রকিবুল হাসান রকেট
প্রকাশ : ১১ এপ্রিল ২০২৬ ১৫:৩৬ পিএম
সকালবেলা ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ দেখলেন আপনার প্রিয় কোনো রাজনৈতিক নেতা বা রূপালি পর্দার তারকা এমন কিছু বলছেন বা করছেন, যা অপ্রত্যাশিত বা অভাবনীয়। ভিডিওটি দেখতে একদম নিখুঁত, কণ্ঠস্বরও হুবহু এক। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই জানা গেল, ভিডিওটি আসলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি একটি ‘ডিপফেক’। ২০২৬ সালে এসে ইন্টারনেটে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়া এখন নিত্যদিনের ঘটনা।
ইন্টারনেটের এই বিশাল দুনিয়া এখন ভরে গেছে মানহীন এবং ভুয়া এআই কনটেন্টে, যাকে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন ‘এআই স্লপ’ বা এআই আবর্জনা। সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলোÑ কোনটি মানুষের তৈরি আর কোনটি যন্ত্রের কারসাজি, তা চিনে নেওয়া। এই সংকট থেকেই জন্ম নিয়েছে ‘ডিজিটাল ট্রাস্ট’ বা ডিজিটাল আস্থার লড়াই কনসেপ্টটি।
‘এআই স্লপ’ আসলে কী?
ইন্টারনেটে লাইক বা ক্লিকের আশায় এআই দিয়ে তৈরি অগণিত অর্থহীন ছবি, ভিডিও বা লেখা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এগুলো অনেক সময় দেখতে সুন্দর হলেও এর কোনো সঠিক তথ্যসূত্র বা গভীরতা থাকে না। মূলত বিজ্ঞাপনের টাকা আয় বা বিভ্রান্তি ছড়াতেই এই ‘এআই আবর্জনা’ তৈরি করা হচ্ছে। ফলে একজন সাধারণ ব্যবহারকারীর পক্ষে সঠিক তথ্য খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
আসল চেনার ডিজিটাল ‘জন্মসনদ’
তবে আশার কথা হলো, এআইয়ের এই জোয়ার রুখতে প্রযুক্তি বিশ্ব নিয়ে এসেছে ‘ডিজিটাল প্রোভেন্যান্স’ বা ডিজিটাল উৎস যাচাইয়ের পদ্ধতি। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম হলো সি২পিএ স্ট্যান্ডার্ড। এটি মূলত ছবির বা ভিডিওর একটি ডিজিটাল ‘জন্মসনদ’ বা ওয়াটারমার্ক হিসেবে কাজ করে। বর্তমানে স্যামসাং, অ্যাপল বা সনির মতো বড় কোম্পানিগুলো তাদের স্মার্টফোন ক্যামেরাতেই এই প্রযুক্তি যুক্ত করছে। যখনই আপনি কোনো ছবি তুলবেন, ফোনের সেন্সর স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই ছবির ভেতরে একটি অদৃশ্য ডিজিটাল স্বাক্ষর জুড়ে দেবে। এতে ছবির সময়, স্থান এবং এটি যে কোনো এআই দিয়ে তৈরি নয়, তার প্রমাণ সংরক্ষিত থাকবে। কোনো ছবি এআই দিয়ে এডিট করা হলেও এই সি২পিএ প্রযুক্তির মাধ্যমে তা সহজেই ধরা পড়বে।
কীভাবে বুঝবেন কোনটি আসল?
একজন সাধারণ ব্যবহারকারী হিসেবে কোনো ছবি বা ভিডিওর সত্যতা যাচাই করতে আপনি নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করতে পারেন।
কনটেন্ট ক্রেডেনশিয়াল পরীক্ষা : অনেক ব্রাউজার বা সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপে এখন ছবির কোণায় একটি ছোট ‘cr’ আইকন দেখা যায়। এটিতে ক্লিক করলে দেখা যাবে ছবিটি মানুষের তোলা নাকি এআই দিয়ে তৈরি। অসংগতি খোঁজা : এআই ভিডিওতে সাধারণত মানুষের চোখের পলক পড়া বা আঙুলের নড়াচড়ায় সূক্ষ্ম অসংগতি থাকে। এ ছাড়া ব্যাকগ্রাউন্ডের লেখা বা লোগো অনেক সময় অস্পষ্ট বা বিকৃত দেখায়। বিপরীত অনুসন্ধান (Reverse Search) : কোনো সন্দেহজনক ছবি দেখলে গুগল লেন্স বা টিনআইয়ের (TinEye) মতো টুল ব্যবহার করে সেটির মূল উৎস খুঁজে বের করার চেষ্টা করুন।
শেষ কথা ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে কেবল ছবি নয়, মানুষের কণ্ঠস্বরও হুবহু নকল করা হচ্ছে। নির্বাচন থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত জালিয়াতিÑ সবক্ষেত্রেই এআইকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাই ‘দেখলেই বিশ্বাস’ করার দিন এখন শেষ। এখনকার মূলমন্ত্র হলোÑ ‘আগে যাচাই, পরে বিশ্বাস’। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ডিজিটাল দুনিয়ায় টিকে থাকতে হলে আগামী দিনে আমাদের সবারই তথ্যের উৎস যাচাইয়ের এই প্রাথমিক জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। কারণ, এআইয়ের এই যুদ্ধে আপনার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো আপনার সচেতনতা। প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, জালিয়াতির মানও তত বাড়ছে। সি২পিএ হয়তো একটি ভালো সমাধান, কিন্তু হ্যাকাররা ইতোমধ্যেই এই ডিজিটাল স্বাক্ষর নকল করার উপায় খুঁজছে। তাই শেষপর্যন্ত প্রযুক্তি নয়, আমাদের নিজস্ব সাধারণ জ্ঞান এবং বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য মিলিয়ে দেখার প্রবণতাই হবে ডিজিটাল আস্থার মূল ভিত্তি।