মৃন্ময় মণ্ডল চঞ্চল
প্রকাশ : ১১ এপ্রিল ২০২৬ ১৬:১২ পিএম
একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে প্রযুক্তির উৎকর্ষ আমাদের জীবনকে প্রতিনিয়ত সহজ থেকে সহজতর করছে। যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে স্মার্টফোন এখন আমাদের শরীরের অবিচ্ছেদ্য অংশের মতো। আর এই অতিপ্রয়োজনীয় ডিভাইসটির প্রাণশক্তি ধরে রাখতে চার্জিং পদ্ধতিতেও এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। গতানুগতিক তারযুক্ত চার্জারের জঞ্জাল কাটিয়ে এখন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ‘ওয়্যারলেস চার্জিং’। তবে এই আধুনিক প্রযুক্তির কার্যকারিতা কতটুকু এবং এটি আমাদের প্রিয় ডিভাইসটির জন্য কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে সাধারণ ব্যবহারকারীদের মধ্যে কৌতূহল ও সংশয় দুই-ই রয়েছে।
ওয়্যারলেস চার্জিংয়ের পেছনের বিজ্ঞানটি মূলত ‘ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ইন্ডাকশন’ পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এখানে ফোনের ভেতরে থাকা একটি রিসিভার কয়েল এবং চার্জিং প্যাডের ভেতরে থাকা ট্রান্সমিটার কয়েলের মধ্যে বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় সংযোগ তৈরি হয়। এর সবচেয়ে বড় সার্থকতা এর অভাবনীয় স্বাচ্ছন্দ্যে। বারবার পোর্টে তার লাগানো বা খোলার ঝামেলা নেই, ফলে ফোনের চার্জিং পোর্টে ধুলোবালি প্রবেশের ভয় থাকে না এবং যান্ত্রিক ঘর্ষণজনিত ক্ষয়ও কমে যায়। বিশেষ করে প্রিমিয়াম ওয়াটারপ্রুফ স্মার্টফোনগুলোর ক্ষেত্রে এটি একটি টেকসই সমাধান। ক্যাবল নষ্ট হওয়ার বা তার ছিঁড়ে যাওয়ার ভয় থেকেও মুক্তি দেয় এই প্রযুক্তি।
তবে কার্যকারিতার বিচারে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। আপনি যদি অত্যন্ত দ্রুত চার্জিং প্রত্যাশা করেন, তবে ওয়্যারলেস চার্জিং আপনাকে কিছুটা হতাশ করতে পারে। বর্তমানে বাজারে অতি দ্রুতগতির প্রযুক্তি এলেও, সমপরিমাণ ক্ষমতার তারযুক্ত চার্জারের তুলনায় তারহীন চার্জার সব সময়ই কিছুটা ধীরগতির হয়। এর কারণ হলো শক্তির অপচয়। তারের মাধ্যমে যেখানে সরাসরি বিদ্যুৎ ব্যাটারিতে পৌঁছায়, সেখানে বাতাসে বা শূন্য মাধ্যমে শক্তি স্থানান্তরের সময় প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ তাপ হিসেবে হারিয়ে যায়। অর্থাৎ, এটি তারযুক্ত পদ্ধতির মতো অতটা দক্ষ নয়। এ ছাড়া চার্জিং প্যাডের ওপর ফোনটি একটি নির্দিষ্ট অবস্থানে (Alignment) না থাকলে চার্জিংয়ের গতি আরও কমে যায় বা একেবারেই বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
নিরাপত্তা নিয়ে অনেক ব্যবহারকারীর মনেই গভীর শঙ্কা থাকে যে, এটি কি ফোনের ব্যাটারি নষ্ট করে দিচ্ছে? উত্তরটা কিছুটা বিজ্ঞানসম্মত আলোচনার দাবি রাখে। যেকোনো রিচার্জেবল ব্যাটারির প্রধান শত্রু হলো অতিরিক্ত তাপ। যেহেতু ওয়্যারলেস পদ্ধতিতে চার্জ দেওয়ার সময় কয়েলগুলোর ঘর্ষণে বা শক্তি স্থানান্তরের সময় বাড়তি তাপ উৎপন্ন হয়, তাই দীর্ঘমেয়াদে এটি ব্যাটারির স্বাস্থ্যের ওপর সামান্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে আধুনিক স্মার্টফোন এবং চার্জার নির্মাতারা এই সমস্যার কার্যকর সমাধান বের করেছেন। বর্তমানে ‘কিউআই’ স্ট্যান্ডার্ড সার্টিফায়েড চার্জারগুলোতে উন্নত থার্মাল ম্যানেজমেন্ট এবং অটোমেটিক কাট-অফ সিস্টেম থাকে। ফোন অতিরিক্ত গরম হয়ে গেলে বা ফুল চার্জ হয়ে গেলে চার্জারটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে শক্তি সরবরাহ কমিয়ে দেয় বা বন্ধ করে দেয়। ফলে ফোন বিস্ফোরণ বা বড় ধরনের ক্ষতির ঝুঁকি এখন নেই বললেই চলে।
মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর এর কোনো ক্ষতিকর প্রভাব আছে কি নাÑ তা নিয়েও বিস্তর গবেষণা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছেন যে, চার্জিং প্যাড থেকে নির্গত তেজস্ক্রিয়তা রেডিও তরঙ্গের মতোই অত্যন্ত নগণ্য, যা মানুষের ডিএনএ বা শরীরের কোষের ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখে না। তবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি সাধারণ সতর্কতা অত্যন্ত জরুরিÑ ফোনের পেছনে যদি মেটালিক কভার বা ক্রেডিট কার্ড হোল্ডার থাকে, তবে তা সরিয়ে নেওয়া উচিত। ধাতু দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ফোনের ক্ষতি করতে পারে।
ওয়্যারলেস চার্জিং প্রযুক্তিটি এখনও বিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এটি হয়তো গতির লড়াইয়ে তারযুক্ত চার্জারকে এখনও পুরোপুরি হারাতে পারেনি, কিন্তু আধুনিক জীবনযাত্রার দৌড়ে এটি কয়েক ধাপ এগিয়ে। যাদের কাছে টেবিলের ওপর তারের জঞ্জাল অপছন্দ এবং যারা ডেস্কে কাজ করার সময় বারবার ফোন হাতে নিতে পছন্দ করেন, তাদের জন্য এটি একটি চমৎকার সমাধান। প্রযুক্তি যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে খুব শীঘ্রই হয়তো ক্যাবল ছাড়াই ফোন চার্জ দেওয়াটা আমাদের প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিণত হবে। দিনশেষে এটি কেবল একটি সুবিধা নয়, বরং ডিজিটাল লাইফস্টাইলের একটি নতুন রূপান্তর।