× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

হিমালয়ের পথে

নুরুন্নাহার নিম্নি

প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০২৬ ১১:২৫ এএম

এভারেস্ট অভিযানে গেছেন বাংলাদেশি পর্বতারোহী নুরুন্নাহার নিম্নি

এভারেস্ট অভিযানে গেছেন বাংলাদেশি পর্বতারোহী নুরুন্নাহার নিম্নি

এভারেস্ট অভিযানে গেছেন বাংলাদেশি পর্বতারোহী নুরুন্নাহার নিম্নি। কাঠমান্ডু থেকে লুকলা হয়ে নিম্নি যাবেন এভারেস্ট বেজক্যাম্প। নেপালের এইটকে এক্সডিশনের সঙ্গে তার এই অভিযান প্রায় ৫০ দিনের। সাধারণত মে মাসের ১৫ থেকে ৩০ তারিখের মধ্যে সামিট (শৃঙ্গে আরোহণের অভিযান) হয়ে থাকে। দীর্ঘ বিরতির পর (২০১৭ সাল) বাংলাদেশি কোনো নারী অভিযাত্রী এভারেস্ট অভিযানে গেলেন। মাউন্ট এভারেস্টের পথে নেপাল থেকে লিখেছেন পর্বতারোহী নুরুন্নাহার নিম্নি

বছরের শুরুর দিন (১৪ এপ্রিল) সেই ভোরবেলা উঠেছি। সাড়ে ৭টায় সামিট এয়ারে আমাদের লুকলার ফ্লাইট। ইয়াংচেন বলেছে ৬টা ৩০ মিনিটের মধ্যে এয়ারপোর্টে থাকতে হবে। আর আমরা হোটেল থেকে ৬টায় রওনা দেব। আমি তৈরি। এদিকে ড. চিন্ময়ী মেসেজে জানিয়েছে যে, তাদের এক বন্ধুর জুতা হোটেল থেকে কালেক্ট করে নিতে হবে। ব্যাগের ট্যাগ পাঠিয়েছে। হোটেলে জানিয়েছি কিন্তু ব্যাগ খুঁজে পায় না। এরপর ড. চিন্ময়ীকে ব্যাগের ছবি পাঠাতে বললাম। এরপর ব্যাগ খুঁজে পাওয়া গেল। এদিকে এয়ারপোর্টে যাওয়া দেরি হচ্ছে বলে তাড়া দিচ্ছিল। অবশেষে সাড়ে ৬টার দিকে বের হতে পারলাম। এয়ারপোর্টে ভিম দাই আমাদেরকে সহযোগিতা করলেন। কিন্তু এয়ারপোর্টে এসেই-বা কী! আমাদের ফ্লাইট দেরি হয়েছে। আমি আর কোয়েন্টিন দ্য ফ্রেঞ্চ পিচ্চি বসে বসে কিছুক্ষণ গল্প করি, কিছুক্ষণ হাঁটি, মোবাইলে গেম খেলি। সময় কাটে না। সেই সাড়ে ৭টার ফ্লাইট ছাড়তে ছাড়তে সাড়ে ১০টা বাজল! বরাবরের মতো হিমালয় পর্বতমালা দেখার জন্য এই প্লেনের বাম দিকে বসি। কোয়েন্টিনকেও বসাই। এটা ওর প্রথম নেপালে আসা, প্রথম হিমালয় দেখা। যারা একবার লুকলা ফ্লাইটে গেছেন তারা জানেন এই ফ্লাইট আকাশে কী রকম রোলার কোস্টারের অনুভূতি দেয়।

যথাসময়ে লুকলায় পৌঁছে যাই। লুকলায় পৌঁছানো মাত্রই আমাদের ট্রেকিং গাইড গণেশ দাইয়ের হাসিমুখ দেখতে পাই। এয়ারপোর্টে ভিম দাই আমাদের ছবি পাঠিয়েছিল গণেশ দাইকে। গণেশ দাই সেই ছবি দেখে আমাদের চিনে ফেলেছেন। কোয়েন্টিনের সব ব্যাগ এসেছে কিন্তু আমার ক্লাইম্বিং ব্যাগ আসেনি। ক্লাইম্বিং ব্যাগ সরাসরি বেজক্যাম্পে চলে যাবে বলে আমরা আর চিন্তা করি না। আমাদের ফ্লাইট দেরি ছিল বলে আমরা লুকলায় হোটেলে ফিরে ফ্রেশ হয়ে লাঞ্চ করার সিদ্ধান্ত নিই এবং এরপর সরাসরি ফাকদিং চলে যাব। লুকলায় আজ বেশ ঠান্ডা। খুব বেশি ট্রেকার চোখে পড়ে না। আমরা লজে লাঞ্চ করি। এইটকের অন্য দুজন গাইড আসেন আমাদের সঙ্গে গল্প করতে। এই মৌসুমে কী রকম ব্যস্ততা তা নিয়ে বিস্তর কথা হয়। কোয়েন্টিন পুমোরি ক্লাইম্ব করতে এসেছে শুনলে সবাই বলে পুমোরি ক্লাইম্ব বেশ কঠিন। তাতে অবশ্য কোয়েন্টিনের কোনো ভাবান্তর হয় না।

ডাল-ভাত খেয়ে আমরা হাঁটা শুরু করি। চেকপয়েন্টে পাসপোর্ট দেখিয়ে পারমিশন নিতে হবে। আমার পাসপোর্ট সঙ্গে আছে কিন্তু কোয়েন্টিনের পাসপোর্ট ওর ক্লাইম্বিং ব্যাগে। ক্লাইম্বিং ব্যাগ হেলিকপ্টারে করে ইতোমধ্যে বেজক্যাম্পের পথে। এখন কী হবে। কোয়েন্টিনকে এই প্রথম একটু ঘাবড়ে যেতে দেখি। গণেশ দাই বেশখানিকটা অনুরোধ করার পর মোবাইলে পাসপোর্টের ছবি দেখিয়ে পারমিশন নিতে পারেন।

মার্চের শেষ আর এপ্রিলের শুরুতে আমার ফেসবুকের নিউজ ফিড ভরে গিয়েছিল রডোডেন্ড্রনের ছবি দিয়ে। পরিচিত, অপরিচিত সবাই যেন একযোগে রডোডেন্ড্রনবিলাসে নেমে পড়েছে। এসব ছবি দেখে মিশ্র অনুভূতি হয়েছে। মন খারাপ হয়েছে আবার ভালোও লেগেছে। তবে বেশিরভাগ সময় আফসোস হয়েছে যে, এবার এই বসন্তে হিমালয়ে যেতে পারব না, এ রকম রডোডেন্ড্রনও দেখতে পাব না। তাই যখন আসা হলো, লুকলা থেকে ফাকদিং যাওয়ার পথে ইচ্ছামতো ফুলের সঙ্গে ছবি তুলেছি। পুরো পথজুড়ে রাজত্ব করছে পূর্ণ পরিস্ফুট বিভিন্ন রঙের রডোডেন্ড্রন আর চেরি ফুল। ফেরার সময় এসব দেখতে পাব না।

লুকলা থেকে ফাকদিং সহজ পথ। বেশিরভাগ সময় নিচে নামতে হয়। লুকলায় লাঞ্চ করে আমরা ফাকদিংয়ের পথে রওনা দিই বলে উল্টো পথে আসা ট্রেকারের সঙ্গে বেশি দেখা হয়। লুকলা থেকে যারা ফাকদিং যাবে বেশিরভাগই আগে চলে গেছে। পুরো পথজুড়ে চেরি আর রডোডেন্ড্রন আর নদী। অল্প সময়ের মধ্যে ফাকদিং পৌঁছে যাই। পরিচিত সব লজ ছাড়িয়ে হাঁটতেই থাকি। অনেকটা হাঁটার পরও কোথাও থামি না দেখে গণেশ দাই কাছে জানতে চাই কখন থামব। গণেশ দাই বক্তব্য অনুযায়ী এইটা পুরান ফাকদিং মানে পুরান ঢাকা আর কি তাই এখানে থাকবে না। একটু সামনে এগিয়ে নদী পেরিয়ে নতুন ফাকদিং, সুন্দর ফাকদিং-এ থাকবে। ঠিক আছে কোনো সমস্যা নেই। নতুন ফাকদিং-এ লজ খুব সুন্দর কিন্তু ওয়াইফাই বা মোবাইল ডেটা কাজ করে না। সন্ধ্যায় বৃষ্টি নেমে ফাকদিং-এ বেশ ঠান্ডা পড়ে গেল। 

কী কী লিখলাম না...। চিন্ময়ীদের সঙ্গে কীভাবে পরিচয় হলো, ব্যাগ খুঁজে পেতে কেমন কষ্ট হলো। এয়ারপোর্টে বসে থেকে কীভাবে কোয়েন্টিনকে জীবনের প্রথম মোমো খাওয়া শেখালাম। লুকলার ফ্লাইটে কীভাবে কোয়েন্টিন ঘুমিয়ে পড়ল। লুকলায় এসেই কী রকম কোভিডকালে এখানে আটকে পড়ার স্মৃতিরা দাপাদাপি করল, একজন দুটো রডোডেন্ড্রন ফুল হাতে তুলে দিল আর সেটা কীভাবে লজের লোক ময়লার বিনে ছুড়ে ফেলল! কত কী লেখা হয় না, সবচেয়ে বেশি লেখা হয় না অনুভূতিটুকু। থাকুক বাকি, থাকুক বুকে।

(১৫ এপ্রিল) ফাকদিং-এর বৃষ্টিভেজা রাতে বেশ আরামে ঘুমিয়েছি। গত কয়েক রাত ঘুম কম হয়েছিল, কিন্তু ফাকদিং-এ এসে একটানা সাড়ে আট ঘণ্টা ঘুমিয়ে তরতাজা লাগছে। ব্রেকফাস্ট সকাল ৭টায় কিন্তু উঠেছি সাড়ে ৫টায়। জানালা খুলে দিতেই বুঝলাম আজ রোদ উঠবে। গতকাল সারা দিনের মেঘলা আকাশের পর আজ রৌদ্রময় দিন হবে। ঝকঝকে রোদ ভালো লাগে। মনটা কেমন চনমনে হয়ে ওঠে। 

ঠিক ৭টায় ডাইনিংয়ে এসে দেখি আমার ট্রেক সঙ্গীরা এসে পড়েছে। ডাইনিং ভর্তি লোকজন। কথা শুনে এবং গ্রুপের সাইজ দেখে বোঝা যায় সবাই ট্রেকার। সবাই ভীষণ উত্তেজিত নামচে বাজার যাওয়ার ব্যাপারে। আমাদেরও আজকের গন্তব্য নামচে বাজার। ব্রেকফাস্ট সেরে সাড়ে ৭টায় আমরা বেরিয়ে পড়ি।

পর্বতারোহী নুরুন্নাহার নিম্নি

এ নিয়ে এই পথে আমার চতুর্থবার যাত্রা। তার পরও প্রতিবার নতুন মনে হয়। প্রতিবার প্রথমবারের স্মৃতি মনে পড়ে। আমি স্মৃতিকাতর নই, স্মৃতিচারণ করতেও ভালো না, তারপরও মনে পড়ে। ফাকদিং থেকে নামচে বাজার যাওয়ার সিঁড়িগুলোর ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নিয়েছি, কোন লজে চাবিরতি নিয়েছি, কোন লজে লাঞ্চ করেছি, সব মনে পড়ে। 

জোরসালেতে আমাদের লাঞ্চ করার কথা ছিল, কিন্তু আমরা সাড়ে ৯টার দিকে জোরসালেতে পৌঁছে যাই। এত তাড়াতাড়ি লাঞ্চ করতে চাই না, তাই গণেশ দাই আমাদের জন্য এক প্যাকেট বিস্কুট নিয়ে নেন যদি পথে খিদে পায় তাহলে যেন খেতে পারি। যখন এভারেস্ট তার প্রথম দর্শন দেয়, ট্রেকারদের তখন গণেশ দাই আমাকে বলে, দেখো কত দূরে যেতে হবে। কোয়েন্টিন জানতে চায় পুমোরি কখন দেখতে পাবে। কোয়েন্টিনের পুমোরি আজ দেখা যাবে না তাকে আপাতত এভারেস্ট দেখেই খুশি হতে হচ্ছে। জোরসালের পরে বেশিরভাগ সময়টাই চড়াই। মাঝে এক জায়গায় আব্র দুটো রাস্তা, দুটোই নামচে যাওয়ার। একটা একটু বেশি খাড়া কিন্তু কম দূরত্ব, আরেকটা কম চড়াই কিন্তু দূরত্ব বেশি। গণেশ দাই আমাদের কম দূরত্বের রাস্তায় নিয়ে যান। এখানে দেখা হয় জর্জের সঙ্গে, বয়স ৭৫। এই খাড়া রাস্তাটাই বেছে নিয়েছেন। একটু পরপর ওহ বয়, ওহ বয় করছেন আর হাসিমুখে এগিয়ে যাচ্ছেন।

চড়াই-উতরাই পেরিয়ে, ঝুলন্ত ব্রিজগুলো ছাড়িয়ে ১২টায় আমরা নামচে বাজারে চলে আসি। শাকিল ভাই আমাকে বারবার বলে দিয়েছেন, যে জিনিস আগে কোনোদিন খাইনি, সেই জিনিস যেন সামিটের আগে না খাই। কিন্তু আমি ছুঁচো, নামচে বাজার পৌঁছেই একটা নীল রঙের আরবাল টি নিই। আজ সারা দিন ও কাল সারা দিন এখানেই থাকব। নামচে বাজারের খুবই নিম্নমানের একটি মোমো দোকানে গতবার পৃথিবীর সবচেয়ে সুস্বাদু মোমো খেয়েছিলাম। এইবার দোকানটা খুঁজে পেলে আরেকবার এই মোমো খেতে চাই। মোমোর দোকান খুঁজে পেয়েছি, কিন্তু বন্ধ ছিল। অন্য এক দোকানে মোমো খেয়েছি।

আরও কী কী লিখি না… প্রথমবার আসার স্মৃতিরা যে অত জ্বালাতন করে তা-ও লিখি না, প্রথমবার নামচে বাজার থেকেই তুষারপাত শুরু হয়েছিল আর এবার বেজক্যাম্প পর্যন্ত তুষার পাব না...। এসব লিখি না, গণেশ অন্নপূর্ণায় দুদিন আটকে থেকে কীভাবে বুকসমান তুষার পাড়ি দিয়ে বেঁচে ফিরেছেন, তাও লিখি না। কোয়েন্টিনের বান্ধবী কীভাবে মরে গেল, সেও গল্প লিখি না... আরও কত কী!

(১৬ এপ্রিল) হাজার হাজার পাথরের সিঁড়ি বেয়ে হাঁটতে থাকি। কাঁধে ব্যাগ নেই বলে কেমন খালি খালি লাগে। কোয়েন্টিন অবশ্য ব্যাগ নিয়েছে। ওর ব্যাগেই আমার পানির বোতল, ঘরের চাবি আর চকোলেট দিয়ে দিয়েছি। ওরও নিজস্ব কিছু জিনিস আছে, তারপরও ওর বেশ হালকা লাগছে নিজেকে। 

নামচে বাজার, নেপাল

আজ নামচেতে দ্বিতীয় দিন। এই পথে যারা এসেছেন তারা জানেন নামচেতে প্রায় সবাই দুই রাত থাকেন। নামচে বাজারের উচ্চতা ৩৪৪০ মিটার, এটা একটি শেরপা শহর। এভারেস্টের প্রবেশদ্বার। শনিবার এখানে হাট বসে। এ ছাড়া ট্রেকিং-এর সরঞ্জামসহ অন্যান্য অনেক কিছু এখানে পাওয়া যায়। এত উচ্চতায় চলে আসার পর উচ্চতার সঙ্গে শরীরকে মানিয়ে নেওয়ার জন্য এখানে এক রাত বেশি থাকা। দ্বিতীয় দিনে সবাই একটু দেরিতেই হাইকিং-এ বের হন। কেউ হাইক করে প্রায় ৪০০ মিটার উঁচুতে এভারেস্ট ভিউ হোটেলে যান, কেউবা আবার খুমজুং বা খুন্দে গ্রামে যান। একবার মুহিত ভাই ও বিপ্লব ভাইয়ের সঙ্গে আমি খুমজুং গিয়েছিলাম। বাকি দুবার এভারেস্ট ভিউ হোটেল। এবারও এখানেই যাচ্ছি। সবাই দেরিতে বের হলে কী হবে আমাদের গণেশ দাই সুন্দর দৃশ্য দেখার জন্য আগে আগে যেতে চান। তাই আমরা ৭টার মধ্যে বেরিয়ে যাই। তখন পথে খুব অল্প ট্রেকার। প্রথমার্ধ শত শত, হাজার হাজার পাথরের সিঁড়ি বেয়ে খাড়া পাহাড়ে উঠতে হয়। সকালের নাশতায় শুধু ডিম খেয়েছি। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে ডিম যে কোথায় হারিয়ে যায়! কোয়েন্টিন বা গণেশ দাই কোথাও থামতে চান না। আমি মাঝেমধ্যে থেমে দু-চারটে ছবি তুলি। সিঁড়ি শেষ হওয়ার পরের রাস্তাটা বেশ সহজ। সহজেই স্যাংবোচে পৌঁছে যাই।

