জহিরুল ইসলাম
প্রকাশ : ২৩ এপ্রিল ২০২৬ ১২:৪৫ পিএম
আপডেট : ২৩ এপ্রিল ২০২৬ ১২:৪৬ পিএম
আঁকা : মেহেরুন্নিসা, অষ্টম শ্রেণি, রানী নীহার দেবী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, মানিকছড়ি, খাগড়াছড়ি
এক বনের মাঝখানে বাস করত এক ছোট্ট পিঁপড়া। আকারে ছোট হলেও বুদ্ধিতে সে ছিল পাকা। তার মাথায় সব সময় নতুন নতুন কৌশল ঘুরে বেড়াত। কিন্তু সে কৌশলগুলো এত দুষ্টুমিতে ভরা যে বনজুড়ে তার নাম শুনলেই সবাই কেঁপে উঠত।
একদিন সকালে বনের রাজা সিংহ ঘুম থেকে উঠে দেখল তার কেশরভর্তি শুঁটকির গুঁড়া। হাঁচি দিতে দিতে সে গর্জন করে উঠল। বাঘ দেখল তার লেজে ঘাস বেঁধে রেখেছে কেউ। হাঁটতে গেলেই নিচের শুকনো ঘাসপাতার সঙ্গে লেগে সড়সড় করে শব্দ হচ্ছে। এমন শব্দ করে হাঁটলে সে যে শিকার খুঁজে পাবে না। চিতা দৌড় শুরু করতেই ধপ করে পড়ে গেল। কারণ তার গুহার সামনে পিঁপড়া রেখে গেছে পিছল তেল।
হরিণের ঘাড়ে বাঁধা ছোট ঘণ্টা টুংটাং বাজতে থাকে। এতে সে আর নীরবে চলতে পারে না। আর শেয়ালের লেজে লিপস্টিক লাগিয়ে দেওয়া হয়েছেÑ যা দেখে পুরো বন হেসে খুন! খরগোশের খাবার গাজরের মধ্যে ভরে দেওয়া হয়েছে মরিচের গুঁড়ো; কামড় দিতেই সে লাফাতে লাফাতে কান্না শুরু করল।
এসব কাণ্ডের একজনই মাস্তানÑ সেই ছোট্ট পিঁপড়া। সবার সামনে ধরা না পড়লেও সবাই জানতÑ এই দুষ্টুমিগুলো তারই কাজ।
পিঁপড়ার এসব দুষ্টুমিভরা কাজে একসময় বনে আর শান্তি রইল না। শেষমেশ সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিতে এক মহাসভা বসল। সিংহ বলল, যে-ই হোক, এমন ঝামেলা আর চলবে না। ওকে শায়েস্তা করতে হবে। বনের অন্য সব প্রাণী তার কথায় সায় জানাল। কিন্তু বয়স্ক প্যাঁচা ধীরে ধীরে বলল, ওকে শায়েস্তা? ও তো আমাদের সবার চাইতে চালাক। ওর চালাকির সঙ্গে আমরা কোনোমতেই পেরে উঠব না। বরং বুদ্ধি করে ওকে আমাদের সবার নেতা বানিয়ে ফেলি। তখন তার দুষ্টুমিও আমাদের কাজে লাগবে।
সবাই প্রথমে অবাক হলেও পরক্ষণেই মনে হলোÑ কথাটা ঠিকই তো! যদি পিঁপড়া বনের রাজা হয়, দুষ্টুমি নয়, দায়িত্বই বেশি পালন করবে। আর তার যেহেতু অনেক বুদ্ধি, সেই বুদ্ধি দিয়ে বনের সব পশুপাখিকে সে শান্তিতেই রাখতে পারবে।
পরদিন সকালবেলা পিঁপড়া নিজের বাসার বাইরে বের হয়েই দেখেÑ সিংহ, বাঘ, চিতা, হরিণ, শিয়াল, খরগোশ সবাই নত হয়ে তাকে সালাম করছে।
পিঁপড়া তো হতভম্ব।
সিংহ গম্ভীর গলায় ঘোষণা করল, মহামান্য পিঁপড়া! আজ থেকে বনের নতুন রাজা তুমি। তোমার বুদ্ধি আমাদের সবার চাইতে বেশি। এখন থেকে তুমি যেভাবে বলবে আমরা সেভাবেই চলব।
পিঁপড়া তো রাজা হতে চায়নি, কিন্তু সে শুনেছে মানুষের মাঝে রাজা হওয়ার জন্য কত প্রতিযোগিতা চলে। চলে কত যুদ্ধ। একবার কেউ রাজা হতে পারলে আর সিংহাসন ছাড়তে চায় না। তাই সে রাজি হয়ে গেল।
রাজা হয়েই দুষ্টুমি বাদ দিয়ে সে নতুন নিয়ম বানালÑ বনে কেউ কাউকে ভয় দেখাবে না। সবাই মিলেমিশে খাবার ভাগ করে খাবে। ছোট-বড় সবাইকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
বনের সব প্রাণী খুশি হয়ে উঠল। পিঁপড়ার মাথার দুষ্টুমি বদলে গেল বুদ্ধিতে। সে পুরো বনকে সাজিয়ে রাখল ঠিকঠাক নিয়মে। কেউ আর কাউকে আঘাত করে না, ঝগড়া করে না, খাবার নিয়ে মারামারি করে না।
এভাবে সেই ক্ষুদ্র পিঁপড়া বনের সবচেয়ে বড় জায়গা, সব প্রাণীর হৃদয়ে রাজত্ব করতে লাগল।
আর বন?
বন আবার হয়ে উঠল হাসিখুশি, শান্ত আর নিরাপদ।
সেই থেকে সবাই বলেÑ রাজা বড় না, বুদ্ধি বড়।