বিষখালীর বিষে ভাঙনে বেদনার গল্প
শফিকুল ইসলাম খোকন
প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:৪৫ পিএম
নদীভাঙনে ভূমিহীন বিষখালী নদীসংলগ্ন জিনতলা গ্রামের বাসিন্দারা
বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোর মধ্যে অন্যতম বিষখালী। এ নদী যেমন জীবিকার অন্যতম ভান্ডার ও যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম, তেমনি প্রতি বছর নদীভাঙনের মাধ্যমে অসংখ্য মানুষকে ভূমিহীন করে দিচ্ছে। নদীতীরবর্তী এলাকাগুলোয় বসবাসকারী মানুষের জন্য এটি এক দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে।
বিষখালী নদীর তীরে অবস্থিত অনেক গ্রাম ইতোমধ্যেই আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে পানির স্রোত ও জোয়ারের কারণে ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় উপকূলীয় অঞ্চলে জলোচ্ছ্বাসের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় নদীভাঙন বৃদ্ধিসহ লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ছে। ঘন ঘন জলোচ্ছ্বাসের ফলে নদীভাঙনের সঙ্গে সঙ্গে উপকূল রাকবজ বেড়িবাঁধও ভেঙে যাচ্ছে। স্থানীয়দের মতে, কয়েক বছরের ব্যবধানে অনেক পরিবার তাদের বসতভিটা ও কৃষিজমি হারিয়েছে। ফলে তারা দ্রত ভূমিহীন হয়ে পড়ছে। বিষখালী নদীর তীরবর্তী বাসিন্দাদের এমন চিত্র প্রতিদিনের। আন্তর্জাতিক নদী দিবস উপলক্ষে বসতভিটাবিলীন হওয়া কয়েকজন বাসিন্দা জানান বিষখালীর বিষে ভাঙনের বেদনার গল্প।
বিষখালী নদীসংলগ্ন জিনতলা গ্রাম। বর্তমানে যেখানে গ্রাম অবস্থিত, এটি একটি পুরো গ্রামের একটি খণ্ডমাত্র। ভাঙতে ভাঙতে নদীগর্ভে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। প্রতিদিন একটি সময় এই জিনতলা বটতলা গাছের শিকড়ে বসে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকে হেমায়েত হোসেন (৬৫)। বাপ-দাদার বসতবাড়ি যেন এখন তার কাছে ইতিহাস।
কেমন আছেন জিজ্ঞেস করতেই বলে উঠলেন- ‘বাবারে এডা মোগো কপাল, কেমন আর আছি। মোগো কপাল ভাঙার, ভাঙতে ভাঙতে যায়।’ তিনি বলেন, এইতো কয়েক বছর আগেও বাবার বসতবাড়ি ছিল ওইখানে...। আমার এই বয়সে চারবার বেড়িবাঁধ (ওয়াপদা) দেখছি। ৪টি বেড়িবাঁধ বিষখালী নদীতে ডুইব্যা গ্যাছে। দেখলে মনে হবে ৫০ বছর আগে ভাইঙ্গা গ্যাছে। কোনো ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন কি না- এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘আরে বাবা আগেই কইছি ওডা মোগো কপাল; নদীতে গ্যাছে জমি বসতবাড়ি। কিন্তু ক্ষতিপূরণ পাই নাই। এহন কোনো রকম খাসজমিতে থাহি।’
একসময়ে জমিদার, আজ ভূমিহীন
‘সকালবেলার রাজা, সন্ধ্যাবেলার ফকির’ বহুল প্রচলিত বাংলা প্রবাদের সঙ্গে উপকূলীয় উপজেলা পাথরঘাটার বিষখালী নদীসংলগ্ন বাসিন্দাদের মিল রয়েছে। জীবনের আকস্মিক পরিবর্তন বা চরম অনিশ্চয়তা নিয়েই বসবাস করছেন এখানকার বাসিন্দারা। ৫২ বছরের মো. শাহিন। একসময় জমিদার ছিলেন এখন ভূমিহীন। অবিশ্বাস হলেও সত্যি। এখানে এমন চিত্র প্রায় পরিবারের। কথা হয় মো. শাহিনের সঙ্গে। বাপ-দাদার জমিদারের কথা এখনও ভুলেননি তিনি। এই দীর্ঘঃশ্বাস নিয়েই দিন কাটে তার। তিনি বলেন, একসময় গোয়াল ভরা গরু ছিল, উঠান ভরা ধান। ৩০ থেকে ৩৫ জন ছিল চাষি। যারা জমি চাষাবাদ করতেন। একসময় দাদার জমিদারি বাবাও পেয়েছিলেন। সে হিসেবে এলাকায় জমিদার বলেই ডাকতেন। সব জমি বিষখালী নদীতে চলে গেছে। বাপের যা ছিল তা যদি এখনও থাকত আমরা এখনও জমিদারই থাকতাম। একসময়ে জমিদার আইজ ভূমিহীন হয়ে গেলাম; নিয়তি বড়ই নিষ্ঠুর।
সিডরে নিমিষেই চলে যায় ঘরবাড়ি
রফিকুল ইসলাম, বয়স ৪৯ বছর। সিডরের সেই কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সন্ধ্যার দিকে যখন ১০ নম্বর বিপদসংকেত তখনও বাবা-মা ঘর ছেড়ে যাননি। আমাদের পাশেই আশ্রয়কেন্দ্রে রেখে বাবা মাকে নিয়েই বসতঘরে থাকেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই সিডরের আঘাত হানে। তখনও বুঝতে পারিনি বাইরে কী অবস্থা। সকাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আশ্রয়কেন্দ্র থেকে যখন নেমে পড়লাম, তখন দেখলাম ধ্বংসযজ্ঞ। বেড়িবাঁধের বাইরে এবং ভেতরে মানুষের মরদেহ, ঘরবড়ি গাছপালা বিধ্বস্ত। বাবা-মাকে রেখে যাওয়া বাড়িতে এসে দেখি ঘরবাড়ির কোনো চিহ্ন নেই। সব নদীতে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। বাবা-মাকে খুঁজতে বের হলাম। কয়েক ঘণ্টা পর পাশের একটি বাড়ির মধ্যে ঝোপঝাড়ে পাই তাদের।

রফিকুল আরও বলেন, সিডর থেকেই আমরা খুব কষ্টে দিনযাপন করছি। বেড়িবাঁধের ভেতরে বাবার রেখে যাওয়া এক খণ্ড জমিতে বসবাস করছি। কৃষি জমিজমা নেই। বিষখালী নদীতে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করি।
‘জমিজমা আর বসতভিটা তো নদীতে হারাইয়া হালাইছি। হে কথা কইয়া আর কী করমু; সিডরের পরদিন পাইছি কয়েকখান টিন’- এমন কথা বললেন বিষখালী নদীর বিষে ভাঙনের ভূমিহীন হওয়া সোহরাব হোসেন ও বেলায়েত হোসেন। দুজনে সেই দুঃসহ স্মৃতির কথা তুলে ধরে বলেন, সিডরের বন্যা যখন শুরু হয় তখন ঘরের সবাই আশ্রয়কেন্দ্রে যাই। পরদিন সকালে আইয়া দেহি ঘর, পোতা (ঘরের মাটি) সবকিছুই নদীতে ভাসাইয়া নিয়া গেছে। পাইছি কয়েকখান টিন।
তারা আরও বলেন, যে কখান টিন পাইছি তা দিয়া ওয়াপদার ওপরে ছাপরা দিয়া থাকছি কয়েক বছর। এখনও ওয়াপদার পাড়ে মাইয়া পোলা নিয়া থাহি।
নদীতেই উপকূল মানুষের বসবাস, নদীতেই তাদের জীবিকা। জীবিকার জন্য নদীর ওপর ভরসা থাকে তাদের। ভাঙাগড়ার খেলা জেনেও বসবাস করতে হচ্ছে উপকূলবাসীর। প্রতি বছর কমবেশি জমিজমা, বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। অনেক পরিবার ভূমিহীন হয়ে পড়ে।
কোনো বসতঘর যদি বন্যায় ভেঙে যায় অথবা আগুনে পুড়ে যায়, তখন সরকার থেকে প্রণোদনা বা ক্ষতিপূরণ পায়, কিন্তু উপকূলের নদীভাঙনে যারা ভিটেমাটি হারায়, তারা কোনো ক্ষতিপূরণ পায় না। এজন্য সুদূরপ্রসারী টেকসই পরিকল্পনা করে উপকূল রক্ষার জন্য টেকসই বেড়িবাঁধ, টেকসই বনায়ন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের টেকসই পুনর্বাসন করা দরকার। সেক্ষেত্রে শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়, স্থানীয় পর্যায়ের বাস্তবতার প্রেক্ষিতে চাহিদা অনুযায়ী সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
স্মৃতি আর অপেক্ষার পালা
বিষখালী নদীসংলগ্ন যারা এখনও নদীর পাশে থাকেন, একমাত্র নদীর পাশেই বসবাস তাদের। তাদের জীবন এক ধরনের অপেক্ষা কখন আবার ভাঙন শুরু হবে। স্থানীয়রা বলেন, ‘এই নদী আমাদের সব দিয়েছে, এই নদী দিয়েই আমাদের জীবনযাপন; আবার এই নদীই সব নিয়ে গেছে। তবু তারা নদী ছাড়ে না। কারণ নদী মানে মাছ, নদী মানে পথ, নদী মানে জন্মভূমি, নদীই হলো জীবন-জীবিকা।
বিষখালী নদীর তীরে যারা ভূমিহীন হয়ে গেছে, তাদের গল্প শুধু দুঃখের নয়, এটি সংগ্রাম ও বেঁচে থাকার গল্পও। প্রতিটি ভাঙা ঘরের পেছনে আছে একটি পরিবার, একটি ইতিহাস এবং নতুন করে বাঁচার চেষ্টা, স্মৃতি আর দীর্ঘ অপেক্ষা।