× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

কন্যাশিশু, অটিজম ও সমাজের ত্রিমাত্রিক বন্দিদশা

লাবণী মণ্ডল

প্রকাশ : ০১ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:৩৬ পিএম

ছবি - সুমন ইউসুফ

ছবি - সুমন ইউসুফ

আগামীকাল ২ এপ্রিল বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস। এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো অটিজম সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং তাদের সমাজে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। 

আমাদের প্রথাগত সমাজকাঠামোতে একটি শিশুর জন্ম, বেড়ে ওঠা এবং সামাজিকীকরণের প্রক্রিয়া নানা শর্তের বেড়াজালে আবদ্ধ। পরিস্থিতি চরম রূপ ধারণ করে যখন জন্ম নেওয়া শিশুটি হয় একজন কন্যা। পিতৃতান্ত্রিক মনস্তত্ত্বে কন্যাশিশু জন্মগতভাবেই কিছুটা অবমূল্যায়নের শিকার। এর ওপর গায়ের রঙ যদি সামান্য শ্যামলা বা কালো হয়, তবে পরিবারের দুশ্চিন্তার অন্ত থাকে না। কিন্তু প্রচলিত শঙ্কার এই পাহাড় চূড়ায় পৌঁছায়, যখন সেই কন্যাশিশুটির মাঝে ধরা পড়ে ‘অটিজম’ বা স্নায়ুবিকাশগত ভিন্নতা।

অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার (এএসডি) সম্পন্ন একটি কন্যাশিশু, তার গায়ের রঙ এবং সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি- এই তিনের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে একটি পরিবার প্রতিদিন যে নিঃশব্দ যুদ্ধ করে, তা যেকোনো রূপকথার রাক্ষস বধের চেয়েও কঠিন।

একটি জীবন্ত দীর্ঘশ্বাস এই নির্মম বাস্তবতার এক জ্বলন্ত উদাহরণ তিন্নি রহমান। তিনি ছিলেন ধানমন্ডির একটি বেসরকারি কলেজের শিক্ষক। দুজন ছেলে সন্তানের পর তার কোলজুড়ে আসে একটি কন্যাশিশু। বহুল কাঙ্ক্ষিত এই শিশুর আগমনে পরিবারটি আনন্দে উদ্বেলিত হয়েছিল। আদর করে নাম রাখা হয় ‘মাইশা আদর’। কিন্তু সেই আনন্দ ফিকে হতে শুরু করে মাত্র ছয় মাস বয়স থেকেই।

তিন্নি খেয়াল করেন, মাইশার শ্রবণশক্তি কম। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটি আরও কমতে থাকে। শুধু তাই নয়, সমবয়সী অন্য শিশুদের মতো সে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠছিল না। চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে জানা যায়, মাইশা অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। চিকিৎসকের মতে, ‘ওর বিকাশ অত্যন্ত ধীর। থেরাপি ও সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে ধীরে ধীরে উন্নতি হবে ঠিকই, তবে সে অন্য শিশুদের মতো পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে না।’

মাইশার বয়স এখন সাত বছর, কিন্তু তার মানসিক বিকাশ আটকে আছে তিন বছরের এক শিশুর স্তরে। কন্যাশিশু, তার ওপর অটিজম- সমাজের এই অলিখিত নিয়মে সমস্ত দায় এসে পড়ে মা তিন্নির ওপর। সমাজ অবলীলায় কাঠগড়ায় দাঁড় করায় তাকে। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিন্নি জানান, ‘আমার জীবনটা দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে। মাইশার বয়স এখন সাত বছর, কিন্তু এই সাত বছরে আমি সাত দিনও ভালো থাকিনি।’

বর্ণবাদ ও পিতৃতন্ত্রের যূপকাষ্ঠে মা ও শিশু। তিন্নির মতো হাজারো মায়ের এই আর্তনাদ আমাদের সমাজের এক রূঢ় প্রতিচ্ছবি। আমাদের সমাজে নারীর বাহ্যিক সৌন্দর্যকে এক ধরনের ‘সামাজিক পুঁজি’ হিসেবে দেখা হয়। পিতৃতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে কন্যা সন্তানকে সাধারণত ‘পরের বাড়ির সম্পদ’ মনে করা হয়, যার চূড়ান্ত পরিণতি বিয়ে। কিন্তু অটিজমের কারণে যখন সেই বিয়ের সম্ভাবনাটি তিরোহিত হয়, তখন সমাজ এবং অনেক ক্ষেত্রে পরিবারও সেই কন্যাকে চিরস্থায়ী অর্থনৈতিক ও সামাজিক বোঝা হিসেবে ভাবতে শুরু করে। লোকলজ্জার ভয়ে অনেক পরিবার সন্তানকে লোকচক্ষুর অন্তরালে গৃহবন্দি করে রাখে।

