তাছলিম সিদ্দিকী
প্রকাশ : ০৫ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:৪০ পিএম
আমাদের চারপাশের পৃথিবীকে স্পর্শযোগ্য করে তুলছে ভার্চুয়াল রিয়ালিটি বা ভিআর এবং তার বিস্তৃত রূপ মেটাভার্স
বর্তমান ডিজিটাল যুগে প্রযুক্তি শুধু আমাদের সুবিধা বাড়াচ্ছে না, বরং বাস্তবতার ধারণাকেই পাল্টে দিচ্ছে। ভার্চুয়াল রিয়ালিটি বা ভিআর এবং তার বিস্তৃত রূপ মেটাভার্স এমনই দুটি প্রযুক্তি, যা আমাদের চারপাশের পৃথিবীকে স্পর্শযোগ্য করে তুলছে।
ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (ভিআর) হলো কম্পিউটার প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি ত্রিমাত্রিক (থ্রি-ডি) কৃত্রিম জগত, যেখানে হেডসেট ব্যবহার করে ব্যবহারকারী নিজেকে বাস্তব জগতের পরিবর্তে একটি ভার্চুয়াল পরিবেশে অনুভব করেন। অন্যদিকে, মেটাভার্স হলো ইন্টারনেটের পরবর্তী সংস্করণ- একটি সর্বজনীন, পারস্পরিক সংযুক্ত ভার্চুয়াল জগত যেখানে ভিআর, এআর এবং ব্লকেটচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানুষ অবতারের মাধ্যমে কাজ, আড্ডা ও কেনাকাটা করতে পারে।
চোখের সামনে একটা হেডসেট লাগিয়ে আমরা এখন যেকোনো জায়গায় চলে যেতে পারি পিরামিডের ভেতরে, মহাকাশে বা এমনকি নিজের স্বপ্নের শহরে। এটি আর শুধু বিনোদনের খেলা নয়, বরং শিক্ষা, চিকিৎসা এবং সমাজের নতুন দিগন্ত খুলে দিচ্ছে। ভিআর কীভাবে কাজ করে? মূলত এটি একটি চোখ-ভোলানো মায়া। একটি বিশেষ হেডসেটে দুটি উচ্চ-রেজোলিউশনের ছোট ডিসপ্লে থাকে, যা দুই চোখের সামনে আলাদা আলাদা ছবি তৈরি করে। এতে মস্তিষ্ক স্বাভাবিকভাবে ত্রিমাত্রিক (থ্রি-ডি) দৃশ্য অনুভব করে। হেডসেটের ভেতরে জাইরোস্কোপ, অ্যাক্সিলারোমিটার এবং ক্যামেরার মতো সেন্সরগুলো মাথার সামান্যতম নড়াচড়াও ধরে ফেলে। ফলে যখন আমরা মাথা ঘোরাই, ভার্চুয়াল দুনিয়াটাও সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে যায়। হ্যান্ড কন্ট্রোলার বা গ্লাভসের মাধ্যমে হাতের নড়াচড়া ধরা হয় এবং কখনও কখনও হ্যাপটিক ফিডব্যাক দিয়ে স্পর্শের অনুভূতি তৈরি করা হয়। পেছনে একটি শক্তিশালী কম্পিউটার বা কনসোল গ্রাফিক্স তৈরি করে, যা এই পুরো অভিজ্ঞতাকে বাস্তবের মতো করে তোলে। গেমিংয়ে ভিআরের জাদু সবচেয়ে বেশি উপভোগ্য।
কল্পনা করুন, আপনি একটা যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে আছেন, চারপাশে গুলির শব্দ, শত্রুর পায়ের আওয়াজ সবকিছু আপনার চারদিকে। ‘বিট সেবার’ বা ‘হাফ-লাইফ : অ্যালিক্স’-এর মতো খেলায় খেলোয়াড় আর দর্শক নয়, নিজেই চরিত্র হয়ে যায়। এতে শুধু মজা নয়, প্রতিক্রিয়া, সমন্বয় এবং মানসিক সতর্কতা বাড়ে। শিক্ষাক্ষেত্রে ভিআর এক বিপ্লব।
সার্জনরা ভার্চুয়াল অপারেশন থিয়েটারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনুশীলন করেন, যাতে আসল অপারেশনে ভুলের সম্ভাবনা কমে। মানসিক স্বাস্থ্যে ভিআর ফোবিয়া বা পোস্ট-ট্রম্যাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারের চিকিৎসায় অসাধারণ। রোগীকে নিরাপদ পরিবেশে তার ভয়ের উৎসের মুখোমুখি করা হয়, যাতে ধীরে ধীরে সে সাহস সঞ্চয় করে। এমনকি ব্যথা নিয়ন্ত্রণেও ভিআর কার্যকর রোগীকে সুন্দর ভার্চুয়াল বাগানে নিয়ে গেলে তার মস্তিষ্ক বাস্তব ব্যথার অনুভূতি কমিয়ে দেয়। এসবের চূড়ান্ত রূপ হলো মেটাভার্স। এটি শুধু ভিআর নয়, একটি স্থায়ী ভার্চুয়াল বিশ্ব। এখানে মানুষ তার অ্যাভাটার দিয়ে কাজ করে, বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা করে, কনসার্ট দেখে বা ব্যবসা চালায়। মেটাভার্সে আপনার বাড়ি, অফিস, দোকান সবকিছু থাকবে। ফেসবুকের পুনর্নামকরণ ‘মেটা’ এই ধারণাকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিয়েছে। এটি ভবিষ্যতে আমাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক জীবনকে এক করে ফেলবে। তবে এই প্রযুক্তির সঙ্গে চ্যালেঞ্জও আছে। মাথা ঘোরা, গোপনীয়তা এবং অতিরিক্ত ব্যবহারের ঝুঁকি তো রয়েছেই। তবু এ কথা সত্য, ভিআর ও মেটাভার্স আমাদের বাস্তবতাকে আরও সমৃদ্ধ, আরও সহজলভ্য করে তুলছে। হয়তো একদিন আমরা বলব, ‘বাস্তব’ আর ‘ভার্চুয়াল’-এই দুটো শব্দের মাঝে আর কোনো সীমানা নেই।