স্যাংবোচে ৩৮৬০ মিটার উচ্চতায়। এখান থেকে এভারেস্ট দেখা যায়। এখানে একটা সুন্দর লজ আছে। লজের সামনে আছে আবর্জনা দিয়ে বানানো আর্টওয়ার্ক। খুব সুন্দর। কোয়েন্টিন বা গণেশ দাই এখানেও দাঁড়ান না। আমি একাই একটু দাঁড়াই, আর্টওয়ার্ক দেখি, ভিডিও করি, তারপর গণেশ দাইকে অনুরোধ করি আমার ছবি তুলে দিতে। এই দুজনের কীসের এত তাড়া বুঝি না।

ঘণ্টাখানেকের মধ্যে আমরা এভারেস্ট ভিউ হোটেলে পৌঁছে যাই। গতবার রাশিব ভাই আর রিনি আপুর সঙ্গে যখন এসেছিলেন, তখন এখানে এত ভিড় ছিল যে, বসার বা ছবি তোলার জায়গা পেতে বেগ পেতে হয়েছে। অথচ এবার শুধু একটা টেবিলে কয়েকজন বসে আছেন। তারা কাঠমান্ডু অথবা লুকলা থেকে হেলিকপ্টারে এসেছেন। এখানে ব্রেকফাস্ট সেরে আবার হেলিকপ্টারে ফিরবেন। ট্রেক করে আমরাই প্রথম এসেছি। পছন্দমতো জায়গায় বসে উঁচু উঁচু সব পর্বত দেখি। কোয়েন্টিনের প্রথম এত উঁচু সব পর্বত দেখা, কিন্তু এই পিচ্চির মুখে কোনো উচ্ছ্বাস নেই। একটা ছবিও তুলতে চায় না। ও সম্ভবত ওর আবেগ প্রকাশ করতে পারে না। শুধু মাঝেমধ্যে গণেশ দাই সঙ্গে মিলে আমাকে নিয়ে হাস্যরস করে।

বেশখানিকটা সময় বসে থাকি এখানে, অনেককে আসতে দেখি। তার পরও ভিড় নেই। কিছু টেবিল এখনও ফাঁকা। অনেকটা সময় পর আমরা হোটেল থেকে বেরিয়ে যাই নামচে বাজারে যাওয়ার জন্য। ফেরার সময় বেশি সময় লাগে না। কিন্তু এবার আমরা ট্রেকারজটে পড়ি। প্রচুর ট্রেকার ওপরে উঠে আসছে। আমরা আর আরেকটা গ্রুপ শুধু নামছি। 

নামচেতে হোটেলে ফিরে হট শাওয়ার নিই। অনেক দিন আর হয়তো শাওয়ার নেওয়া হবে না। বেজক্যাম্পে অবশ্য হট শাওয়ার নেওয়ার ব্যবস্থা আছে। শাওয়ার নিয়ে বাইরে বসি। বেশ রৌদ্রোজ্জ্বল দিন তার পরও বাতাসের কারণে হালকা শীত। তাপমাত্রা ৭ ডিগ্রি এখন। রৌদ্রে বসে শাম্মির সঙ্গে গল্প করি। ঢাকার গরমের কথা শুনি।

কাল রাতেই কোয়েন্টিনের সঙ্গে কথা হয়েছে যে আজ বিকালে লজের সঙ্গে লাগোয়া হিমালয়ান জাভা কফিতে বসে আমরা ক্যারট কেক খাব। কোয়েন্টিন আমাকে খাওয়াতে চেয়েছে, কিন্তু ও এত ছোট ওর কাছে খেতে চাই না। ওর ক্যারট কেক পছন্দ বলে আমিও খাই। যেকোনো মিষ্টিজাতীয় খাবার হলেই আমি পছন্দ করি। কেকটায় অবশ্য কম মিষ্টি। কেক খেতে খেতে দেখি ক্যাফের দেয়াল জুড়ে বিভিন্ন দেশের পতাকা। নিজের দেশের পতাকা দেখতে ভালো লাগে। এত দূরে এসে একটা পতাকা দেখে বুকের মধ্যে অমন ভালো লাগা কেন তৈরি হয় জানি না। কোয়েন্টিন ওর পতাকা খুঁজে পায়, কোনো ভাবান্তর নেই। 

বিকালে একটু পাড়া বেড়াতে যাই। ঘুরে ঘুরে দোকান দেখি। এটিএম থেকে টাকা তুলি। পথে আর টাকা তোলার সুযোগ হবে না। প্রতিবার এটিএমে কার্ড ঢোকানোর পর চিন্তায় থাকি কার্ড যেন আটকে না যায়। অথচ এখন পর্যন্ত কোনো দিনই কার্ড আটকায়নি, তার পরও কার্ড বের হয়ে না আসা পর্যন্ত চিন্তায় থাকি।

আজ দেরিতে ডিনার। ডিনারের আগে কোয়েন্টিন আর গণেশ দাইর সঙ্গে অনেক গল্প হয়। কোয়েন্টিন তার বয়সের তুলনায় বেশ অন্যরকম। আমি ওকে কিড ডাকি বলে ও খুব মজা পায়। যদিও ওর বয়স ২৫ কিন্তু আচার-আচরণে নব্বই। এটা শুনে ও বলে ‘ফিফটি ইজ ওকে বাট নাইন্টি!! আই ডোন্ট থিংক সো।’ আমি হাসি। 

দিন ফুরিয়ে যায়। আরেকটু এগিয়ে যাই। যা লিখি না, কোয়েন্টিন সার্টিফাইড অটিস্টিক, গণেশ দাইর লেখাপড়া শিখতে না পারার আফসোস, চিকেন নিয়ে আমাদের খুনসুটি, আরও কত কী!

আবর্জনা থেকে শিল্প

(১৭ এপ্রিল) আগে ডেকেও ছবি তোলানো যেত না অথচ আজ দেখলাম চুপিচুপি পেছনে এসে দাঁড়াচ্ছে অথবা পাশে এসে বসে পড়ছে। নিজের একা একা বা প্রকৃতির সঙ্গে অবশ্য এখনও তুলছে না। প্রতিদিন একটু একটু করে ট্রেক সঙ্গী কোয়েন্টিনকে চেনা, জানাটা দারুণ ব্যাপার। আজকে একমাত্র এই পিচ্চিই কাঁধে ব্যাগ, হাতে পানির বোতল আর পায়ে ক্রকস পরে পুরো পথ হাঁটছে।

আজ আমরা পৌনে ৮টার দিকে নামচে বাজার থেকে বেরিয়েছিলাম। আজকের গন্তব্য থ্যাংবোচে। শুরুতেই আবার সেই শত শত সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে হয়, কিন্তু তারপর সুন্দর সহজ রাস্তা। কোনো কষ্ট হয় না, কিন্তু আমি ধীরেই চলি আর একটু পরপর একটা একটা করে গরম কাপড় খুলতে থাকি। ভীষণ সুন্দর ঝকঝকে রোদ্দুর কিন্তু ওপরের পর্বতগুলোর দিকে তাকালে মনে হয়, ছানি পড়া চোখ নিয়ে তাকিয়ে আছি। তারপরও আমা দাবলাম, লোতসে, এভারেস্টকে দেখতে ভালো লাগে। আজ পথে অনেক ট্রেকার। কেউ ইবিসির দিকে যাচ্ছে, কেউবা গোকিওর দিকে। পথ চলতে কত যে ট্রেকার আর গাইডের সঙ্গে কথা হয়। অনেক বয়স্ক ট্রেকার দেখি সেই তুলনায় কম বয়সী ট্রেকার বেশ কম। মাঝেমধ্যে মনে হয়, পঞ্চাশোর্ধ্ব ট্রেকাররাই বুঝি হিমালয়ের ডাক বেশি শুনতে পান। এই যে এখন লজের ডাইনিংয়ে দেখছি অর্ধেকের বেশি তারাই। 

সহজ পথ পেরিয়ে আসার পরের অংশে শুধু নেমে যাওয়া। নেমে যেতে যেতে একদম নদীর কাছে চলে আসা। গতবার এখানেই রেকর্ডধারী কামি রিতা শেরপার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। এবারও তিনি আসছেন এভারেস্টের চূড়ায় ৩২-বারের মতো আরোহণ করতে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা