তাছলিম সিদ্দিকী
প্রকাশ : ১১ এপ্রিল ২০২৬ ১৬:১৭ পিএম
প্রযুক্তির অগ্রগতি এখন আর শুধু হাতে ধরা ফোন বা টেবিলে রাখা কম্পিউটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ওয়্যারেবল গ্যাজেট এমন এক যুগের সূচনা করেছে, যেখানে প্রযুক্তি সরাসরি আমাদের শরীরের সঙ্গে মিশে গেছে। কবজিতে বাঁধা একটি ঘড়ি বা আঙুলে পরা একটি রিং এখন আমাদের হৃদস্পন্দন, ঘুমের গুণমান, রক্তের অক্সিজেন লেভেল এবং দৈনন্দিন কার্যকলাপের প্রতিটি মুহূর্ত নজরে রাখছে। এটি শুধু একটি গ্যাজেট নয়, বরং আমাদের স্বাস্থ্যের নীরব সঙ্গী। স্মার্টওয়াচ ও ফিটনেস ট্র্যাকার এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে জনপ্রিয়।
অ্যাপল ওয়াচ, স্যামসাং গ্যালাক্সি ওয়াচ, শাওমি স্মার্ট ব্যান্ড বা অ্যামাজফিটের মতো ডিভাইসগুলো শুধু সময় দেখায় না। এরা হার্টরেট মনিটরিং, স্টেপ কাউন্টিং, ক্যালরি বার্ন, ঘুম ট্র্যাকিং এবং এমনকি ইলেকট্রোকার্ডিওগ্রাম (ইসিজি) পর্যন্ত মাপতে পারে। ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী ওয়্যারেবল ডিভাইসের শিপমেন্ট ৬১১ মিলিয়ন ইউনিট ছাড়িয়েছে, যার মধ্যে স্মার্টওয়াচের অংশ প্রায় ৫০ শতাংশ। বাংলাদেশেও এর জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে। যুবক-যুবতিরা ফিটনেস গোল অর্জন করতে, বয়স্করা স্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রণে এগুলো ব্যবহার করছেন। স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণে ওয়্যারেবল প্রযুক্তির ভূমিকা অসাধারণ। এখন আর শুধু ফিটনেস নয়, এই ডিভাইসগুলো প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা সম্ভব করছে।
অস্বাভাবিক হার্ট রেট বা অক্সিজেন লেভেল কমে গেলে তাৎক্ষণিক অ্যালার্ট দেয়। ডায়াবেটিস রোগীরা কন্টিনিউয়াস গ্লুকোজ মনিটরিংয়ের মাধ্যমে রক্তে শর্করার মাত্রা ট্র্যাক করতে পারেন। অনেক ডিভাইস এখন স্ট্রেস লেভেল, রক্তচাপের প্রবণতা এবং এমনকি পতন শনাক্ত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জরুরি যোগাযোগ করতে পারে। ফলে চিকিৎসকরা রোগীর দৈনন্দিন তথ্য দেখে আরও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন। এটি বিশেষ করে দূরবর্তী এলাকায় বাস করা মানুষের জন্য আশীর্বাদ। ভবিষ্যতে ওয়্যারেবল প্রযুক্তির সম্ভাবনা আরও বিস্ময়কর। ২০২৬ সালে বাজারের আকার ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে এবং ২০৩০-এর মধ্যে এটি কয়েকশো বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সঙ্গে যুক্ত হয়ে এই ডিভাইসগুলো শুধু তথ্য সংগ্রহ করবে না, বরং প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করে রোগের পূর্বাভাস দিতে পারবে।
স্মার্ট রিং, স্মার্ট গ্লাস, এমনকি স্মার্ট কাপড়ের মতো নতুন ফর্ম ফ্যাক্টর আসছে। ভবিষ্যতে হয়তো আমরা শরীরের ভেতরের অবস্থা নন-ইনভেসিভ উপায়ে মনিটর করতে পারব যেমনÑ রক্তচাপ, কোলেস্টেরল বা এমনকি ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণও। ব্যাটারি লাইফ বাড়বে, ডিভাইসগুলো আরও হালকা ও আরামদায়ক হবে। তবে চ্যালেঞ্জও রয়েছে। গোপনীয়তা, ডেটা নিরাপত্তা এবং সঠিকতার প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তবু এ কথা সত্য যে, ওয়্যারেবল প্রযুক্তি আমাদের স্বাস্থ্যকে আরও সচেতন ও নিয়ন্ত্রণযোগ্য করে তুলছে। প্রযুক্তি এখন আর আমাদের থেকে আলাদা নয়, এটি আমাদের শরীরেরই অংশ হয়ে উঠেছে। আগামী দিনে এই প্রযুক্তি হয়তো আমাদের আরও সুস্থ, আরও সক্রিয় এবং আরও দীর্ঘায়ু জীবন উপহার দেবে।