রক্ষণশীল সমাজে এই বঞ্চনার সম্পূর্ণ কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন শিশুটির মা। বিজ্ঞানভিত্তিক কারণ বোঝার মানসিকতা সমাজের অনেকের নেই। কুসংস্কারের বশবর্তী হয়ে অনেকেই একে ‘মায়ের পূর্বজন্মের পাপ’, ‘কর্মফল’ বা ‘জ্বীন-ভূতের আছর’ বলে আখ্যায়িত করেন। ইপনার (IPNA) এক গবেষণায় দেখা গেছে, অটিস্টিক শিশুর মায়েদের প্রায় ৪৫ শতাংশ তীব্র বিষণ্নতায় ভোগেন, যেখানে সাধারণ নারীদের মধ্যে এই হার মাত্র ৬.৭ শতাংশ। তিন্নির মতো অনেক কর্মজীবী মাকেই সন্তানের জন্য পেশাগত জীবন বিসর্জন দিতে হয়, যা তাদের শারীরিক ও মানসিক পঙ্গুত্বের দিকে ঠেলে দেয়।

অটিজম কী এবং কেন হয়

চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন কুমুদিনী উইমেন্স মেডিকেল কলেজের প্রসূতিবিদ্যা ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বিলকিস বেগম চৌধুরী। তিনি জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী অটিজমে আক্রান্ত শিশুর জন্মহার প্রায় ১ শতাংশ।

ডা. বিলকিস বেগমের মতে, ‘অটিজম হলো মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষসমূহের বিকাশজনিত অসুস্থতা। জন্মের পর আপাতদৃষ্টিতে শিশুকে সুস্থ মনে হলেও, সাধারণত ১৮ মাস থেকে ৩ বছর বয়সের মধ্যে লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়।’ স্বাভাবিক শিশু যেখানে চার মাসে মানুষের মুখ চেনে এবং নয় মাসে ‘বাবা-মা’ বলতে পারে, সেখানে অটিস্টিক শিশুর মাইলস্টোনগুলো দেরিতে আসে বা অসম্পূর্ণ থাকে। এরা চোখের দিকে তাকিয়ে সাড়া দিতে পারে না, একই কাজ বারবার করে এবং প্রচণ্ড অস্থির প্রকৃতির হয়।

অনেকেই মায়ের দিকে আঙুল তুললেও, চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা। অটিজমের সুনির্দিষ্ট একটি কারণ নেই, এটি জিনগত বা পরিবেশগত কারণে হতে পারে। মা-বাবা উভয়ের বেশি বয়স, গর্ভকালীন মায়ের বিশেষ কোনো ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া, ভেজাল খাদ্য গ্রহণ, বায়ুদূষণ বা অপরিণত বয়সে (৩৮ সপ্তাহের আগে) জন্ম নেওয়া এর অন্যতম কারণ হতে পারে।

পিতা-মাতার চরম আতঙ্ক 

অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন কন্যা সন্তানের পিতা-মাতার সবচেয়ে ভয়াবহ আতঙ্কের জায়গা হলো ভুক্তভোগীর ভবিষ্যৎ ও নিরাপত্তা। কন্যাশিশুটি যখন বয়ঃসন্ধিতে পদার্পণ করে, এই দুশ্চিন্তা বহুগুণ বেড়ে যায়। ঋতুস্রাবের মতো স্বাভাবিক শারীরিক প্রক্রিয়াগুলো সামলানো স্নায়বিক অতি-সংবেদনশীল শিশুদের জন্য অত্যন্ত কঠিন। স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারে তারা চরম অস্বস্তি বোধ করে।

অধ্যাপক ডা. বিলকিস বেগম চৌধুরী একটি ভয়াবহ বাস্তবতার কথা তুলে ধরে বলেন, ‘এসব শিশু ব্যক্তিগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা রক্ষায় অসমর্থ থাকে। তারা নারীত্বের লক্ষণগুলো বোঝে না। ফলে তাদের যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের ঝুঁকি ক্রমশ বাড়তে থাকে।’ তারা ‘গুড টাচ’ ও ‘ব্যাড টাচ’-এর পার্থক্য বোঝে না এবং নির্যাতিত হলেও তা প্রকাশ করতে পারে না।

