লাবিবা ইরম
প্রকাশ : ২১ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:৩৭ পিএম
রোদের তীব্রতা বাড়ছেই। সুস্থ থাকতে হলে মেনে চলতে হবে কিছু নিয়ম মডেল : শৈলী মাহবুব, ছবি : প্লাবন আমিন
ঋতু পরিবর্তনের পালায় আবারও চলে এসেছে গরমকাল। সাধারণত আমাদের দেশে চৈত্র মাস থেকেই গরম পড়া শুরু হয়। গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর কারণে এখন গরমের প্রভাবটা আরও বেশি সময়জুড়ে থাকে। আবহাওয়াবিদদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসে বেশ কয়েকটি হিট ওয়েভ আসতে যাচ্ছে। হঠাৎ করেই এমন কড়া গরম আবহাওয়ায় আমাদের মানিয়ে নিতে যেমন কষ্ট হয়, তেমনি বেড়ে যায় স্বাস্থ্যঝুঁকি। তাই এই গরমে আমাদের খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে পোশাক-আশাক অর্থাৎ পুরো ডেইলি রুটিনেই পরিবর্তন আনতে হয়। সবদিকেই একটু বাড়তি খেয়ালের প্রয়োজন পড়ে। আজ আমরা এই গরমে একটু স্বস্তির জন্য কী কী করা যেতে পারে, তা নিয়ে জানব।
দিন শুরু করুন ভোরে
সাধারণত ভোরের দিকে তাপ কম থাকে, আবহাওয়া তুলনামূলকভাবে ঠান্ডা থাকে। তাই ভোরের দিকে উঠে হালকা ব্যায়াম, হাঁটাহাঁটি এবং অন্যান্য কাজ সেরে রাখতে পারেন। এতে গরমের জন্য কষ্ট কম হবে। তা ছাড়া তীব্র গরমে কাজের প্রডাক্টিভিটিও কমে যায়। তাই সকাল সকাল কাজ সেরে ফেলতে পারলে কাজও ভালোভাবে শেষ করা যায়। যাদের নিয়মিত অফিসে যেতে হয় তারা সকালে বের হওয়ার আগে গোসল করে ফেলুন। পর্যাপ্ত পানি পান করুন। চেষ্টা করুন সূর্যের আলোর উত্তাপ ছড়ানোর আগেই অফিসে পৌঁছে যেতে।
তীব্র গরমে বের হওয়া এড়িয়ে চলুন
সাধারণত দুপুর ১২টার পর থেকে গরমের তীব্রতা বাড়তে থাকে। এই তীব্রতা বিকাল ৩-৪টা পর্যন্ত থাকে। তাই এই সময়গুলোতে বাইরে বের হওয়া থেকে যতটা নিজেকে রক্ষা করা যায় ততই ভালো। এই তীব্রতার সময়গুলোতেই হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যায়। বাইরের জরুরি কাজ সকালে এবং বিকালে করে ফেললে ভালো হয়। দুপুরের তীব্র গরম এড়িয়ে চলা সম্ভব না হলেও অন্তত এই সময়টায় অপ্রয়োজনীয় কাজ কমিয়ে দিন। বাইরে বের হলে সঙ্গে অবশ্যই পর্যাপ্ত পানি, ক্যাপ, সানগ্লাস, স্যালাইন ইত্যাদি নিয়ে নিতে হবে। অফিসে লাঞ্চের পর ১০-১৫ মিনিট চুপচাপ বসে থাকলেও শরীর একটু রিল্যাক্স হয়।

শুধু পানি নয়, পানিজাতীয় খাবার বেশি বেশি খান
গরম এলে পানি খেতে হবে বেশি- এটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু গরমে ঘামে আমাদের শরীর থেকে পানির সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে যায় লবণও। তাই মাঝেমধ্যেই লবণ, পানি, চিনি ও লেবুর শরবত খাওয়া ভালো। এ ছাড়া পানি আছে বেশি এমন ফল, লবণের ঘাটতি কমায় এমন খাবারও খাওয়া উচিত। ডাবের পানি, লেবুর শরবত, ঘোল এগুলো শরীরকে ভেতর থেকে ঠান্ডা রাখে। তরমুজ, বাঙ্গি, শসার মতো ফল শরীরে পানির ঘাটতি পূরণ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, গরমে হাইড্রেশন ঠিক না থাকলে দ্রুত দুর্বলতা, মাথা ঘোরা এমনকি গুরুতর সমস্যা দেখা দিতে পারে।
পোশাকে স্টাইলের সঙ্গে থাকুক স্বস্তি
গরমে পোশাকের ক্ষেত্রে শুধু স্টাইল না তার সঙ্গে স্বস্তির ব্যাপারটাও খুব জোরালোভাবে ভেবে দেখা উচিত। প্রচণ্ড গরমে স্বস্তি পেতে সুতির কাপড় সবচেয়ে ভালো। এ ছাড়া লিলেন বা ভিসকসের পোশাকও ব্যবহার করতে পারেন। সিল্ক, ভেলভেট, জর্জেট, পলিয়েস্টার, নাইলন- এসবের পোশাক না পরাই ভালো। ঢিলেঢালা পোশাক এ সময় সবচেয়ে আরাম দেয়। টাইট পোশাক পরলে গরমের মাঝে আরও বেশি অস্বস্তি হয়। এ ছাড়া রঙের ক্ষেত্রে হালকা রঙের জামাকাপড় বেছে নিন। কালো বা গাঢ় রঙের জামাকাপড়ে আরও বেশি গরম অনুভূত হয়।
ডায়েটে রাখুন হালকা খাবার
গরমের মাঝে খাবার কী খাচ্ছেন, তা আপনাকে অনেকটাই ফ্রেশ রাখতে সাহায্য করে। শুধু পানি নয়, প্রতিদিনের খাবারে যোগ করুন পানি-সমৃদ্ধ ফল যেমনÑ তরমুজ, বাঙ্গি, শসা, আনারস ইত্যাদি। সাধারণত এই ফলগুলোতে পানির পরিমাণ অনেক বেশি থাকে, তাই এগুলো খেলে শরীর ঠান্ডা থাকে এবং ডিহাইড্রেশন কম হয়। বিশেষ করে দুপুরের দিকে এগুলো খেলে খুব সতেজ লাগে। এ ছাড়া নিয়মিত খাবারে অনেক বেশি মসলাযুক্ত খাবার, মাংস, অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলাই ভালো। তার বদলে হালকা মসলায় রান্না মাছ, বিভিন্ন শাকসবজি, লাউ, পুঁইশাক, ঝিঙে ইত্যাদি রাখতে পারেন খাদ্যতালিকায়। টক দই, শসা, দইয়ের সালাদ, পুদিনাপাতা, ভেজানো চিড়াÑ এগুলো স্ন্যাক্স বা খাবারের রেসিপিতে যোগ করলে গরমের হাত থেকে শরীরকে রক্ষা করতে সাহায্য করবে। ডিহাইড্রেশনের ঝুঁকি কমাতে অতিরিক্ত চা-কফি এড়িয়ে চলাই ভালো।
নিয়মিত পানি পান করা, সানস্ক্রিন লাগানো, ফেইস মিস্ট বা গোলাপ জল ব্যবহারে গরমে ত্বক আরাম পায়।ত্বকের যত্নে নজর দিন
আবহাওয়া বদলের সঙ্গে সঙ্গে স্কিনকেয়ার রুটিনও বদলাতে হয়। গরমে স্কিনের সেনসিটিভিটি বেড়ে যায়। ফলে জ্বালাপোড়া, লালচে ভাব, ব্রণসহ নানা রকম সমস্যা দেখা দেয়। এসব থেকে বাঁচতে তাই নিয়মিত সানস্ক্রিন ব্যবহার করা উচিত। এ ছাড়া বাইরে গেলে সানগ্লাস, স্কার্ফ, ক্যাপ ব্যবহার করুন। বাইরে থেকে এসে ফেসওয়াশ দিয়ে মুখ ক্লিন করে ফেলতে হবে। এ ছাড়া দিনে কয়েকবার পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে ফেললে ঘাম জমে ব্রণ বা র্যাশ হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। অ্যালোভেরা জেল, গোলাপজল, বরফ ইত্যাদি ব্যবহার করলে স্কিন ঠান্ডা থাকে। মেকআপ প্রডাক্টস ব্যবহারের ক্ষেত্রে ওয়াটার বেইজড প্রডাক্ট হলে ভালো হয়। এ ছাড়া হালকা ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা ভালো। দীর্ঘক্ষণ মেকআপ প্রডাক্ট ব্যবহার করলে অবশ্যই খুব ভালোভাবে এগুলো তুলে ফেলতে হবে।
অফিসের রুটিনে অ্যাডজাস্ট করবেন যেভাবে
যারা চাকরি করেন, নিয়মিত অফিসে যেতে হয়, তাদের জন্য গরমকাল বেশ কষ্টদায়ক। তাই একটি হেলদি রুটিন মেনে চললে অনেকটাই সুস্থ থাকা সম্ভব। অফিসে যাওয়ার ক্ষেত্রে সূর্যের তাপ বেশি হওয়ার আগেই বের হওয়ার চেষ্টা করুন। ব্যাগে সব সময় পানি, ছাতা, সানস্ক্রিন, ডিওডরেন্ট রাখুন। বের হওয়ার আগে অবশ্যই পানি পান করুন। এ ছাড়া অফিসে কাজের ফাঁকে ফাঁকে অল্প অল্প পানি পান করতে ভুলবেন না। যদি সম্ভব হয় মাঝেমধ্যে মুখ ও পা ধুয়ে নিতে পারেন পানি দিয়ে। দুপুরে লাঞ্চের পর খানিকটা বিশ্রাম নিন, পাওয়ার ন্যাপও বেশ ভালো কাজ করে। ফেরার সময় চেষ্টা করুন রোদের তাপ কমে এলে বের হতে।
ঘর বানান আরামদায়ক
গরমে ঘরের পরিবেশও আরামদায়ক না হলে সেটি হতে পারে অত্যন্ত অস্বস্তিকর। বদ্ধপরিবেশ গরমের দিনে আরও বেশি অস্বস্তির সৃষ্টি করে। তাই গরম বেশি আসার আগেই বাসার অপ্রয়োজনীয় জিনিস সরিয়ে ফেলুন। যতটা সম্ভব বাসা ফাঁকা করুন যেন বাতাস চলাচলে কোনো সমস্যা না হয়। জানালায় হালকা রঙের পাতলা পর্দা ব্যবহার করুন। এতে আলো-বাতাস আসতে সুবিধা হবে। চাইলে কিছু ইন্ডোর প্ল্যান্ট লাগিয়ে ফেলতে পারেন।
গাছ ঘর ঠান্ডা করতে সাহায্য করে। বিছানার চাদরের ক্ষেত্রে সুতি কাপড়ের ব্যবহার করতে পারেন। একই চাদর খুব বেশি দিন ব্যবহার না করা ভালো। কার্পেট বা পাপোশ বেশি ভারী ব্যবহার করবেন না। ঘরের এক কোণে বড় গামলা বা পাত্রে পানি দিয়ে রাখতে পারেন। চাইলে ওপরে কিছু ফুল দিয়ে সাজিয়ে দিতে পারেন। এটি ঘরের সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি গরম কমাতে সাহায্য করবে। ঘরের মাঝে ভাজা কাপড় রাখলেও সেটা গরম কমাতে সাহায্য করে।
বৃদ্ধ ও শিশুদের ক্ষেত্রে যেসব খেয়াল রাখা জরুরি
গরমে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায় শিশু ও বৃদ্ধরা। তাই তাদের ক্ষেত্রে কিছু জিনিস খেয়াল রাখা জরুরি।
শিশুদের ক্ষেত্রে-
* বারবার পানি বা তরল খাবার দেওয়া
* হালকা ও আরামদায়ক পোশাক পরানো
* সরাসরি রোদ থেকে দূরে রাখা
* শিশুর ঘাম মানেই সে কমফোর্টেবল না, তাই সেভাবে পোশাক পরান এবং ঘরের তাপমাত্রা সহনীয় রাখুন
* অতিরিক্ত ঠান্ডাও ক্ষতিকর হতে পারে
* ঘুমের সময় তাপমাত্রা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
শিশুরা অনেক সময় নিজেরা তৃষ্ণা বোঝাতে পারে না। তাই নির্দিষ্ট সময় পরপর পানি, দুধ বা তরল খাবার দেওয়া উচিত। খুব টাইট বা মোটা কাপড় পরালে তারা দ্রুত অস্বস্তিতে পড়ে যায়, তাই সুতির ঢিলেঢালা কাপড়ই সবচেয়ে ভালো। অনেক সময় আমরা ভাবি, বাচ্চা ঘামছে মানেই স্বাভাবিক গরম। কিন্তু আসলে শিশুদের শরীর দ্রুত গরম হয়ে যায়, আর তারা বড়দের মতো তা সামলাতে পারে না। আবার বেশি হান্ডার বাচ্চাদের জন্য ক্ষতিকর তাই ফ্যান বা এসি একদম জোরে না দিয়ে, সরাসরি বাতাস এড়িয়ে ঘরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখা ভালো। নাহলে ঠান্ডা লেগে যেতে পারে। ঘুমের সময় শিশুরা বেশি হিট সেনসিটিভ থাকে। তাই মাঝেমধ্যে পিঠ বা ঘাড়ে হাত দিয়ে দেখুন, গরম লাগলে কাপড় বা বিছানা হালকা করে দিন।
বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে-
বয়স্ক মানুষদের একটা বড় সমস্যা হলো, তারা অনেক সময় বুঝতেই পারেন না যে তাদের শরীর পানিশূন্য হয়ে যাচ্ছে। তাই ‘পানি খেয়েছেন?’ জিজ্ঞেস করাটা অনেক সময় যথেষ্ট না, খেয়াল রাখতে হবে তারা আসলেই কতটা পানি খাচ্ছেন। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, অনেক ওষুধ (যেমন ডায়াবেটিস বা প্রেসারের) শরীর থেকে পানি কমিয়ে দিতে পারে। ফলে গরমে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয়টা হলো ‘নীরব ক্লান্তি’, তারা হয়তো কিছু বলবেন না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে দুর্বল হয়ে পড়েন। তাই আচরণে পরিবর্তন, কথা কমে যাওয়া বা অস্বাভাবিক চুপচাপ হয়ে গেলে সেটাও খেয়াল করা জরুরি। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অন এজিং-এর তথ্য অনুযায়ী, বয়স্কদের ক্ষেত্রে হিট-রিলেটেড সমস্যা অনেক সময় লক্ষণ ছাড়া শুরু হয়।
শরীরের ক্লান্তিকে গুরুত্ব দিন
সেন্টারস ফর ডিজিজ অ্যান্ড প্রিভেনশন জানায়, গরমে অনেক সময় শরীর আগে থেকেই সিগন্যাল দেয়, কিন্তু আমরা সেটা উপেক্ষা করি। মাথা হালকা লাগা, অতিরিক্ত ঘাম, দুর্বলতা এসব হলে একটু খেয়াল করুন। পানি পান করুন, প্রয়োজনে স্যালাইন খেতে পারেন। খুব ঠান্ডা পানি বা বরফ খেয়ে হঠাৎ শরীর ঠান্ডা করার চেষ্টা না করে, স্বাভাবিকভাবে শরীরকে ঠান্ডা হতে দিন। গরমে হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি এড়াতে শরীরের এই ছোট সিগন্যালগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া খুব জরুরি।
কিছু বিশেষ টিপস