প্রিয়ব্রত চক্রবর্তী
প্রকাশ : ০২ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:২৩ পিএম
আঁকা : মেহেরুন্নিসা, অষ্টম শ্রেণি, রানী নীহার দেবী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, মানিকছড়ি, খাগড়াছড়ি
স্বরূপপুর গাঁয়ে তখন ভীষণ আতঙ্ক বিরাজ করছে। কার কখন কী হয়, ঠিক নেই। এমন দিন গেছে, যেদিন হয়তো কোনো মাঝিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। লোকে ধরে নিয়েছে নিশ্চিত পাকসেনাদের হাতে ধরা পড়েছে। এত সময় জীবনও চলে গেছে। কেউই স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ছিল না। তখন ছিল শিশুদের জন্য এক অন্যরকম যুদ্ধ, তারা হয়তো ঠিক জানেও না যে কী চলছে আশপাশে। তবু জানে নিশ্চয়ই কোনো একটা সমস্যায় সবাই খুব চিন্তিত। বন-বাদাড়ে ঘুরে বেড়ানো ছেলে-পেলেরা আজ ঘরের বাইরে যেতেও ভয় পায়। গ্রামের অদূরে মাঝে মাঝেই শোনা যায় ভারী অস্ত্রের কর্কশ আওয়াজ। মাঝে মাঝে ধোঁয়ার রেখাকে দেখা যায় আকাশে ভেসে যেতে। সবারই ভয়, কবে তাদের গ্রামে আক্রমণ হয়। এর মাঝে দূরের কোনো শহর থেকে এলো একদল মানুষ। তারা নাকি মুক্তিযোদ্ধা।
তাদের ঘিরে সবার আগ্রহ। তাদের আদর-আপ্যায়নে কেউ কোনো ত্রুটি রাখতে চায় না। তাদের মধ্যে একটা ছেলে একটু অন্যরকম।
তাকে যেন অন্যদের সাথে ঠিক মানায় না। মনে হয় বড় পরিবারের সন্তান। তবে সে এখানে কীভাবে এলো? কিছুতেই নিজের নাম-পরিচয় বলতে রাজি হলো না। ছদ্মনাম নাম বলল, তার নাম নাকি টগর।
গ্রামের চটপটে ছেলেদের সাথে শহুরে নীরব ছেলেটার তেমন ভাব হলো না। তবে একটা ছেলে বেশ আগ্রহ নিয়েই টগরের বন্ধু হতে চাইল।
ছেলেটার নাম জিতু। সে নাকি এতিম। তার সাথেও তেমন কারও ভাব নেই। তাকে সবাই খারাপ ছেলে ভাবে বলে পরিবার থেকে জিতু মিয়ার সাথে মেলামেশা করতে মানা আছে। জিতুর দিন কাটে বনে-বাদাড়ে পশুপাখির সাথে। সেদিন জিতু হাজির হলো মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে। তার দেখা হলো দলপতি রকি ভাইয়ের সাথে।
সে হঠাৎ রকি ভাইয়ের পা ধরে বসে পড়ল। তার অনুরোধ যেন তাকে মুক্তিসেনার দলে নেওয়া হয়। কিন্তু তা কীভাবে সম্ভব? জিতুর তো আর কোনো ট্রেনিং নেই, এর মধ্যে এমনিতেই দলে একটা শিশু আছে।
বাচ্চা-কাচ্চাদের নিয়ে কি যুদ্ধ করা যায়? রকি ভাইয়া কিছুতেই রাজি হলো না। টগর তেমন সাহসী না, সে ঘর পালিয়ে এসেছে দোশের টানে। কিন্তু এখন তার মনে ভয় হচ্ছে। অন্যদিকে জিতু মিয়ার গল্প পুরোপুরি ভিন্ন। তার কোনো পিছুটান নেই। সে জ্যান্ত সাপকেও ভয় পায় না। যুদ্ধে যেতে তার খুবই আগ্রহ। কয়েক দিন কেটে গেল গুপ্তচর কানু খবর দিল গ্রামের উত্তরদিকে বড় দিঘির পাড়ে নাকি পাকসেনারা ক্যাম্প খাটিয়েছে। ধীরে ধীরে এদিকেই আগাচ্ছে। এখনই কিছু করতে হবে। ঠিক হলো আজ রাতেই তারা ‘উত্তর দিঘি অপারেশন’ করবে। যুদ্ধ হবে সরাসরি। জিতু মিয়া শেষবারের মত রিক ভাইকে অনুনয়-বিনয় করেও কিছু করতে পারল না। অন্যদিকে টগরের বাড়ির কথা ভেবে মন কাঁদে।
মায়ের মুখ মনে পড়ে। টগরকে দেওয়া হয়েছে একটি ছোট পিস্তল। সেটার ঘোড়া এত্তো শক্ত, চাপতে গিয়ে আঙুল বেঁকে যায়। সে মুখ ঢেকে মাঝরাত পর্যন্ত কাঁদল। তারপর হেঁটে যাত্রা শুরু করল সবার সাথে। সে পথ যেন শেষ হয় না। অন্ধকারে পথচলা, মাঝে মাঝে ছোটখাটো আঘাত পেতে হচ্ছে। প্যান্টের পকেটে থাকা ভারী পিস্তলটা যেন কিছু বলতে চাইছে।
সেদিন যুদ্ধ হলো, সরাসরি যুদ্ধ। পাকসেনারা আগাতে পারেনি। তারা সাঁতারে তেমন পারদর্শী না। তাই একটা বড় সুবিধা হয়েছে। বিশাল দিঘির গভীর জল মুক্তিসেনাদের জন্য একটা ঢালের মতো সাহায্য করেছে। দিঘির সে স্নিগ্ধ-শান্ত জল দেখে কেউ বলতে পারবে না যে কাল রাতের অন্ধকারে এটি ছিল একটি রণক্ষেত্র। কেন যেন শেষরাতে ঝুম বৃষ্টি হলো। বোধহয় কিছু লাশের রক্ত মুছে দিতে। গ্রামের নারীরা মুখ গুঁজে কাঁদছে। যদি আমরা যুদ্ধে জিতেছি, কিন্তু সেইসব প্রাণ?
এত কোলাহলের মাঝে অবশ্য কেউ খেয়াল করেনি যে জিতু ধারেকাছে নেই।
অষ্টম শ্রেণি, নালন্দা উচ্চ বিদ্যালয়, ধানমন্ডি, ঢাকা