আনিসুর রহমান, ধোবাউড়া
প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:৫০ পিএম
চ্যাপায় ভাগ্যবদল জহুর আলীর
দেশের প্রান্তিক জনপদ ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলা। এখানকার মানুষের জীবিকা নির্বাহ কিংবা পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস কৃষি। বাণিজ্যিকভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ একেবারে নেই বললেই চলে। তবে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে বদলে যাচ্ছে প্রান্তিক মানুষের ভাগ্য। তাদেরই একজন জহুর আলী (৬০)। তিনি উপজেলার কাওয়ারকান্দা গ্রামের মৃত আব্দুল মোমিনের ছেলে। পড়াশোনা না থাকলেও তিনি একজন সংগ্রামী এবং উদ্যমী মানুষ। তার বাবা ছিলেন চ্যাপা শুঁটকির খুচরা ব্যবসায়ী। অন্য জায়গা থেকে চ্যাপা কিনে এনে বাজারে বসে শুঁটকি বিক্রি করতেন। বাল্যকাল থেকেই বাবার সঙ্গে বিক্রি করতেন জহুর আলী। তিনি ছিলেন উদ্যমী মনোভাবের।
বাবার ব্যবসার পাশাপাশি শুরু করেন চ্যাপা তৈরি করার কাজ। প্রথমে শুঁটকি তৈরি করে নিজেরাই বাজারে বিক্রি করতেন। পরবর্তীতে ১৯৮৮ সালে ২ লাখ টাকা মূলধন নিয়ে একশ মটকা দিয়ে সততা মোমেন ট্রেডার্স নামে বাণিজ্যিকভাবে চ্যাপা বা সিদল তৈরি শুরু করেন। একনিষ্ঠ পরিশ্রম ও উদ্যমী মনোভাব থাকায় আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তার। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে ব্যবসার পরিধি। পরে স্থানীয় দুধনই বাজারের পাশে জায়গা-জমি কিনে স্থায়ীভাবে চ্যাপা তৈরি করে আসছেন। বর্তমানে তার ব্যবসায় ১ হাজার ৫০০ মটকায় চ্যাপা তৈরি করেছেন। এসব মটকায় অন্তত ২০ ধরনের চ্যাপা তৈরি করা হয়। যার বাজারদর প্রতি কেজি ২০০-৭০০ টাকা। গড়ে প্রতি মটকা বিক্রি করা হয় ৪০ হাজার টাকায়। প্রতি বছর অন্তত ৬ কোটি টাকার চ্যাপা বিক্রি করেন জহুর আলী।

উপজেলার দুধনই বাজারে গিয়ে দেখা যায় একটি ঘরের ৩ নারী ও দুই পুরুষসহ পাঁচজন শ্রমিক চ্যাপা তৈরি করার জন্য শুঁটকি মাছ বাছাই করছেন। তাদের একজন ৬৫ বছরের বৃদ্ধা হালিমা খাতুন। স্বামী মারা গেছে বেশ কয়েক বছর আগে। অভাব-অনটনের পরিবারের মেটাতে অন্তত ১৫ বছর ধরে জহুর আলীর এই চ্যাপা তৈরির কাজ করেন তিনি। বৃদ্ধা হালিমার মতো এখানে চ্যাপা তৈরির কাজ করেন অন্তত ১২ জন শ্রমিক। যাদের সবাইকে দৈনিক ভিত্তিতে ৩০০-১২০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি প্রদান করা হয়। কারিগররা বলেন, আমরা এখানে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করি। মালিক দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে শুঁটকি মাছ কিনে আনেন। আমরা শ্রমিকরা এখানে বাছাই করে পানিতে ধুয়ে পরিষ্কার করে মটকায় ভরা হয়। মটকা ভরার পর মুখ বন্ধ করে অন্তত দুই থেকে আড়াই মাস রেখে দেওয়া হয়। এই সময়ের মধ্যে চ্যাপা তৈরি হয়। পরে তৈরিকৃত চ্যাপা দেশের বিভিন্ন জেলায় পাইকারি বিক্রি করেন জহুর আলী। তার এই সফল উদ্যোগের মাধ্যমে নিজের ভাগ্যবদলের পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে এলাকার কর্মহীন মানুষের। পরিবারের অভাব গুছিয়ে স্বাবলম্বী হচ্ছেন তারা। ইয়াসিন মিয়া নামে এক শ্রমিক বলেন, আমি এখানে অনেক দিন ধরে কাজ করি। এখানে কাজ করে আমার পরিবারের খরচ মেটাই।
চ্যাপা তৈরির উদ্যোক্তা জহুর আলী বলেন, আমার বাবা চ্যাপার ব্যবসা করতেন। আমিও বাবার ব্যবসায় সহযোগিতা করতাম। ধীরে ধীরে চ্যাপা বানানো শিখে বাড়িতে চ্যাপা তৈরি শুরু করি। পরে ১৯৮৮ সালে উদ্যোগ নিয়ে দুই লাখ টাকা মূলধন নিয়ে একশ মটকায় চ্যাপা তৈরি শুরু করি। বর্তমানে আমার এখানে দেড় হাজার মটকায় সব ধরনের চ্যাপা তৈরি করা হচ্ছে। আমি অন্তত ৩৫ বছর ধরে এই কাজ করে আসছি; যা বছরব্যাপী সারা দেশে পাইকারি বিক্রি করা হয় এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা পাইকারি কিনে নিয়ে যায়। তিনি জানান, বর্তমানে এই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অংশীদার রয়েছে তার ভাই জামাল উদ্দিন।
ইউপি সদস্য আজিজুল হক বলেন, জহুর আলী একজন সফল উদ্যোক্তা। তার এই উদ্যোগের মাধ্যমে নিজের ভাগ্যবদলের পাশাপাশি এলাকার বেকার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তার এই সফলতায় অন্যরাও আত্মকর্মশীল হতে উৎসাহিত হচ্ছেন।