মেহেদী হাসান শিয়াম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ
প্রকাশ : ২৯ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:১৯ পিএম
প্লাস্টিকের ভিড়ে নিশ্চুপ খেলনাগ্রাম
মেলা মানেই এক সময় ছিল রঙিন কাগজের ফিরকি আর বাঁশের কাঠি দিয়ে বানানো টমটম গাড়ির শব্দ। আশি-নব্বই দশকের শিশুদের কাছে মেলা যাওয়ার প্রধান আকর্ষণই ছিল মাটির চাকা আর বাঁশের কাঠিতে তৈরি এসব আনন্দদায়ক খেলনা। তবে কালের বিবর্তনে এবং আধুনিক প্লাস্টিকের খেলনার জোয়ারে সেই গ্রামীণ ঐতিহ্য আজ বিলুপ্তির পথে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার বারঘরিয়া-বাদুরতলা গ্রামের নিভৃত পল্লিতে এখনও গুটিকতক কারিগর পৈতৃক সূত্রে পাওয়া এই শিল্পকে আঁকড়ে ধরে জীবনের ঘানি টানছেন। প্লাস্টিকের ভিড়ে কদর কমলেও হারানো সেই ঐতিহ্যের শেষ সলতেটুকু জ্বালিয়ে রাখতে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন তারা।
এক সময় বাদুরতলা গ্রামটি পরিচিত ছিল খেলনা তৈরির কারিগরদের গ্রাম হিসেবে। আশির দশকেও এখানে অন্তত ৫০ থেকে ৬০ জন কারিগর ছিল। তাদের হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় প্রাণ পেত টমটম, ফিরকি আর ঠেলাগাড়ির মতো নানা গ্রামীণ খেলনা। কিন্তু বর্তমান সময়ে আধুনিকতার ছোঁয়ায় শিশুদের পছন্দের তালিকায় এসেছে আমূল পরিবর্তন। ঝকঝকে প্লাস্টিকের খেলনার দাপটে বাঁশ আর কাগজ দিয়ে তৈরি এসব দেশি শিল্পের কদর কমেছে বহুগুণে। ফলে জীবিকার তাগিদে অনেকেই এই পেশা ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন, কেউবা জড়িয়ে পড়েছেন নির্মাণ শ্রমিকের কাজে।
বর্তমানে মাত্র ৫ থেকে ৭ জন কারিগর কোনোমতে এই পেশাকে টিকিয়ে রেখেছেন। খেলনা কারিগরদের ভাষ্যমতে, এ পেশা থেকে হয়তো বড় কোনো অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আসে না, তবে দুবেলা ডাল-ভাত খেয়ে বাপ-দাদার স্মৃতিটুকু বাঁচিয়ে রাখাটাই তাদের কাছে পরম তৃপ্তির। এসব কারিগরদের দেওয়া পরিসংখ্যান বলছে, এক সময় এই গ্রামের খেলনা বিক্রির বার্ষিক বাজার ২০-২৫ লাখ টাকায় পৌঁছালেও এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫ থেকে ৮ লাখে।
সরেজমিন বারঘরিয়া-বাদুরতলা গ্রামটিতে গেলে এখনও চোখে পড়ে ঐতিহ্যের সেই লড়াই। গ্রামের মোড়েই দেখা মেলে দিলিপ সিংহের মতো অভিজ্ঞ কারিগরের। বাঁশের কাঠি আর মাটির চাকা দিয়ে তিনি অত্যন্ত যত্নসহকারে বানাচ্ছেন সেই চিরচেনা টমটম গাড়ি। প্রায় ৩৫ বছর ধরে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত দিলিপ সিংহ জানান, তার বাবা ও দাদাও এই কাজই করতেন। পৈতৃক সূত্রে পাওয়া এই শৈল্পিক জ্ঞান দিয়েই তিনি আজও সংসারের হাল ধরে আছেন। তবে আগের মতো আর সেই জমজমাট দিন নেই। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘৫০০ টাকার প্লাস্টিকের বাহারি খেলনার ভিড়ে ১০-২০ টাকার এসব মাটির খেলনা এখন অনেক শিশুর কাছেই অচেনা। অথচ ৮০-৯০ দশকের শিশুদের কাছে এসব ছিল আবেগের খেলনা।’
এ বছর পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে এই কারিগরদের পাড়ায় ছিল বেশ কর্মব্যস্ততা। উৎসবের মৌসুমে এসব খেলনার চাহিদা কিছুটা বাড়ে। দিলিপ সিংহ এবার ১০০০ পিস ভটভটি গাড়ি তৈরির অর্ডার পেয়েছিলেন, যা যশোরের মেলায় পাইকারি দরে সরবরাহ করেছেন। বর্তমানে পাইকারি দরে ১০০ পিস খেলনা ১০০০ টাকায় এবং খুচরা বাজারে প্রতিটি ভটভটি মাত্র ২০ টাকায় বিক্রি হয়।
আশির দশক থেকে এই পেশায় যুক্ত শ্রী শংকর চন্দ্র সিংহও। দীর্ঘদিন ব্যবসার সুবাদে বিভিন্ন জেলার হাটঘাটে ঘুরে বেড়িয়েছেন তিনি। পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে এই কারিগরের বাড়িতেও ছিল কর্মব্যস্ততা। তার বাড়িতে খেলনা তৈরির কাজে পুরুষদের পাশাপাশি নারী সদস্যরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে খেলনা তৈরির কাজে অংশ নিয়েছেন। শংকর চন্দ্র বলেন, দুই ঈদ, পূজা আর গ্রামীণ মেলাগুলোই এসব গ্রামীণ খেলনা বেশি বিক্রি হয়।
-69f1b0db9d30b.jpg)
স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মীদের মতে, আধুনিকতার দাপটে টমটম কিংবা ফিরকির মতো খেলনাগুলো আজ কেবলই স্মৃতি। সরকারি বা বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে টিকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। প্লাস্টিকের খেলনা কেবল ঐতিহ্যেরই ক্ষতি করছে না বরং পরিবেশের ভারসাম্যের জন্যও তা হুমকিস্বরূপ। সাংস্কৃতিক কর্মী ফায়জার রহমান মানি মনে করেন, স্থানীয় প্রশাসনের আয়োজনে বিভিন্ন জাতীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে যদি এসব কারিগরদের আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং মেলায় তাদের জন্য বিশেষ স্থানের ব্যবস্থা করা হয়, তবে সাধারণ মানুষের মাঝে পুনরায় এসব খেলনার আবেদন ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হবে। এতে যেমন দেশীয় লোকসংস্কৃতি রক্ষা পাবে, তেমনই কারিগররাও সম্মানের সঙ্গে তাদের জীবন অতিবাহিত করতে পারবেন।
এ বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কালচারাল অফিসার মো. শাহদাৎ হোসেন বলেন, গ্রামীণ খেলনা তৈরির কারিগরদের গ্রামটি সম্পর্কে আমার জানা ছিল না। এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে হবে। গ্রামটি সরেজমিনে পরিদর্শন করে জেলা প্রশাসকসহ আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবগত করা হবে। আশা করছি, এর মাধ্যমে খেলনা তৈরির কারিগরদের সুদিন ফিরে আসবে।
বাদুরতলার এই নিভৃত কারিগরদের হাত ধরে আমাদের শৈশবের সেই রঙিন দিনগুলো চিরস্থায়ী হোক, এমনটাই এখন সচেতন মহলের প্রত্যাশা।