এই চরম নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক মা-বাবা নিরুপায় হয়ে কিশোরী কন্যার জরায়ু কেটে ফেলার মতো অমানবিক ও কষ্টদায়ক সিদ্ধান্ত নেন। জরায়ুবিহীন কিশোরী তখন হরমোনজনিত নানা অসুস্থতায় ভোগে। অথচ জরায়ু ফেলে দিলেই সে যৌন নিপীড়নের ঝুঁকি থেকে মুক্ত হয় না, বরং তার আজীবন একটি নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয়ের প্রয়োজন হয়। এখানেই চলে আসে পিতা-মাতার সবচেয়ে বড় ভয়Ñ ‘আফটার আস’ ভীতি। ‘আমরা যখন থাকব না, তখন ওর কী হবে?’Ñ এই প্রশ্ন প্রতিটি মুহূর্ত তাদের কুরে কুরে খায়।

করণীয় 

সীমাবদ্ধতার দেয়াল ও উত্তরণের পথ অটিজম নিরাময়ের জাদুকরি কোনো ওষুধ নেই। তবে ডা. বিলকিস বেগম পরামর্শ দেন, গর্ভধারণের পূর্বে দম্পতির প্রি-প্রেগনেন্সি কাউন্সেলিং, সঠিক বয়সে সন্তান নেওয়া এবং গর্ভকালে চিকিৎসকের নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকা জরুরি।

জন্মের পর প্রয়োজন সঠিক সময়ে শনাক্তকরণ এবং স্পিচ, অকুপেশনাল ও বিহেভিয়ারাল থেরাপি। কিন্তু ঢাকাকেন্দ্রিক কিছু প্রতিষ্ঠান ছাড়া প্রান্তিক পর্যায়ে এই সুবিধা চরম অপ্রতুল। সাধারণ স্কুলগুলোতে ‘একীভূত শিক্ষা’ বা ইনক্লুসিভ এডুকেশনের কথা বলা হলেও, শিক্ষকরা প্রশিক্ষিত নন এবং সহপাঠীদের বুলিংয়ের ভয়ে অনেকেই স্কুল ছাড়ে।

বাংলাদেশ সরকার আইন প্রণয়ন, ট্রাস্ট গঠন এবং হেল্পলাইন ১০৯৮-এর মতো কিছু উদ্যোগ নিলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য। এই পাহাড়সম মনস্তাত্ত্বিক চাপ দূর করতে প্রয়োজন সমাজের আমূল রূপান্তর।

শিশুদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে 

প্রথমত, মানুষের মূল্য তার গায়ের রঙ বা স্নায়বিক কাঠামোর ওপর নির্ভর করে নাÑ এই বোধ জাগ্রত করতে হবে। কন্যা সন্তান মানেই বিয়ের দায়Ñ এই পিতৃতান্ত্রিক চিন্তা থেকে বের হতে হবে। দ্বিতীয়ত, তিন্নি রহমানের মতো মায়েদের ওপর দোষ চাপানোর অমানবিক প্রথা বন্ধ করে পরিবারটির প্রতি সমাজকে সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, এবং সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো, অভিভাবকের মৃত্যুর পর এই শিশুদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিতে রাষ্ট্রকে ‘কমিউনিটি ভিত্তিক সুরক্ষা বলয়’ এবং সম্পূর্ণ আবাসিক ‘সেফ হোম’ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে সার্বক্ষণিক নারী সুরক্ষাকর্মী থাকবেন।

পৃথিবীতে কোনো শিশুই বোঝা হয়ে জন্মায় না। একটি অটিস্টিক কন্যাশিশু যখন জন্ম নেয়, সমাজ যদি তাকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, তবে তা পুরো মানবতারই ব্যর্থতা। কেবল সচেতনতা নয়, প্রয়োজন অন্তর্ভুক্তি, রাষ্ট্রীয় আইনের স্বচ্ছ বাস্তবায়ন এবং সামষ্টিক সহানুভূতি। তবেই তিন্নি রহমান ও মাইশাদের মতো পরিবারগুলো একটি বাসযোগ্য, নিরাপদ ও মানবিক সমাজের দেখা পাবে। অটিস্টিক শিশুদের বোঝা নয়, ভালোবাসার সম্পদে রূপান্তর করাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা