× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সোলান থেকে সিসু

হামথা পাসের পথে তুষার ভ্রমণ

অর্ণব দাশ

প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০২৬ ১১:৪৯ এএম

হিমালয়ের কোলে অবস্থিত হিমাচল প্রদেশ প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে যেন এক চিরচেনা স্বপ্নের নাম

হিমালয়ের কোলে অবস্থিত হিমাচল প্রদেশ প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে যেন এক চিরচেনা স্বপ্নের নাম

ভ্রমণ মানুষের জীবনে শুধু বিনোদন নয়, বরং নিজেকে নতুন করে খুঁজে পাওয়ার এক অনন্য উপায়। পরিচিত পরিবেশের বাইরে গিয়ে অজানাকে জানার আকাঙ্ক্ষা থেকেই জন্ম নেয় ভ্রমণের গল্প। সেই রকমই হিমালয়ের কোলে যেখানে প্রকৃতি, নীরবতা আর চ্যালেঞ্জ মিলেমিশে তৈরি হওয়া এক স্মরণীয় যাত্রার অভিজ্ঞতার গল্প ঘুরিয়ার পাঠকদের জন্য তুলে ধরেছেন অর্ণব দাশ।

হিমালয়ের কোলে অবস্থিত হিমাচল প্রদেশ প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে যেন এক চিরচেনা স্বপ্নের নাম। পাহাড়, তুষার, নদী আর নীরবতার সুঁতায় বাঁধা এক মায়াবী জগৎ। সম্প্রতি সেই স্বপ্নেরই এক অংশ ছুঁয়ে দেখার সুযোগ হয়েছিল, যখন আমি ঘুরে এলাম সোলান ভ্যালি, হামথা পাস, আতল টানেল এবং সিসু। এই ভ্রমণ কেবল কিছু স্থান দেখা নয়, বরং এ যেন প্রকৃতি, ঐতিহ্য আর নিজের ভেতরের বেড়ে ওঠা এক নিঃশব্দ সংলাপ।

ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি, পাহাড়ের গা বেয়ে কুয়াশা নেমে আসছিল খুব ধীরে ধীরে। ঠান্ডা হাওয়ায় যেন এক ধরনের নির্মলতা, যা শহুরে জীবনে খুব কমই পাওয়া যায়। সেই নীরবতার মাঝেই শুরু হয় পথচলা। মানালি থেকে যাত্রার শুরু, আর সেখান থেকেই ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে থাকে পাহাড়ের রহস্যময় সৌন্দর্য।

প্রকৃতির শান্ত আশ্রয় : সোলান

প্রথম গন্তব্য ছিল সোলান ভ্যালি। সবুজে মোড়া এই উপত্যকা যেন প্রকৃতির এক শান্ত আশ্রয়স্থল। সোলানের একটি বিশেষ পরিচিতি রয়েছে। এটি ‘মাশরুম সিটি অব ইন্ডিয়া’ নামে পরিচিত। ব্রিটিশ আমলের স্থাপত্য, ছোট ছোট গির্জা আর পাহাড়ি বাড়িগুলো এখনও সেই অতীতের স্মৃতিচারণ করিয়ে দেয়। এখানকার স্থানীয় মানুষদের জীবনযাপন বড্ড সহজ, তবে তাদের সংস্কৃতি গভীর ও প্রাচীন। লোক উৎসব, দেবদেবীর পূজা আর পারিবারিক ঐতিহ্যÑ সব মিলিয়ে সোলান এক জীবন্ত সংস্কৃতির ধারক।

উচ্চতার ডাক : হামথা পাস অভিযাত্রা

এরপর শুরু হয় আমাদের যাত্রার সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অধ্যায় হামথা পাসের দিকে। জানা যায়, একসময় এই পথ ছিল কুলু ও লাহৌল উপত্যকার মধ্যে বাণিজ্যের প্রধান মাধ্যম। আজও সেই ইতিহাস যেন পাহাড়ের গায়ে গায়ে লুকিয়ে আছে। তবে এই যাত্রা এত সহজ ছিল না। প্রচণ্ড তুষারপাতের কারণে এক দিনের জন্য পথ বন্ধ হয়ে যায়। সেই বাধা পেরিয়ে পরের দিন ভোরে আবার শুরু হয় যাত্রা। প্রায় ৪,২৭০ মিটার (১৪,০০০ ফুটেরও বেশি) উচ্চতায় অবস্থিত হামথা পাসে ওঠা সত্যিই চ্যালেঞ্জিং। কোথাও পাথুরে পথ, কোথাও বরফে ঢাকা ঢাল, আবার কোথাও খাড়া উত্থান সব মিলিয়ে এটি ছিল সহনশীলতার এক পরীক্ষা।

ওঠার সময়ই সবচেয়ে বেশি সময় লেগেছে। প্রতিটি ধাপ যেন নিজের সীমাকে অতিক্রম করার গল্প বলছিল। মাঝেমধ্যে থেমে শ্বাস নিতে হয়েছে, আবার নিজেকে শক্ত করে সামনে এগোতে হয়েছে। কিন্তু শীর্ষে পৌঁছে যে দৃশ্য চোখে পড়ে, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। চারদিকে বরফে ঢাকা পাহাড়, নিচে বিস্তীর্ণ উপত্যকা, আর মাথার ওপরে নীল আকাশ মনে হচ্ছিল যেন আকাশ ছুঁয়ে ফেলা যায়। সেই মুহূর্তে সব কষ্ট সার্থক মনে হয়। নামার পথটিও কম কঠিন ছিল না। বরফে পা পিছলে যাওয়ার ভয়, খাড়া ঢাল আর ঠান্ডা হাওয়া। সব মিলিয়ে সাবধানে নামতে হয়েছে। তবু ওঠার তুলনায় নামতে সময় কিছুটা কম লেগেছে। এই অভিজ্ঞতা শিখিয়েছে পাহাড়ের সৌন্দর্যের পাশাপাশি তার কঠোরতাও সমান সত্য।

পাহাড়ের বুকে আধুনিক বিস্ময় : আতল টানেল

এরপরের দিন আমরা প্রবেশ করি আতল টানেলে। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ির নামে নামকরণ করা এই টানেল আধুনিক ভারতের এক অসাধারণ প্রকৌশল নিদর্শন। প্রায় ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এই টানেল পাহাড় কেটে তৈরি, যা সারা বছর লাহৌল অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখে। টানেলের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে মনে হচ্ছিল, আমরা যেন এক জগৎ থেকে আরেক জগতে প্রবেশ করছি। অন্ধকার পেরিয়ে আলোয় ফিরতেই দেখা গেল এক ভিন্ন ভূখণ্ড লাহৌল ভ্যালি। এখানে প্রকৃতি কিছুটা রুক্ষ কিন্তু সেই রুক্ষতার মধ্যেই রয়েছে এক গভীর সৌন্দর্য।

তুষারের রাজ্য : সিসু

আতল টানেল পেরিয়ে আমাদের শেষ গন্তব্য ছিল সিসু। সিসু একটি ছোট্ট কিন্তু অপূর্ব সুন্দর গ্রাম। এই সফরে সবচেয়ে বেশি বিস্মিত করেছে এখানকার বরফে ঢাকা দৃশ্য। অন্য সব জায়গার তুলনায় সিসুতেই আমরা সবচেয়ে বেশি বরফ দেখতে পেয়েছি। আশপাশের পাহাড়, রাস্তা, গাছপালা সবকিছুই সাদা বরফের চাদরে ঢেকে ছিল। যেন কোনো রূপকথার রাজ্য।

সিসুর আরেকটি বিশেষত্ব হলো তার শান্ত পরিবেশ এবং তিব্বতি-বৌদ্ধ সংস্কৃতির ছোঁয়া। ছোট ছোট গোম্ফা, প্রার্থনার পতাকা আর মানুষের ধীর, শান্ত জীবনযাপন এই জায়গাটিকে এক ভিন্ন মাত্রা দেয়। এখানে সময় যেন ধীরে চলে, আর মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে বাঁচে।

পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা ঝরনা, বরফের মাঝেও বয়ে চলা জলধারা আর দূরের তুষারশুভ্র শৃঙ্গ সব মিলিয়ে সিসু যেন এক জীবন্ত আঁকা ক্যানভাস। সেখানে দাঁড়িয়ে মনে হয়েছিল, জীবনের সব ব্যস্ততা, ক্লান্তি আর অস্থিরতা কোথাও একটা যেন মিলিয়ে যাচ্ছে।

শেষ প্রান্তে ফিরে দেখা

এই ভ্রমণ আমাকে শুধু নতুন কিছু স্থান দেখায়নি, বরং নতুনভাবে ভাবতেও শিখিয়েছে। পাহাড়ের মানুষের সরলতা, তাদের সংগ্রাম এবং প্রকৃতির সঙ্গে তাদের গভীর সম্পর্ক আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছে। শহরের কোলাহল থেকে দূরে এই কয়েকটি দিন যেন এক অন্য জীবনের স্বাদ দিয়েছে। ফিরে আসার সময় মনে হচ্ছিল, এই পাহাড় শুধু সৌন্দর্যই দেয় না, এ জীবন সম্পর্কে কিছু মূল্যবান শিক্ষা দেয়। ধৈর্য, সহনশীলতা এবং প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা এই গুণগুলো যেন অজান্তেই হৃদয়ে গেঁথে যায়।

ভ্রমণ শেষ হলেও তার অনুভূতি শেষ হয় না। বরং সেই স্মৃতিগুলো বারবার ফিরে আসে, মনে করিয়ে দেয় জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলো লুকিয়ে থাকে প্রকৃতির মাঝেই। এই সফর তাই কেবল একটি ভ্রমণ নয়, এটি এক আত্ম অন্বেষণের যাত্রা, যেখানে পাহাড়, বরফ আর নীরবতা মিলে জীবনের এক নতুন অর্থ খুঁজে দেয়।


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা