কর্মক্ষেত্র ও যাতায়াতে যৌন হয়রানি
লাবণী মণ্ডল
প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:৫৩ পিএম
কর্মক্ষেত্র ও যাতায়াতে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন নারীরা
একটি সুস্থ, স্বাভাবিক এবং নিরাপদ জীবনযাপন প্রতিটি মানুষের জন্মগত অধিকার। জীবিকার তাগিদে, শিক্ষার প্রয়োজনে বা দৈনন্দিন নানা কাজে মানুষকে ঘরের বাইরে বের হতে হয়। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের সমাজের একটি বড় অংশ, বিশেষ করে নারীরা, ঘরের বাইরে পা রাখলেই এক অদৃশ্য আতঙ্কের মুখোমুখি হন। কর্মক্ষেত্রে এবং সেখানে যাতায়াতের পথে যৌন হয়রানি আজ এক নীরব মহামারিতে রূপ নিয়েছে। এটি শুধু একজন ব্যক্তির স্বাধীনতাকেই ক্ষুণ্ন করে না, বরং তার শারীরিক, মানসিক এবং পেশাগত জীবনেও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অনেক ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীরা সামাজিক সম্মান নষ্ট হওয়ার ভয়ে বা চাকরি হারানোর আতঙ্কে দিনের পর দিন এই নির্যাতন মুখবুজে সহ্য করেন।
বাসাবাড়ি থেকে কর্মস্থলে পৌঁছানোর পথটি অনেকের জন্যই একটি ভীতিকর অভিজ্ঞতা। গণপরিবহন, বাসস্ট্যান্ড, ট্রেন স্টেশন বা নির্জন রাস্তাÑ কোথাও যেন পুরোপুরি নিরাপত্তা নেই। ভিড়ের সুযোগ নিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে গায়ে হাত দেওয়া, অশালীন মন্তব্য করা, বাজে ইঙ্গিত করা বা পিছু নেওয়া ইত্যাদি আমাদের দেশে যাতায়াতের পথে যৌন হয়রানির সাধারণ চিত্র।
অনেক সময় দেখা যায়, বাসে প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যে কোনো নারী যখন দাঁড়িয়ে থাকেন, তখন পেছনের বা পাশের কোনো ব্যক্তি সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে। প্রতিবাদ করলে উল্টো নারীটিকে অনেক সময় দোষারোপ করা হয়, বলা হয় ‘ভিড়ের মধ্যে এমন একটু-আধটু লাগতেই পারে’ অথবা তার পোশাক নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। এই ধরনের পরিস্থিতির কারণে অনেকেই গণপরিবহন এড়িয়ে চলতে বাধ্য হন, যা তাদের যাতায়াত খরচ বাড়িয়ে দেয় এবং অর্থনৈতিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।
কর্মক্ষেত্র হলো এমন একটি জায়গা, যেখানে মানুষ তার মেধা ও শ্রম দিয়ে নিজের ক্যারিয়ার গড়ে তোলে। কিন্তু এই নিরাপদ আশ্রয়স্থলটি অনেকের জন্য হয়ে ওঠে আতঙ্কের কারণ। কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি কেবল শারীরিক স্পর্শের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি অনেক সময় অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ঘটে। সহকর্মীর কুরুচিপূর্ণ ইঙ্গিত, অশালীন জোকস বা কৌতুক বলা, পোশাক বা শরীর নিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত মন্তব্য করা, কুদৃষ্টিতে তাকানোÑ এগুলো সবই যৌন হয়রানির আওতাভুক্ত।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয় যখন এই হয়রানি ঊর্ধ্বতন কোনো কর্মকর্তার দ্বারা ঘটে। প্রমোশন আটকে দেওয়া, চাকরিচ্যুত করার হুমকি বা পারফরম্যান্স মূল্যায়নে কম নম্বর দেওয়ার ভয় দেখিয়ে অধস্তন কর্মীদের অনৈতিক প্রস্তাব দেওয়ার ঘটনা করপোরেট জগতে বিরল নয়। এ রকম বৈরী কর্মপরিবেশে একজন কর্মীর পক্ষে তার সর্বোচ্চ মেধা বিকাশ করা একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়ে।
বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবি
সুমাইয়া একটি বেসরকারি ব্যাংকের জুনিয়র অফিসার। প্রতিদিন সকালে তাকে মিরপুর থেকে বাসে করে মতিঝিল যেতে হয়। এক দিন সকালে বাসে প্রচণ্ড ভিড় ছিল। সুমাইয়া দাঁড়িয়ে ছিলেন। হঠাৎ তিনি বুঝতে পারলেন পেছনের একজন মধ্যবয়স্ক লোক ইচ্ছাকৃতভাবে তার শরীরের সঙ্গে ঘেঁষে দাঁড়াচ্ছেন এবং আপত্তিকরভাবে স্পর্শ করার চেষ্টা করছেন। সুমাইয়া সরে যাওয়ার চেষ্টা করলেও লোকটি বারবার একই কাজ করতে থাকেন। একপর্যায়ে সুমাইয়া চিৎকার করে লোকটির প্রতিবাদ করেন। কিন্তু বাসের কন্ডাক্টর বা অন্যান্য যাত্রী সুমাইয়ার সাহায্যে এগিয়ে আসার বদলে তাকেই শান্ত হতে বলেন এবং কেউ কেউ মন্তব্য করেন, ‘মেয়ে মানুষের বাসে না উঠে সিএনজিতে যাওয়া উচিত।’ এই ঘটনার পর সুমাইয়া মানসিকভাবে এতটাই ভেঙে পড়েন যে, তিনি এক সপ্তাহ অফিসে যেতে পারেননি। তিনি জানান, বাসে ওঠার কথা ভাবলেই প্যানিক অ্যাটাক হয়। বাধ্য হয়ে এখন বেতনের একটি বিশাল অংশ খরচ করে ফেলি উবার বা সিএনজিতে যাতায়াত করতে। তার স্বাধীনতা এবং আত্মবিশ্বাস এই একটি ঘটনার কারণে মারাত্মকভাবে হোঁচট খেয়েছে।
তানিয়া সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কপিরাইটার হিসেবে যোগ দিয়েছেন। তার কাজের প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল। কিন্তু কয়েক মাস যেতে না যেতেই তার টিমের ম্যানেজার তাকে নিয়ে নানা ধরনের অস্বস্তিকর মন্তব্য করতে শুরু করেন। কখনও তানিয়ার পোশাক নিয়ে, কখনও তার শারীরিক সৌন্দর্য নিয়ে সবার সামনেই এমনভাবে মন্তব্য করতেন; যা আপাতদৃষ্টিতে প্রশংসা মনে হলেও আসলে ছিল কুরুচিপূর্ণ ইঙ্গিত। প্রায়ই ম্যানেজার তানিয়াকে কারণ ছাড়াই অফিস ছুটির পর দেরি করে থাকতে বাধ্য করতেন এবং একা কেবিনে ডেকে নিয়ে ব্যক্তিগত বিষয়ে প্রশ্ন করতেন। তানিয়া যখন এই বিষয়গুলোতে বিরক্তি প্রকাশ করে নিজের সীমানা বা বাউন্ডারি বোঝানোর চেষ্টা করেন, তখন ম্যানেজার তার কাজের ভুল ধরা শুরু করেন। এমনকি তানিয়ার প্রফেশনালিজম নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাকে চাকরি থেকে বের করে দেওয়ার পরোক্ষ হুমকি দেন। এইচআর ডিপার্টমেন্টে অভিযোগ করার কথা ভাবলেও ম্যানেজার কোম্পানির অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি হওয়ায় চাকরি হারানোর ভয়ে তানিয়া চুপ থাকেন। একপর্যায়ে তিনি নিজেই বাধ্য হয়ে চাকরিটি ছেড়ে দেন।

যৌন হয়রানি এমন একটি অপরাধ, যার ক্ষত বাইরে থেকে দেখা না গেলেও ভেতরে ভেতরে একজন মানুষকে শেষ করে দেয়। এর শারীরিক এবং মানসিক প্রভাব অত্যন্ত গভীর ও সুদূরপ্রসারী। যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার পর ভুক্তভোগীরা চরম মানসিক ট্রমায় ভোগেন। ঘটনাটি বারবার তাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে। নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া, অকারণে কান্না পাওয়া, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হওয়া এবং তীব্র বিষণ্নতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় বা কর্মস্থলে যাওয়ার আগে তীব্র ভয় কাজ করে। মানুষের ভিড় দেখলে বা কোনো নির্দিষ্ট পরিবেশে গেলে প্যানিক অ্যাটাক হতে পারে। ভুক্তভোগীরা অনেক সময় নিজেদের দোষারোপ করতে শুরু করেন। ‘আমার পোশাক ঠিক ছিল তো?’, ‘আমি কি কোনো ভুল করেছি?’Ñ এমন চিন্তায় তাদের আত্মবিশ্বাস তলানিতে গিয়ে ঠেকে। দীর্ঘদিন ধরে ক্রমাগত হয়রানির শিকার হলে পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার দেখা দিতে পারে, যার ফলে স্বাভাবিক জীবনযাপন পুরোপুরি ব্যাহত হয়।
মানসিক চাপের কারণে রাতের পর রাত ঘুম না হওয়া একটি সাধারণ শারীরিক লক্ষণ। ক্রমাগত মানসিক যুদ্ধ এবং উদ্বেগের কারণে শরীরে সব সময় এক ধরনের ক্লান্তি ভর করে থাকে। দীর্ঘমেয়াদি স্ট্রেস বা মানসিক চাপের ফলে রক্তচাপ বেড়ে যাওয়া, বুক ধড়ফড় করা এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। অনেকেই মানসিক আঘাতের ফলে খাওয়া-দাওয়া একেবারেই কমিয়ে দেন, আবার অনেকে মানসিক চাপ কমাতে অতিরিক্ত খাবার খেতে শুরু করেন। শরীর সব সময় এক ধরনের ডিফেন্সিভ মুডে বা শক্ত হয়ে থাকার কারণে তীব্র মাথাব্যথা, মাইগ্রেন এবং ঘাড় ও পিঠে ব্যথা দেখা দিতে পারে।
কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি রোধে মহামান্য হাইকোর্টের যে নির্দেশনা রয়েছে, প্রতিটি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তার কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি অফিসে একটি কার্যকর ‘যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি’ থাকতে হবে, যেখানে নারীদের প্রতিনিধিত্ব বেশি থাকবে। ভুক্তভোগী যেন নির্দ্বিধায় এবং নিরাপদে অভিযোগ করতে পারেন, এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। অভিযোগকারীর পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রাখতে হবে। বাস ও অন্যান্য গণপরিবহনে সিসি ক্যামেরা স্থাপন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। বাসের চালক ও হেলপারদের এ বিষয়ে সংবেদনশীল করার জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। শুধু আইন দিয়ে সমাজ পরিবর্তন সম্ভব নয়। পরিবার থেকেই ছেলেমেয়ে উভয়কে নারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের শিক্ষা দিতে হবে। ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করার যে অসুস্থ মানসিকতা আমাদের সমাজে প্রচলিত, তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। চুপ করে থাকা মানেই অপরাধীকে প্রশ্রয় দেওয়া। যাতায়াতের পথে বা কর্মস্থলে বিন্দুমাত্র অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হলেই সঙ্গে সঙ্গে তার প্রতিবাদ করতে হবে এবং আশপাশের মানুষদেরও ভুক্তভোগীর সাহায্যে এগিয়ে আসতে হবে।
কর্মক্ষেত্র এবং যাতায়াতের পথ নিরাপদ হওয়া কোনো বিশেষ সুবিধা নয়, এটি প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার। যৌন হয়রানি একটি জঘন্য অপরাধ, যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সামাজিক অগ্রগতির পথে এক বিশাল বাধা। নারীরা যদি সব সময় নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তবে একটি সমাজ কখনোই সামনের দিকে এগোতে পারে না। নীরবতা ভেঙে প্রতিবাদ করার এখনই সময়। আসুন, আমরা সবাই মিলে এমন একটি সমাজ গড়ে তুলি, যেখানে কর্মক্ষেত্র এবং রাস্তাঘাট হবে সবার জন্য সমানভাবে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ।