটি কাদার গোলা উড়ে এসে তার মুখের ভেতর পড়ল!

সে সঙ্গে সঙ্গে মুখ বন্ধ করে ফেলল। কী পড়ল বুঝতে না পেরে বিরক্ত মুখে সেটি গিলে ফেলল।

কিছুক্ষণ পর মুখে ও গলার বিরক্তিকর স্বাদটি কমতেই সে আবার কথা বলতে শুরু করল। কিন্তু এবারও ঠিক দশ সেকেন্ডের মাথায় ‘ঠাস!’ আবারও বিদঘুটে স্বাদের জিনিসটি উড়ে এসে তার মুখে ঢুকে গেল।

সে একেবারে হতভম্ব। মনে মনে ভাবল, ‘এটা কি কোনো পোকা নাকি?’ 

তবু কিছু বলার উপায় ছিল না। লজ্জায় কাউকে বুঝতে না দিয়ে চুপচাপ সেই জঘন্য জিনিসটি গিলে ফেলতে হলো।

এভাবেই পুরো সভা চলতে লাগল। উপদেষ্টা বারবার থেমে যাচ্ছিল আর মানসে নিখুঁতভাবে তার কাজ করে যাচ্ছিল।

সভা শেষে রাজা সেই উপদেষ্টার কাঁধে হাত রেখে মুচকি হেসে বললেন, ‘আমার বন্ধু, এবার তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছ অন্যদের কথা বলার সুযোগ দেওয়া কতটা জরুরি! এজন্য আমি তোমার ওপর খুব খুশি হয়েছি।’

উপদেষ্টা তোতলাতে তোতলাতে বলল, ‘না... মানে... আমি... আসলে... ’

রাজা হেসে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আসলে কী?’

উপদেষ্টা লজ্জায় মাথা নিচু করে বললেন, ‘ওহ, কিছু না... মানে... হ্যাঁ, আমি সব সময়ই কথা বলতে থাকি... আসলে সে ইহল জ্ঞানী, যে অন্যদের কথা শোনে।’

রাজা খুশি হয়ে বললেন, ‘এইতো, ভালো মানুষ!’

সেই দিন থেকে উপদেষ্টা আর কখনও অতিরিক্ত কথা বলত না। রাজার সভাগুলোও অনেক সুন্দরভাবে চলতে লাগল। 

আর মানসে? তাকে রাজা যত দিন ইচ্ছে রাজপ্রাসাদে থাকার জন্য আমন্ত্রণ জানালেন। তার আর কখনও খাবার বা আশ্রয়ের অভাব হলো না। তার অসাধারণ প্রতিভা দেখতে প্রতিদিনই নতুন নতুন মানুষ আসতে লাগল।


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা