আফসানা মিমি
প্রকাশ : ২১ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:১৩ পিএম
বাতাস যখন শত্রু
বর্তমান সময়ে বিশ্বের অনেক বড় শহরের মতো বাংলাদেশেও বায়ুদূষণ একটি গুরুতর সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় এই সমস্যা দিন দিন আরও তীব্র হচ্ছে। যানবাহনের ধোঁয়া, ইটভাটা, শিল্পকারখানার নির্গত ধোঁয়া, নির্মাণকাজের ধুলাবালি এবং বিভিন্ন বর্জ্য পোড়ানোর ফলে বাতাসে ক্ষতিকর কণার পরিমাণ ক্রমাগত বাড়ছে। ফলে আমরা প্রতিদিন যে বাতাসে শ্বাস নিচ্ছি, সেটিই ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বায়ুদূষণের ফলে মানুষের শরীরে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে শ্বাসকষ্ট, কাশি, গলা জ্বালা, চোখে জ্বালাপোড়া, অ্যালার্জি, মাথাব্যথা এবং ক্লান্তি অন্যতম। দীর্ঘমেয়াদে এটি ফুসফুসের রোগ, হৃদরোগ এবং বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতার ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং যাদের আগে থেকেই অ্যাজমা বা শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা আছে, তারা বায়ুদূষণের ক্ষতিকর প্রভাবের প্রতি বেশি সংবেদনশীল। তাই এই দূষিত পরিবেশে নিজের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কিছু সচেতন অভ্যাস গড়ে তোলা খুবই জরুরি।
বাইরে বের হলে মাস্ক ব্যবহার করুন
বায়ুদূষণ থেকে নিজেকে রক্ষার সবচেয়ে সহজ এবং কার্যকর উপায়গুলোর একটি হলো মাস্ক ব্যবহার করা। বিশেষ করে ব্যস্ত সড়ক, যানজটপূর্ণ এলাকা বা ধুলাবালিযুক্ত জায়গায় চলাচলের সময় অবশ্যই মাস্ক পরা উচিত। সাধারণ কাপড়ের মাস্কের তুলনায় উন্নতমানের ফিল্টারযুক্ত মাস্ক ব্যবহার করলে বাতাসে থাকা সূক্ষ্ম ধুলা ও ক্ষতিকর কণার অনেকটাই আটকে যায়। এতে ফুসফুসে দূষিত কণা প্রবেশের ঝুঁকি কমে এবং শ্বাসতন্ত্র অনেকটাই সুরক্ষিত থাকে।
অপ্রয়োজনে বাইরে যাওয়া কমিয়ে দিন
যখন বায়ুদূষণের মাত্রা বেশি থাকে, তখন অপ্রয়োজনে বাইরে যাওয়া এড়িয়ে চলাই ভালো। সাধারণত সকালে অফিস সময়ে এবং সন্ধ্যায় যানজটের সময় সড়কে দূষণের মাত্রা বেশি থাকে। তাই সম্ভব হলে এই সময়গুলোতে বাইরে কম বের হওয়া উচিত। যদি বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন হয়, তাহলে তুলনামূলক কম ব্যস্ত সময়ে যাওয়ার চেষ্টা করা যেতে পারে। এতে দূষিত বাতাসের সংস্পর্শ কিছুটা হলেও কমে।
ঘরের ভেতরের বাতাস পরিষ্কার রাখুন
অনেকেই মনে করেন, শুধু বাইরের বাতাসই দূষিত, কিন্তু অনেক সময় ঘরের ভেতরেও দূষণ তৈরি হতে পারে। তাই বাসার ভেতর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত ঘর ঝাড়ু দেওয়া, ধুলাবালি পরিষ্কার করা এবং প্রয়োজনে ভেজা কাপড় দিয়ে মেঝে মুছে নেওয়া ভালো অভ্যাস। একই সঙ্গে প্রতিদিন কিছু সময় জানালা খুলে ঘরের বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করা উচিত। তবে বাইরের ধুলাবালি বেশি হলে জানালা খোলা রাখার সময় সতর্ক থাকতে হবে।
পর্যাপ্ত পানি পান করুন
বায়ুদূষণের প্রভাব শরীরের ওপর কমাতে পর্যাপ্ত পানি পান করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পানি শরীরকে আর্দ্র রাখে এবং শরীরের ভেতরের ক্ষতিকর উপাদান বের হয়ে যেতে সাহায্য করে। প্রতিদিন অন্তত ৮ থেকে ১০ গ্লাস পানি পান করার চেষ্টা করা উচিত। এ ছাড়া মৌসুমি ফলমূল ও সবজি বেশি করে খাওয়ার মাধ্যমে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব। ভিটামিন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট-সমৃদ্ধ খাবার শরীরকে দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে কিছুটা সুরক্ষা দিতে পারে।
চোখ ও ত্বকের যত্ন নিন
বাতাসে থাকা ধুলাবালি শুধু ফুসফুসের জন্য ক্ষতিকর নয়, এটি চোখ ও ত্বকের জন্যও সমস্যার কারণ হতে পারে। দূষিত বাতাসে দীর্ঘ সময় থাকলে চোখে জ্বালাপোড়া, চুলকানি কিংবা লালভাব দেখা দিতে পারে। তাই বাইরে থেকে বাসায় ফিরে পরিষ্কার পানি দিয়ে মুখ ও চোখ ধুয়ে নেওয়া ভালো। এতে ধুলা ও দূষিত কণা সহজেই দূর হয়ে যায় এবং সংক্রমণের ঝুঁকি কমে। ত্বক পরিষ্কার রাখার অভ্যাসও খুব গুরুত্বপূর্ণ।
ঘরের ভেতর ধূমপান এড়িয়ে চলুন
অনেক সময় ঘরের ভেতরের বাতাসও ধূমপানের কারণে দূষিত হয়ে পড়ে। তাই বাসার ভেতরে ধূমপান করা থেকে বিরত থাকা উচিত। এটি শুধু ধূমপায়ী ব্যক্তির জন্যই নয়, আশপাশের অন্যদের জন্যও ক্ষতিকর। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের জন্য এটি আরও ঝুঁকিপূর্ণ। পরিষ্কার ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ বজায় রাখতে ঘরের ভেতরে ধূমপান সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখা প্রয়োজন।
গাছ লাগানোর অভ্যাস বাড়ান
বায়ুদূষণ কমাতে গাছের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গাছ বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে এবং অক্সিজেন সরবরাহ করে, যা পরিবেশকে কিছুটা হলেও পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে। তাই বাসার ছাদ, বারান্দা কিংবা আশপাশের খালি জায়গায় গাছ লাগানোর অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। এটি শুধু পরিবেশ রক্ষায় সহায়ক নয়, বরং মানসিক প্রশান্তিও এনে দেয়।
শিশু ও বয়স্কদের বাড়তি যত্ন প্রয়োজন
বায়ুদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব শিশু ও বয়স্কদের ওপর তুলনামূলক বেশি পড়ে। তাই দূষণের মাত্রা বেশি থাকলে শিশুদের বাইরে খেলাধুলা কম করতে দেওয়া উচিত। একইভাবে বয়স্কদেরও অপ্রয়োজনে বাইরে যেতে নিরুৎসাহিত করা ভালো। যাদের আগে থেকেই শ্বাসকষ্ট বা অ্যাজমার সমস্যা রয়েছে, তাদের নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা জরুরি।
সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন
বায়ুদূষণ মোকাবিলায় শুধু ব্যক্তিগত সতর্কতা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা এবং সমন্বিত উদ্যোগ। অযথা বর্জ্য পোড়ানো বন্ধ করা, যানবাহনের ধোঁয়া কমানো, শিল্পকারখানায় পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার এবং নির্মাণকাজে ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণ করাÑ এসব উদ্যোগ বায়ুদূষণ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এক্ষেত্রে সরকার, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি।