জারাদ ত্রিস্তান
প্রকাশ : ০৯ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:২৯ পিএম
অলংকরণ : অর্নিলা ভৌমিক
সবুজ মুখ গোমড়া করে রহমতের চায়ের দোকানে বসে আছে। সবুজের বয়স দশ। থাকে বস্তিতে। এনজিওর এক স্কুলে যায়। আর রাস্তায় রাস্তায় বেলী ফুলের মালা বেচে।
দুপুরে মসজিদে আজান দিয়ে দিয়েছে। তাই রহমতের দোকানে লোক নেই। তাই রহমত সবুজকে জিজ্ঞেস করে, ‘এই, বইয়া রইসোস ক্যান, হোগলে চলে গ্যাছে আর তুই বইয়া রইছস।’
সবুজ উত্তর দেয়, ‘দেখো চাচা আর কোনো দিন ঘরে যামু না, কোনো দিন না।’
‘কেন বাড়িত যাবি না ক্যা? বাপ-মায়ে কিছু কইছে?’
‘আজকা কোনো কারণ ছাড়াই বাপে থাপ্পড় দিছে।’
‘তোর বাপের তো কারণ ছাড়া থাপ্পড় দেওয়ার কথা না। তুই তো কিছু করছিলি।’
‘আরে কিছু করি নাই, আমাগো ইসকুলে বলছে সামনে নাকি পহেলা বৈশাখ। সেই দিন ইলিশ মাছ খাইতে হয়, বাপরে কইছি একটা ইলিশ মাছ কিন্না দিতে। শুনে তাই আমারে থাপ্পড় দিছে।’
‘একদম ঠিক করছে, ইলিশ মাছের দাম জানোস তুই? গরিবের আবার কীসের পহেলা বৈশাখ, ওগুলি সব বড়লোকের জিনিস।’
‘ধুরু চাচা তুমিও কিছু বোঝো না।’
গজ গজ করতে করতে সবুজ উঠে চলে গেল। রহমতও আবার কাস্টমারের আসায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
সৌরভের বয়সও দশ। থাকে শহরের অভিজাত এলাকায়। পড়ে স্বনামধন্য এক স্কুলে। তাদেরকেও আজকে স্কুলে পড়িয়েছে পহেলা বৈশাখের কথা। বাংলা নববর্ষ পহেলা বৈশাখ, অনেকটা নিউইয়ারের মতো। আর থার্টি ফার্স্ট হলো চৈত্রসংক্রান্তি। টিচার বলেছে পহেলা বৈশাখে ফ্রায়েড ইলিশ খেতে হয়, সাথে পান্তাভাত, আর বিভিন্ন রকমের মিক্সড ভেজিটেবল। সৌরভ ঠিক করেছে আজ বাপিকে গিয়ে বলবে বাজার থেকে ওর জন্য অনেক ইলিশ মাছ নিয়ে আসতে। ও এবার পহেলা বৈশাখ সেলিব্রেট করবে।
এসব ভাবতে ভাবতে সৌরভ খেয়াল করল তাদের গাড়িটা রাস্তায় জ্যামে বসে আছে। এমন সময় কে যেন জানালায় টোকা দিল। বাইরে তাকাতেই ও দেখলেও ওর সমবয়সী একটা ছেলে, বেলী ফুলের মালা কিনতে বলছে। সামনে তাকিয়ে দেখল ড্রাইভার আঙ্কেল খেয়াল করছ নাকি, না একটু জ্যাম পেয়েই মোবাইল টিপতে বসে গেছে। ও টুকুস করে জানালাটা খুলল।
‘এই ছেলে তোমার নাম কী? তোমার স্কুল নাই? তোমার বাবা তোমাকে একা একা মালা বিক্রি করতে ছেড়ে দিয়েছে?’
‘আমার নাম সবুজ, মালা নেবেন নাকি কন। একটা বিশ টাকা।’
‘তুমি টাকা দিয়ে কী করবে? বাপি তো আমার হাতে টাকা দেয় না, জানো না বাচ্চারা টাকা দিলে খারাপ হয়ে যায়।’
‘ভালো-খারাপ বুঝি না, কিন্তু বুঝতাছি আপনি মালা নেবেন না, শুধু শুধু প্যাঁচাল পারেন কেন।’
এই বলে সবুজ চলে যেতে গেলেই তাকে সৌরভ থামাল। বলল, ‘তুমি জানো পহেলা বৈশাখের সামনে, তোমার স্যান্ডো গেঞ্জিটা সাদা প্যান্টটা লাল। এক্কেবারে মিলে গেছে পহেলা বৈশাখের সাথে।’
সঙ্গে সঙ্গে সবুজের রহমত চাচার ডায়লগটা মনে পড়ে গেল, ‘গরিবের আবার পহেলা বৈশাখ।’
‘তুমিী বলো এসব, বাপি সব সময় বলে সবাই সমান। ধনী-গরিব বলে কিছু হয় না। যাই হোক তোমার বাবা কি তোমার জন্য ইলিশ মাছ কিনেছে নাকি?’ বলল সৌরভ।
ইলিশ মাছের কথায় সবুজের কালকের থাপ্পড়ের কথা মনে পড়ে গেল। কিন্তু তার চেয়েও বড় অবাক হলো এই ধনী-গরিবের কথাটা শুনে। এ রকম কথা সে আগে শুনে নাই। অন্যান্য বাচ্চাকে দেখেছে, ওকে দেখলেই নাক সিটকাতে।
‘কী হলো ইলিশ মাছ কিনেছে নাকি?’
‘গরিবের আর ইলিশ মাছ, ইলিশ মাছ অনেক দামি জিনিস। বাপে কিনা দিব না।’
‘আচ্ছা, তোমার বাসা কই?’
‘আমি থাকি মোহনপুর বস্তিতে...।’
এমন সময় গাড়ি ছেড়ে দিল। সৌরভ ছেলেটার সঙ্গে কথা বলতে পারল না।
বাসায় ফিরে সৌরভ অপেক্ষা করল কখন বাপি অফিস থেকে আসবে। অফিস থেকে এসে বাপি ফ্রেশ না হতেই গিয়ে বাপির কাছে আবদার, ‘বাপি বাপি তোমার কাছে যদি টাকা থাকে তাহলে আমার জন্য ইলিশ মাছ নিয়ে আসবে।’
‘অবশ্যই ইলিশ মাছ আনব, কিন্তু এখানে টাকার কথা উঠছে কেন?’
‘আসলে বাপি আজকে একটা ছেলের সঙ্গে কথা হয়েছে। ও বলেছে ইলিশ মাছের অনেক দাম। ওর বাবা তাই ওকে ইলিশ মাছ কিনে দিবে না।’
সৌরভের বাপ্পির মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল। তাই দেখে সৌরভ চলে গেল।
পহেলা বৈশাখ। রহমত চাচার দোকানের রেডিওতে গান বাজছে, ‘এসো হে বৈশাখ এসো হে সুখ...।’ পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে রহমত চাচা সবাইকে ফিরতে চা খাওয়াচ্ছে। সবুজে বসে বসে চা খাচ্ছে। এমন সময় একটা গাড়ি এসে থামল চায়ের দোকানের সামনে। গাড়ি থেকে নামল একটা ছেলে, সবুজে যেন তাকে আগে কোথাও রেখেছে। ছেলেটার পেছন থেকে নামল আরেকজন লোক।
ছেলেটা হেঁটে এলো সবুজের কাছে।
‘শুভ পহেলা বৈশাখ সবুজ, আমাকে চিনতে পেরেছ, ওই যে তোমার সঙ্গে সেদিন দেখা হলো। আমি গাড়িতে বসেছিলাম জ্যামে। তোমাকে এত সহজে খুঁজে পাব ভাবতেই পারিনি।’
এবার সেই ছেলেটার কথা মনে পড়ল সমুদ্রের। সে খুব সুন্দর কথা বলেছিল।
‘শোনো তোমার জন্য একটা উপহার আছে...।’
তখনই লোকটা অর্থাৎ সৌরভের বাপি ব্যাকডালা থেকে একটা ইলিশ মাছ এনে সবুজের হাতে দিল। মাছ দেখে তো সৌরভের চোখ ছানাবড়া।
‘ইলিশ মাছ, এইটা পুরোটা তুমি আমারে দিয়ে দিলা!’
‘দিবো না, নতুন বছরে তো সবার মুখে হাসি ফোটাতে হবে। বছরের একটা দিন না হয় সব ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে সবাই মিলেমিশে হাসিখুশি থাকলাম। চলো তোমাদের ঘরে চলো। তোমার পরিবারের সাথে একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করব আমরা।’ বলল সৌরভ।
এ রকম কথা আগে কখনও শোনেনি সবুজ। সবুজের চোখে পানি চলে এলো। সৌরভ বলল, ‘আজকের দিনে কেউ কান্না করে নাকি। চলো চলো তোমাদের বাসায় চলো।’
ষষ্ঠ শ্রেণি, উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজ, কাকরাইল, ঢাকা