× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সফলতার গল্প

পরিশ্রম কখনও বিফলে যায় না

আরাফাত শাহীন

প্রকাশ : ১৯ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:০৩ পিএম

৪৫তম বিসিএসে সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত আরাফাত শাহীন

৪৫তম বিসিএসে সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত আরাফাত শাহীন

৪৫তম বিসিএসে সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন আরাফাত শাহীন। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। বিসিএস যাত্রায় সফলতার গল্প জানাচ্ছেন তিনি।

ফুলবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নহাটা রাণী পতিত পাবনী মাধ্যমিক বিদ্যালয়, নহাটা আইডিয়াল কলেজÑ শিক্ষাজীবনের বেশিরভাগই সময়ই গ্রামে কাটিয়েছি। গ্রামের মুক্ত পরিবেশ যেমন প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার অবারিত সুযোগ দিয়েছে, তেমনই পড়াশোনার ক্ষেত্রে সম্মুখীন হয়েছি অনেক প্রতিকূলতার। তবে সেসব প্রতিকূলতাকে জয় করেই আজকের এ অবস্থানে উঠে এসেছি।

আমার জন্ম গ্রামের এক নিম্নবিত্ত পরিবারে। আমার বাবা একজন কৃষক। শুধু কৃষক বললে ভুল হবে; মূলত তিনি একজন বর্গাচাষি। নিজের জমি বলতে সামান্যই তার আছে। আমরা নয় ভাই-বোন। আমার আগে জন্ম নিয়েছেন আট বোন। আমি সবার ছোট। পরিবারে অভাবের প্রকটতা থাকলেও আমি বড় হয়েছি সবার আদর সোহাগের মধ্য দিয়ে। বাবা নিজে পড়াশোনার সুযোগ না পেলেও আমাদের পড়াশোনার ব্যাপারে পুরোপুরি আন্তরিক ছিলেন। আমার বোনেরাও যথাসম্ভব পড়াশোনা করেছেন। তাদের দুজন সরকারি চাকরিও করেন।

ছাত্রাবস্থায় চাকরির প্রতি তেমন কোনো আগ্রহ আমার ছিল না। পুরো বিশ্ববিদ্যালয় জীবনটা আমি কাটিয়েছি বিভিন্ন ধরনের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে। সেখান থেকে শিখেছি জীবনের নানা রূপ। মানুষের বিপদের দিনে তাদের পাশে দাঁড়ানোর সর্বাত্মক চেষ্টা করেছি।

লেখালেখির অভ্যাস ছিল স্কুলজীবন থেকেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে সেটা আরও বৃহৎ পরিসরে ডানা মেলার সুযোগ পায়। আমি দেশের জাতীয় পত্রিকাগুলোতে নিয়মিত লিখতাম। গল্প, কবিতা, ফিচার, কলামÑ প্রায় নিয়মিতই আমার লেখা থাকত পত্রিকার পাতায়। ছাত্রজীবন শেষ হওয়ার আগেই আমার তিনটি বই প্রকাশিত হয়। ফলে সবার কাছে আমি পরিচিতি পাই ‘কবি’ হিসেবে। 

কবি হওয়ার শখই আমাকে জাপটে রাখে পুরো শিক্ষাজীবনজুড়ে। তবে একদিন এমন একটা ঘটনা ঘটে যা আমাকে কল্পনার জগত থেকে বাস্তবতায় নামিয়ে নিয়ে আসে। তখন আমার মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ হয়েছে। রাজশাহী ছাড়িনি তখনও। ‘পাঠশালা’ নামে একটি শিক্ষামূলক সংগঠনের সভাপতি আমি। একদিন কোর্ট এলাকা থেকে অটোরিকশায় করে ক্যাম্পাসের দিকে আসছিলাম। আমার সঙ্গী ছিল সংগঠনের বেশ কয়েকজন। সভাপতি হিসেবে অটোরিকশার ভাড়া আমাকেই দিতে হয়। ভাড়া ছিল একশ টাকা। ভাড়া দিতে গিয়ে দেখি পকেটে যে টাকা বাকি থাকে তা দিয়ে রাতের খাবারের বন্দোবস্ত হলে পরদিন দুপুরে খাওয়ার টাকা থাকে না। সেদিনই সিদ্ধান্ত নিই কিছু একটা করতে হবে। এভাবে রাজশাহীতে বেকার বসে থাকলে জীবন চলবে না। খুব কাছের কয়েকজনকে জানিয়ে পরদিনই রাজশাহী ছেড়ে চলে আসি। এরপরই মূলত শুরু হয় আমার সংগ্রাম। 

রাজশাহী ছেড়ে এসে কয়েক মাস খুলনায় ছিলাম। যেহেতু চাকরির পরীক্ষাগুলোর বেশিরভাগই ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়; তাই খুলনায় অবস্থান করাটা আমার জন্য সুবিধাজনক মনে হচ্ছিল না। আমার ছোট দুলাভাই তখন সাভারের নবীনগর এলাকায় থাকতেন। খুলনা ছেড়ে আমি দুলাভাইয়ের কাছে চলে আসি।

ঢাকায় গিয়েই মূলত বিসিএসের জন্য সিরিয়াস প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করি। পরীক্ষার জন্য যেসব বই দরকার, তার সবগুলো সংগ্রহ করে পড়াশোনা চালিয়ে যাই। প্রথম দিকে চাকরির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারতাম না। এমনকি পরপর তিনটি বিসিএস (৪১, ৪৩ ও ৪৪তম) প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় আমি অকৃতকার্য হই। তারপরও হাল ছাড়িনি; চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি। প্রথম প্রিলিমিনারি পাস করি ৪৫তম বিসিএসে এসে। এরপর বেশ কয়েকটি পরীক্ষায় পাস করতে সক্ষম হই। আমার প্রথম চাকরি ছিল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে। বর্তমানে আমি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সহকারী কাস্টোডিয়ান হিসেবে কর্মরত আছি রবীন্দ্র স্মৃতি জাদুঘর, দক্ষিণডিহি, খুলনাতে। এই চাকরিটিও বেশ উপভোগ করছি।

মূলত বিসিএস কিংবা যেকোনো সরকারি চাকরি পাওয়ার জন্য সময়ানুবর্তিতা ও একাগ্রতার কোনো বিকল্প নেই। বিসিএস শুধু একটি পরীক্ষাই নয়; একটি দীর্ঘ জার্নি। এই জার্নিতে দম হারালে চলে না। এ এক দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। ৪৫তম বিসিএসের সার্কুলার হয়েছিল ২০২২ সালের নভেম্বরে। আর ২০২৫ সালের নভেম্বরে অর্থাৎ সার্কুলার দেওয়ার তিন বছর পর চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত হলো। এত দীর্ঘ সময় টিকে থাকার জন্য শারীরিক ও মানসিক স্থিরতার পাশাপাশি আর্থিক সক্ষমতাও এক চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়। আল্লাহর রহমতে আমি সেই চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছি।

বিসিএসে সফল হতে হলে শুধু পরিশ্রম কিংবা পড়াশোনা দিয়েই হয় না। এখানে ভাগ্যের সহায়তাও লাগে। আমার চেয়েও মেধাবী ও পরিশ্রমী অনেকেই শেষপর্যন্ত সফল হতে পারেনি। তবে এই জার্নিতে হাল ছেড়ে দেওয়া যাবে না। শেষপর্যন্ত দম ধরে রাখতে হবে। আমার পরিবার শুরু থেকেই আমাকে পূর্ণ সাপোর্ট দিয়েছে। যখনই আমি হতাশার সাগরে হাবুডুবু খেয়েছি, তখনই তারা আমাকে উৎসাহ দিয়েছে। আমি আবার পথচলার অনুপ্রেরণা পেয়েছি। আমার বন্ধুভাগ্যও বেশ ভালো বলতে হবে। বন্ধুরা সব সময় আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে। কয়েকজন বড় ভাই ও আপু আমাকে উৎসাহ প্রদান করেছেন। এমনকি পূর্বের বিসিএসগুলোতে যারা বিভিন্ন ক্যাডারে যোগদান করেছেন, আমি তাদের থেকেও নানা সময়ে পরামর্শ গ্রহণ করেছি। বিসিএস কিংবা যেকোনো সরকারি চাকরিতে সফল হওয়ার জন্য এই কাজটিকে আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়। 

যেহেতু একজন প্রথম শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছি, তাই আমার চেষ্টা থাকবে সর্বোতভাবে দেশের সেবায় আত্মনিয়োগ করা। আমি যে অবস্থায় থাকি না কেন দেশ ও দেশের মানুষের কথা যেন কখনও না ভুলি। আর যে গ্রামীণ জনপদ থেকে আমি উঠে এসেছি, সব সময় চেষ্টা করব সেই জনপদের জন্য কিছু করতে। আমার নিজ এলাকার শিক্ষার হার এখনও অনেক কম। মানুষকে শিক্ষার গুরুত্ব বোঝানোর চেষ্টা করব।

আমাদের পরবর্তীতে যারা বিসিএস ক্যাডার কিংবা সরকারি চাকরির জন্য চেষ্টা করবে, তাদের প্রতি আমার পরামর্শ থাকবেÑ কখনও হতাশ হওয়া যাবে না। নিজের লক্ষ্যের দিকে একাগ্রতার সঙ্গে এগিয়ে চলতে হবে। সব সময় মনে রাখতে হবে, নানাজনে নানা কথা বলবে; কিন্তু সেগুলোর দিকে ভ্রুক্ষেপ করা যাবে না। সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে সতর্ক থাকতে হবে। কোনোভাবেই সময় নষ্ট করা যাবে না। প্রতিনিয়ত আপডেট থাকার জন্য পত্রপত্রিকা পড়া যেতে পারে। বিশেষ করে পত্রিকায় সমাজ, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বিষয়ের ওপর যে প্রবন্ধগুলো প্রকাশিত হয় সেগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়তে হবে। আর লিখিত পরীক্ষায় ভালো করার জন্য নিজের চিন্তাশীলতার উন্নয়ন ঘটানোর বিকল্প নেই। হাতের লেখা যথাসম্ভব পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। সর্বোপরি প্রচুর পড়াশোনার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। মনে রাখতে হবে, পরিশ্রম কখনও বিফলে যায় না।

লেখক: সহকারী কাস্টোডিয়ান

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় 

বিসিএস সাধারণ শিক্ষা (সুপারিশপ্রাপ্ত), ৪৫তম বিসিএস 


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা