দক্ষিণ আফ্রিকার লোকগল্প
রূপান্তর : নিজাম বিশ্বাস
প্রকাশ : ২৩ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:০৫ পিএম
অলংকরণ : নিঝুম নিসর্গ, সপ্তম শ্রেণি, রোজডেল ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, খুলনা
অনেক উঁচু এক পাহাড়। সেই পাহাড়ের কোলঘেঁষে ছোট গ্রাম। সেই গ্রামে এক লোক বাস করত। তার ছিল দুটি মেয়ে। বড় মেয়ের নাম কাজি। আর ছোট মেয়ের নাম জানিয়ানি।
কাজি দেখতে ছিল খুব সুন্দর। কিন্তু সে ছিল রাগী, স্বার্থপর আর অলস মেয়ে। বাবা ও ছোট বোনের সঙ্গে সে সবসময় ঝগড়া করত। ঘরের কোনো কাজই করতে চাইত না। জ্বালানি কাঠ আনা, পানি তোলা, ঘরের ছাউনি বানানো এরকম সব কাজই করতে হতো ছোট বোন জানিয়ানিকে। এমনকি রান্না করতে গেলেও কাজি রুটি পুড়িয়ে ফেলত।
তাই বড় মেয়ে কাজির ওপর তার বাবা খুব বিরক্ত ছিল। সে ভাবল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মেয়ের বিয়ে দিতে হবে। তাহলে ছোট মেয়েটিও একটু শান্তিতে থাকতে পারবে।
লোকটি একদিন পাশের এক গ্রামে গেল। কাজ সেরে সেই গ্রামের বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতে বসল। গ্রামের বন্ধুরা তাকে নানা রকম খবর জানাল। এবার তাদের ফসল নষ্ট হয়েছে। কবে কোন বুনো প্রাণী এসেছে। তবে একটি খবর শুনে লোকটি নড়েচড়ে বসলÑ ওই গ্রামের প্রধান নাকি বিয়ে করবেন। আর তাই কনে খুঁজে বেড়াচ্ছেন। তবে সেই প্রধানকে কেউ কখনও দেখেনি। লোকেরা শুনেছে সেই গ্রামপ্রধানের নাকি পাঁচটি মাথা। আর দেখতেই নাকি খুব ভয়ংকর। এই কথা শুনে কাজির বাবা মনে মনে ভাবলেন, তার জেদি মেয়ে কাজিই এমন একজনের জন্য উপযুক্ত।
বাড়ি ফিরে তিনি মেয়েদের জিজ্ঞেস করলেন,
‘তোমাদের মধ্যে কে পাশের গ্রামের প্রধানকে বিয়ে করতে চাও?’
কাজি সঙ্গে সঙ্গেই বলল, ‘আমি। আমি বিয়ে করব।’
ছোট বোন জানিয়ানিকে কিছু বলারই সুযোগ দিল না। তার বাবা তো এটাই চাচ্ছিল। দুষ্ট, রাগী মেয়েটাকে বিয়ে দিতে পারলেই সে বাঁচে। বাবা পরদিন মেয়েকে নিয়ে সেই গ্রামে যাবে বলে ঠিক করল। কিন্তু কাজি বাবার সঙ্গে যাবে না। সে একাই যাবে।
তাই পরদিন সকালে কাজি ইচ্ছামতো সাজুগুজু করল। তারপর পাশের গ্রামের দিকে হাঁটা শুরু করল। পথে এক ছোট ইঁদুর তাকে পথ দেখানোর প্রস্তাব দিল। কিন্তু কাজি তাকে তাড়িয়ে দিল। একটু পরে এক বুড়ি তাকে সতর্ক করে বলল, ‘সামনে বন। সেই বনে গেলে গাছেরা তোমাকে দেখে হাসবে। কিন্তু তুমি তাদের দিকে তাকাবে না। ভুলেও হাসবে না। আর পথে কোনো পানি খাবে না।’
বুড়ির এসব কথা শুনে কাজি হেসেই উড়িয়ে দিল। তারপর নাচতে নাচতে বনের পথে হেঁটে গেল।
বনের ভেতরে একটু ঢুকতে না ঢুকতেই ঢুকে কাজি সত্যিই অদ্ভুত হাসির শব্দ শুনতে পেল। গাছগুলো যেন তাকে নিয়ে হাসছে! রাগে সে নিজেও হাসতে শুরু করল। সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে অন্ধকার আর বজ্রপাত শুরু হয়ে গেল। ভয়ে সে দৌড়াতে শুরু করল। বন থেকে বের হওয়ার সময় এক অদ্ভুত লোকের সঙ্গে তার দেখা হলো। লোকটি তার মাথা বগলে নিয়ে হাঁটছিল। কাজিকে সে পানি পান করতে দিল। বুড়ির বারণ না শুনে কাজি সেই পানি পান করল।
অবশেষে পাশের গ্রামে এসে কাজি পৌঁছাল। এদিকে রাতও নেমে গেছে। কাজি রান্না করতে বসল। কিন্তু এমনই পচা রান্না যে, কোনোটাই মুখে তোলা গেল না।
রাতে হঠাৎ ঝড় উঠল। হঠাৎ কাজি দেখল তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে পাঁচ মাথার এক বিশাল সাপ! এই সাপই সেই গ্রামের প্রধান। সে কিছু খেতে চাইল। কিন্তু পোড়া খাবার দেখে রেগে গিয়ে কাজিকে মেরে ফেলল।
এক বছর পরে গ্রামপ্রধান আবার বিয়ে করতে চাইল। এবার কাজির ছোট বোন জানিয়ানিকে প্রস্তাব দেওয়া হলো। সে বিনয়ের সঙ্গে রাজি হলো। বাবা তাকে কিছুটা পথ এগিয়ে দিয়ে এলো।
পথে সেই ইঁদুর আবার এলো জানিয়ানিকে পথ দেখাবে বলে। জানিয়ানি ইঁদুরের দেখানো পথ ধরে হাঁটতে শুরু করল। এবারও পথে সেই বুড়ির সঙ্গে দেখা হলো। বুড়ি যা কিছু বলল জানিয়ানি চুপ করে সব শুনল। পথে সেও দেখল গাছেরা হাসছে। কিন্তু জানিয়ানি কোনো গাছের দিকে তাকাল না। একটুও হাসল না। তারপর সেই অদ্ভুত লোকটি পানি করতে দিল। কিন্তু সে তার পানি পান করল না।
অবশেষ জানিয়ানি পাশের গ্রামে পৌঁছাল। তারপর সে মনোযোগ দিয়ে রান্না করল। খাবারের গন্ধে চারপাশ ম-ম করছিল। রাতে আবার সেই পাঁচ মাথার সাপ এলো। সে খাবার খেয়ে খুশি হলো। তারপর জানিয়ানির দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে তার ভয়ংকর রূপ বদলে গেল। সে এক সুদর্শন যুবকে পরিণত হলো। যুবকটি হেসে বলল,
‘তুমি আমাকে অভিশাপ থেকে মুক্ত করেছ। একজন সৎ ও পরিশ্রমী মেয়ের ভালোবাসাই আমাকে মুক্ত করতে পারত।’
মহা ধুমধাম করে তাদের বিয়ে হলো। তারপর বাকিটা জীবন তারা কাটিয়ে দিল।
[ইংরেজি থেকে অনুবাদ]