নুসরাত সাদিয়া মুনা
প্রকাশ : ৩১ মার্চ ২০২৬ ১৪:৪১ পিএম
পবিত্র রমজান ও ঈদুল ফিতরের দীর্ঘ অবকাশ শেষে আবারও বাজতে শুরু করেছে স্কুলের ঘণ্টা। উৎসবের আমেজ আর ছুটির অলস দিনগুলো কাটিয়ে শিশুদের জন্য পুনরায় নিয়মিত রুটিনে ফিরে আসাটা এক বড় চ্যালেঞ্জ। রমজান মাসের দীর্ঘ ছুটি শেষে যখন আবার স্কুল খোলার সময় আসে, তখন অনেক শিশুর জন্য এটি হয়ে ওঠে এক ধরনের ‘রিস্টার্ট’ মুহূর্ত। ঘুমের সময় বদলে যাওয়া, পড়াশোনার রুটিন ভেঙে যাওয়া এবং উৎসবমুখর অলস দিন সব মিলিয়ে স্কুলে ফেরাটা অনেক শিশুর কাছে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। দীর্ঘ বিরতির পর পড়াশোনার চাপে অনেক শিশুই মানসিকভাবে কিছুটা পিছিয়ে পড়ে, যাকে মনোবিজ্ঞানীরা ‘পোস্ট হলিডে ব্লুজ’ বা ছুটির পরবর্তী অবসাদ বলে থাকেন। এই সময়টিতে অভিভাবকের সচেতন ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ক্রান্তিকালে শিশুর ওপর জোরপূর্বক নিয়ম চাপিয়ে না দিয়ে বরং সহানুভূতি ও সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে তাকে স্কুলের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরিয়ে আনা জরুরি।
ছুটির পর মানসিক প্রস্তুতি
দীর্ঘ ছুটির পর হঠাৎ করে স্কুলে ফেরা অনেক শিশুর জন্য মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে। তারা আবার নিয়মের মধ্যে ঢুকতে অনিচ্ছুক হতে পারে। তাই প্রথম কাজ হলো, শিশুকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করা। স্কুল মানে কেবল পড়াশোনাই নয়, এটি একটি সামাজিক মিলনস্থল। শিশুকে স্কুলের ইতিবাচক দিকগুলো মনে করিয়ে দিন। তার প্রিয় সহপাঠী, শিক্ষক কিংবা স্কুলের খেলার মাঠের মজার স্মৃতিগুলো নিয়ে আলোচনা করুন। এতে স্কুলের প্রতি তার মনে এক ধরনের আগ্রহ বা উদ্দীপনা তৈরি হবে। গল্পের মাধ্যমে বা খেলার ছলে স্কুলের পরিবেশকে আবার পরিচিত করে তোলা খুবই কার্যকর একটি পদ্ধতি। স্কুলে থাকা মজার মজার গল্প কিংবা স্কুল থেকে পাওয়া অ্যাচিভমেন্টগুলো তাকে মনে করিয়ে দিন। ধীরে ধীরে আবার ভালো লাগতে শুরু করবে।
ঘুম ও দৈনন্দিন রুটিন ঠিক করা
রমজান মাসে সাধারণত ঘুমের সময়সূচি বদলে যায়। অনেক শিশু রোজা রাখতে না পারলেও সেহরিতে উঠে সবার সঙ্গে খায়। এতে করে দেরিতে ঘুমায় এবং দেরিতে ওঠে। কিন্তু স্কুল শুরু হওয়ার আগে থেকেই ধীরে ধীরে ঘুমের সময় আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা জরুরি। প্রতিদিন ১৫-২০ মিনিট করে এগিয়ে এনে শিশুকে আগের নির্ধারিত সময়ে ঘুমানোর অভ্যাস করান। হুট করে পরিবর্তন আনলে শিশুর মেজাজ খিটখিটে হতে পারে এবং স্কুলে মনোযোগ ব্যাহত হতে পারে। এতে শিশুর শরীর স্বাভাবিকভাবে নতুন রুটিনে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে।
পড়াশোনায় ধীরে ধীরে ফিরে আসা
স্কুল খোলার প্রথম দিন থেকেই তাকে কঠিন অঙ্ক বা বিজ্ঞানের জটিল তত্ত্বে ডুবিয়ে দেবেন না। ছুটির সময় পড়াশোনা থেকে দূরে থাকার কারণে অনেক শিশু পড়ায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। তাই স্কুল খোলার আগেই হালকা পড়াশোনা শুরু করা ভালো। বরং ছুটির আগে যা শিখেছিল, সেগুলো নিয়ে হালকা আলোচনা করুন। প্রতিদিন ৩০-৪০ মিনিটের একটি ‘ওয়ার্মআপ’ সেশন রাখতে পারেন, যা তাকে পড়াশোনার ছন্দে ফিরতে সাহায্য করবে। প্রতিদিন সময় নিয়ে পুরনো পাঠগুলো রিভিউ করান। এটি যেন চাপের মতো না লাগে, সেজন্য পড়াশোনাকে খেলাধুলা বা কুইজের মতো করে উপস্থাপন করা যেতে পারে। যেমন ‘আজ আমরা গল্পের মতো করে পড়ব’ বা ‘একটা ছোট্ট চ্যালেঞ্জ করব।’ কিংবা পাঠের সঙ্গে মিলিয়ে কিছু আঁকতে দিন। স্কুলের হোমওয়ার্ক থাকলে ধীরে ধীরে তা করতে বলুন।
একসঙ্গে স্কুলের জন্য প্রস্তুতি
স্কুলে ফেরার আগের দিন শিশুর ব্যাগ গোছানো, নতুন খাতা বা বই কভার করা, ইউনিফর্ম প্রস্তুত করাÑ এসব কাজ শিশুকে নিয়ে একসঙ্গে করুন। এতে করে সে স্কুলে ফেরার ব্যাপারে উৎসাহী হয়ে উঠবে। শিশুকে সঙ্গে নিয়ে বাবা-মাও অফিসের ব্যাগ গোছাতে পারেন। এতে করে শিশু বুঝতে পারবে ছুটির পর সবাইকেই কাজে ফিরে যেতে হয়। এ ছাড়া ছোটখাটো চমক যেমন নতুন পেনসিল, রঙিন খাতা বা লাঞ্চবক্স শিশুর মধ্যে ইতিবাচক অনুভূতি তৈরি করতে পারে।
ডিজিটাল স্ক্রিন থেকে মনোযোগ ফিরিয়ে আনা
ছুটির সময় সাধারণত শিশুদের স্ক্রিন টাইম বেড়ে যায়। মোবাইল, টিভি বা গেম সব মিলিয়ে তাদের মনোযোগ বিভ্রান্ত হয়। স্কুল খোলার আগে এই আসক্তি কমানো জরুরি। হঠাৎ করে ডিভাইস কেড়ে না নিয়ে বরং পড়ার টেবিলে বসার অভ্যাস ফেরাতে হবে। দিনে অন্তত এক ঘণ্টা কোনো সৃজনশীল কাজে যেমনÑ ছবি আঁকা, ধাঁধা মেলানো বা গল্পের বই পড়ার মাধ্যমে তাদের একাগ্রতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করুন। স্কুল শুরুর আগে থেকেই ধীরে ধীরে স্ক্রিন টাইমের পরিবর্তে বই পড়া, আঁকাআঁকি বা গল্প শোনার মতো কার্যক্রমে শিশুর মনোযোগ ও শেখার আগ্রহ বাড়বে।
বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ
অনেক শিশু ছুটির সময় বন্ধুদের থেকে দূরে থাকে। ফলে স্কুলে ফিরে তারা অস্বস্তিবোধ করতে পারে। স্কুল শুরুর আগে বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করাতে পারেন। ফোনে কথা বলা, ছোট্ট দেখা করা বা অনলাইন গ্রুপে কথা বলা। এতে করে তারা আবার সামাজিকভাবে সংযুক্ত হতে ও ঈদের শুভেচ্ছাও জানাতে পারবে।
অভিভাবকের ভূমিকা চাপ দেওয়া নয়, সহযোগিতা করা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিশুকে কোনোভাবেই চাপ দেওয়া যাবে না। বরং তাকে বুঝতে হবে, তার এই পরিবর্তনটা স্বাভাবিক এবং সে ধীরে ধীরে মানিয়ে নিতে পারবে। শিশুর প্রতিটি ছোট কাজের প্রশংসা করুন। যেমনÑ সময়মতো ঘুমানো, নিজে থেকে পড়তে বসা বা স্কুল নিয়ে আগ্রহ দেখানোÑ এসবের জন্য তাকে উৎসাহ দিন। দীর্ঘ ঈদ ছুটির পর স্কুলে ফেরা শুধু একটি রুটিন পরিবর্তন নয়, এটি একটি মানসিক ও আচরণগত পরিবর্তনের প্রক্রিয়া। এই সময় অভিভাবকের ভূমিকা হওয়া উচিত একজন সহায়কের মতো। আপনার একটুখানি ধৈর্য আর গঠনমূলক পরিকল্পনাই পারে আপনার সন্তানকে আবারও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ক্লাসরুমে ফিরিয়ে নিতে।