× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বৈশাখের বিকেল বেলায় তোমায় নিয়ে বকুলতলায়…

সাদিয়া সিদ্দিকা

প্রকাশ : ০৭ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:৩২ পিএম

বৈশাখের পোশাক  ছবি- বিশ্বরঙ

বৈশাখের পোশাক ছবি- বিশ্বরঙ

পহেলা বৈশাখ মানেই তপ্ত রোদে কৃষ্ণচূড়ার লাল হাসি, রমনার বটমূলের সুরেলা মূর্ছনা আর বাঙালির নতুন করে জেগে ওঠার গান। বাঙালির এই প্রাণের উৎসব শুধু আনুষ্ঠানিক আয়োজনেই সীমাবদ্ধ নেই; এর একটি বিরাট অংশজুড়ে থাকে পোশাক, সাজগোজ আর আত্মপরিচয়ের প্রকাশ। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আমরা যখন প্রযুক্তির শিখর ছুঁতে চাইছি, তখন আমাদের বৈশাখী ফ্যাশনে এসেছে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। এটি এমন এক সন্ধিক্ষণ, যেখানে আদিম তাঁতের স্পর্শ আর আধুনিক ফিউশন ডিজাইন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।

ঐতিহ্যের নতুন অভিপ্রকাশ হিসেবে এবারের বৈশাখী ক্যানভাস

বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ, আর সেই পার্বণের মুকুটহীন সম্রাট হলো পহেলা বৈশাখ। আগেকার দিনে বৈশাখ মানেই ছিল কেবল লাল-সাদা শাড়ি আর পাঞ্জাবি। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে ২০২৬ সালের এই বৈশাখে আমরা দেখছি রঙের এক বিশাল বিচ্ছুরণ। লাল-সাদাকে মূল ভিত্তি বা ‘বেস’ ধরে এখন কালার প্যালেটে যুক্ত হয়েছে উজ্জ্বল কমলা ও বাসন্তী, যা সূর্যের তেজ ও তারুণ্যের প্রতীক। কচি কলাপাতা সবুজ, যা নতুন প্রাণের স্পন্দন তুলে ধরে। নীল ও ফিরোজা, যা তীব্র গরমেও চোখের প্রশান্তি জোগায়। এই বৈচিত্র্যময় রঙের ব্যবহার জানান দিচ্ছে যে, ২০২৬-এর বাঙালি এখন অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী এবং নিরীক্ষাধর্মী।

জামদানি ও মসলিনের প্রত্যাবর্তন

২০২৬ সালে ফ্যাশনসচেতনদের প্রথম পছন্দ হিসেবে নিজের সিংহাসন ধরে রেখেছে ঢাকাই জামদানি। তবে এবারের বিশেষত্ব হলো এর মোটিফে। গতানুগতিক নকশার গণ্ডি পেরিয়ে তাঁতীরা এখন জিওমেট্রিক ও ফ্লোরাল মোটিফের এক চমৎকার সংমিশ্রণ ঘটাচ্ছেন।

অন্যদিকে মসলিন এখন আর কেবল ইতিহাসের পাতায় বা জাদুঘরের কাচের আড়ালে নয়। রিভাইভাল বা পুনর্জাগরণ প্রকল্পের আওতায় মসলিনের যে জয়যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা ২০২৬-এর বৈশাখে পূর্ণতা পেয়েছে। অতি সূক্ষ্ম সুতায় হাতে বোনা এই শাড়িগুলো এখন আভিজাত্যের অন্য নাম। গরমের দিনে বাতাসের মতো হালকা মসলিন পরে উৎসবে মেতে ওঠা এখন আভিজাত্য ও আরামের এক অনন্য মেলবন্ধন।

খাদি ও তাঁতের জয়গান

বর্তমান বিশ্বে সাসটেইনেবল ফ্যাশন বা পরিবেশবান্ধব পোশাকের যে জোয়ার বইছে, তার পূর্ণ প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে এবারের বৈশাখে।

আধুনিক খাদি : কুমিল্লার খাদি এখন আর সেই মোটা বা খসখসে কাপড়ের গণ্ডিতে নেই। আধুনিক প্রযুক্তিতে সুতা কাটার ফলে একে অনেক বেশি মসৃণ ও মোলায়েম করা হয়েছে।

কেন খাদি ও তাঁত? 

তীব্র গরমে ঘাম শুষে নেওয়ার অনন্য ক্ষমতার কারণে তরুণ প্রজন্মের কাছে খাদি ও সুতি তাঁতের পাঞ্জাবি এবং কুর্তি এখন হট ফেভারিট। এটি কেবল ফ্যাশন নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে প্রকৃতির সাথে একাত্ম হওয়ার একটি মাধ্যম।

নারী ফ্যাশনে শাড়ি থেকে ফিউশন কুর্তি

মেয়েদের বৈশাখী সাজে শাড়ি সব সময়ই অনবদ্য। তবে ২০২৬-এর ট্রেন্ড বলছে, শুধু শাড়ি নয়, আরামদায়ক কামিজ এবং ফিউশনধর্মী পোশাকের কদর বেড়েছে কয়েক গুণ।

শাড়ির নতুনত্ব ও ড্র্যাপিং স্টাইল

সাধারণ এক প্যাঁচে শাড়ি পরার চিরাচরিত রীতির বদলে এখন ধুতি স্টাইল বা কোমরে শৌখিন বেল্ট দিয়ে শাড়ি পরার চল অনেক বেশি। বিশেষ করে যারা সারাদিন মেলায় ঘুরবেন বা শোভাযাত্রায় অংশ নেবেন, তারা আরামের কথা মাথায় রেখে লিনেন বা তসর সিল্ক বেছে নিচ্ছেন।

হ্যান্ডব্লক ও এমব্রয়ডারি

এবারের বৈশাখে যান্ত্রিক স্ক্রিন প্রিন্টের চেয়ে ব্লকের কাজ এবং নিখুঁত হাতের কাজের (নকশি কাঁথা স্টিচ) চাহিদা তুঙ্গে। কামিজ বা কুর্তির গলায় এবং হাতায় ভারী এমব্রয়ডারি করে একটি ট্রেডিশনাল অথচ মডার্ন লুক ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে।

বাংলা নতুন বছরকে উন্মুক্ত চিত্তে স্বাগত জানাতে এবং বাঙালির জীবনে নতুন বছরের আনন্দকে আরও রাঙিয়ে দিতে দেশের অন্যতম ফ্যাশন ব্রান্ড বিশ্বরঙ-এর রয়েছে বিশেষ প্রয়াস। 

প্রখ্যাত ফ্যাশন ডিজাইনার ও বিশ্বর-এর কর্নধার ‘বিপ্লব সাহা’ বলেন, বাংলার মাটির তৈরি টেপা পুতুল শুধু একটি খেলনা নয়; এটি আমাদের গ্রামীণ শিল্প, সরল জীবনধারা এবং লোকসংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতীক। সেই ঐতিহ্যের রূপ, রঙ ও ভাবনাকে আধুনিক ফ্যাশনের ভাষায় তুলে ধরতেই বিশ্বরঙ-এর এবারের বিশেষ আয়োজন। পোশাকগুলোর নকশায় থাকছে প্রকৃতির স্বাভাবিক রঙের ব্যবহার— মাটির লাল, পাতা সবুজ, আকাশী নীল এবং ফুলের কোমল আভা। কাপড়ের বুনন, মোটিফ ও অলংকরণে প্রতিফলিত হবে টেপা পুতুলের সরলতা, লোকজ নকশা এবং বাংলার প্রকৃতির সৌন্দর্য।

তিনি আরও বলেন, বিশ্বরঙ-এর এই আয়োজনের উদ্দেশ্য কেবল নতুন পোশাক উপস্থাপন নয়; বরং বাংলার হারিয়ে যেতে বসা লোকশিল্পকে নতুন প্রজন্মের কাছে নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। বৈশাখের উৎসবমুখর আবহে প্রকৃতি, ঐতিহ্য এবং সমকালীন ফ্যাশনের এক সৃজনশীল মিলন ঘটিয়ে নিজস্ব সৃষ্টিশীলতাকে আমাদের নাগরিক জীবনে পৌঁছে দেওয়ার অভিপ্রায় মাত্র। 

বিশ্বরঙ-এর এবারের বৈশাখের পোশাকে কাজের মাধ্যম হিসেবে রয়েছে স্ক্রিন প্রিন্ট, ব্লক প্রিন্ট, ইন্ডান্ট্রিয়াল প্রিন্ট, মেশিন এমব্রয়ডারি, কম্পিউটার এমব্রয়ডারি, হ্যান্ড এমব্রয়ডারি, কারচুপি, নকশিকাঁথা জারদৌসীসহ মিশ্র মাধ্যমের নিজস্ব বিভিন্ন কৌশল।

অ্যাক্সেসরিজ বা গয়না

মাটির গয়নার সেই চিরাচরিত আবেদন এখনও অমলিন। তবে ২০২৬-এ নতুন যোগ হয়েছে তামা ও পিতলের গয়না, যা আভিজাত্য বাড়ায়।

কাপড়ের গয়না : স্ক্র্যাপ ফেব্রিক দিয়ে তৈরি কানের দুল বা মালা এখন পরিবেশসচেতন ফ্যাশনিস্তাদের পছন্দ।

নোলক ও ঝুমকো : বড় একটা নোলক বা অক্সিডাইজড ঝুমকো আপনার সাজে যোগ করতে পারে একটি রাজকীয় পূর্ণতা।

পুরুষ ফ্যাশন : পাঞ্জাবিতে মোটিফের বৈচিত্র্য

বাঙালি পুরুষ মানেই উৎসবে পাঞ্জাবি। তবে ২০২৬-এর বৈশাখী পাঞ্জাবিতে ডিজাইনের ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে।

হাফ পাঞ্জাবি ও ফতুয়ার দাপট : রোদের তীব্রতা বিবেচনা করে অনেক ফ্যাশন হাউস এবার হাফ হাতা পাঞ্জাবি বা শর্ট কুর্তা বাজারে এনেছে। এতে বৈশাখী মোটিফের পাশাপাশি ডিজিটাল প্রিন্টের সূক্ষ্ম ছোঁয়াও থাকছে।

টাই-ডাই ও বাটিক : একরঙা পাঞ্জাবির দিন ফুরিয়ে আসছে। টাই-ডাই এবং মোমের বাটিকের পাঞ্জাবি এখন ট্রেন্ডের শীর্ষে। বিশেষ করে নীল ও হলুদের সংমিশ্রণে তৈরি ডিজাইনগুলো নবীনদের বেশ আকর্ষণ করছে।

জুতো ও আনুষঙ্গিক : পাঞ্জাবির সাথে এখন আর শুধু সাধারণ চটি নয়; ল্যাকার পলিশ করা নাগরা বা কোলহাপুরি স্যান্ডেল এখন বাধ্যতামূলক স্টাইল স্টেটমেন্ট। কবজিতে একটি কাঠের মালা বা অ্যান্টিক ফিনিশ ঘড়ি থাকলে সাজটা আক্ষরিক অর্থেই পূর্ণতা পায়।

শিশু ও কিশোরদের সাজ : রঙের আনন্দ উৎসব

বৈশাখের আনন্দ সবচেয়ে বেশি নির্মল হয় শিশুদের জন্য। তাদের পোশাকে ২০২৬-এর মূল মন্ত্র, আরাম সবার আগে।

শিশুদের পোশাকে লোকজ মোটিফ যেমন হাতি, ঘোড়া, পালকি বা শখের হাঁড়ির ছবি ব্যবহার করে এক টুকরো গ্রাম্য মেলাকে তুলে ধরা হয়েছে।

মেকআপ ও কেশসজ্জা

২০২৬ সালের বিউটি ট্রেন্ড হলো নো মেকআপ মেকআপ লুক। তীব্র গরমে ভারী মেকআপ ত্বকের জন্য যেমন ক্ষতিকর, তেমনি দেখতেও বেমানান।

সাজ : হালকা ফাউন্ডেশন বা বিবি ক্রিম, চোখে গাঢ় কাজল আর কপালে একটি বড় লাল টিপ এটাই বৈশাখের সিগনেচার সাজ।

চুল : গরমে আরাম পেতে মেয়েরা এখন হাতখোঁপা বা বেণীই বেশি পছন্দ করছেন। আর সেই খোঁপায় যদি থাকে একগুচ্ছ সাদা বেলী ফুল বা উজ্জ্বল গাঁদা ফুলের মালা, তবে তার চেয়ে সুন্দর আর কিছু হতে পারে না।

কেনাকাটার নতুন মাধ্যম : এআই ও ভার্চুয়াল রিয়ালিটি

২০২৬ সালে ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে প্রবলভাবে। এখন আর কেবল যানজট ঠেলে শোরুমে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ছে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে গ্রাহকরা বাড়িতে বসেই ভার্চুয়াল ট্রাই-অন ফিচারের মাধ্যমে নিজের ছবির ওপর বসিয়ে দেখে নিচ্ছেন কোন রঙের শাড়ি বা পাঞ্জাবি তাদের বেশি মানাচ্ছে। এই ডিজিটাল বিপ্লব সময় সাশ্রয়ের পাশাপাশি সঠিক পোশাক নির্বাচনের সুযোগ বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ।

শিকড়ের টানে নতুনের আবাহন

ফ্যাশন মানে কেবল দামি পোশাক বা ঝকঝকে সাজগোজ নয়; ফ্যাশন হলো নিজের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতিফলন। পহেলা বৈশাখ আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়Ñ আমরা কে, আমাদের শিকড় কোথায়। ২০২৬-এর এই নতুন ভোরে আমরা যখন নতুন পোশাকে উৎসবে শামিল হব, তখন যেন আমাদের হৃদয়ে থাকে দেশি পণ্যের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা।

আমাদের তাঁতীদের নিপুণ হাতে বোনা প্রতিটি সুতা আসলে এক একটি গল্প। একটি শাড়ি বা একটি পাঞ্জাবি কেবল একটি বস্ত্র নয়, এটি আমাদের কয়েক হাজার বছরের শিল্পের জীবন্ত দলিল। ঐতিহ্যের এই ধারাকে আধুনিকতার রঙে রাঙিয়ে আমরা এগিয়ে যাব আরও বহুদূর। আর এটাই যেন হোক ২০২৬ সালের পহেলা বৈশাখের অঙ্গীকার।


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা