লাবিবা ইরম
প্রকাশ : ৩১ মার্চ ২০২৬ ১৪:৩৮ পিএম
জীবনের প্রয়োজনে ব্যস্ততা বাড়লেও অনেক সময়ই একা থাকতে হয়। দেখা যায় পড়াশোনা, চাকরিসহ জীবনের নানা প্রয়োজনে পরিবার, বন্ধুবান্ধব বা চেনা পরিবেশ ছেড়ে একা থাকতে হয়। অনেকের কাছেই বিষয়টি সামলানো বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। তখন দেখা যায়, নানারকম মানসিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে। তাই আজকে আমরা একা থেকেও ভালো থাকার কিছু উপায় নিয়ে কথা বলব।
একা থাকা মানেই একাকিত্ব নয়
আমরা অনেকেই এই ভুলটা করে ফেলি, ভাবি যে একা থাকা মানেই একাকিত্বে ভোগা। কিন্তু আসলে একা থাকা আর একাকিত্বে ভোগা দুটো সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। একাকিত্ব হলো একটি মানসিক অনুভূতি, যেখানে আপনার মনে হয় আপনি সবার থেকে আলাদা হয়ে পড়েছেন। দেখা যায় এক ঘরভর্তি মানুষের মাঝেও আপনি একাকিত্ব অনুভব করতে পারেন। অন্যদিকে একা থাকাটা হতে পারে আপনার মানসিক শান্তির সময়, নিজের জন্য কিছুটা বিশ্রামের সময়।
নিজেকে খুঁজুন
আমরা সব সময় অন্যকে বোঝার চেষ্টা করি, অন্যদের মন জুগিয়ে চলার চেষ্টা করি। কিন্তু নিজের দিকে কতটা খেয়াল করি? নিজেকে খোঁজার চেষ্টা করিইবা কয়বার? নিজেকে কতটা বুঝি? তাই একা থাকার সময়গুলোয় নিজের ব্যাপারে চিন্তা করুন। নিজেকে খুঁজুন, নিজের চিন্তা ও অনুভূতিগুলো বোঝার চেষ্টা করুন। জীবনে কী করতে চান, লক্ষ্য কী, কতটা এগোলেন বা কীভাবে সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবেন, ভাবুন। নিজেকে নিয়ে কতটা খুশি বা নিজের আরও ভালো পজিশন দেখতে চান কি নাÑ এসব প্রশ্ন করুন নিজেকেই। ডায়েরি লেখা, মেডিটেশন, জার্নালিং ইত্যাদি ক্ষেত্রে বেশ সাহায্য করে।
স্বাস্থ্যসম্মত রুটিন বানান
প্রতিদিনের রুটিন যদি স্বাস্থ্যসম্মত হয় তাহলে মানসিক চাপ, ক্লান্তি দূর হয়। তাই প্রতিদিনের কাজকর্ম, খাবারের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসম্মত অভ্যাস গড়ে তুলুন। নিয়মিত ব্যায়াম করুন, নির্দিষ্ট সময়ে উঠুন এবং ঘুমাতে যান, নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করুন। এতে মন থাকবে প্রফুল্ল আর শারীরিকভাবেও থাকবেন সুস্থ।
আগ্রহ ও শখকে গুরুত্ব দিন
আপনার কোনো বিষয়ে আগ্রহ আছে? কোনো শখ আছে? যদি থাকে তবে একা থাকার সময়ে সেগুলোকে গুরুত্ব দিন, চর্চা করুন। যদি সেভাবে কিছু না থাকে, তবে নতুন নতুন শখ ও আগ্রহ তৈরি করার চেষ্টা করুন। বই পড়া, ক্রাফটিং, রান্নাবান্নাসহ নানারকম কাজ করতে পারেন। এখন ইন্টারনেটের কল্যাণে বিভিন্ন কাজ শেখা কোনো ব্যাপারই না। তাই সৌখিন কাজে লেগে পড়ুন। এতে একা থাকার সময়টা আপনি বোঝার আগেই কেটে যাবে।
সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্ক রক্ষা করুন
একা আছেন বলেই নিজেকে গুটিয়ে ফেলবেন না। বর্তমান যুগে যোগাযোগের মাধ্যমের কোনো অভাব নেই, চ্যাটিং, মেসেজিং, অডিও বা ভিডিও কলের মাধ্যমে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে থাকা মানুষের সঙ্গেও কথা বলা যায় যেকোনো সময়। তাই পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। খোঁজখবর নিন। এতে যেমন একা লাগবে না, তেমনই সম্পর্কগুলোও মজবুত হবে।
ডিজিটাল ডিটক্সের অভ্যাস করুন
বর্তমানে আমাদের প্রিয় সঙ্গী হয়েছে নানা ডিজিটাল ডিভাইস। ভিডিও, অডিও, ছবি, সামাজিক যোগাযোগ প্লাটফর্ম, গেমস ইত্যাদি নানান ডিজিটাল অ্যাকটিভিটিতে আমরা অনেকটা সময় কাটিয়ে দিই। একা থাকলে এটি আরও বেশি হয়। তবে পরোক্ষভাবে এগুলো আমাদের মানসিক চাপ বাড়ায়। তা ছাড়া টানা এসব ডিভাইস ব্যবহারে শারীরিক নানা ক্ষয়ক্ষতিও হয়ে থাকে। তাই নিজেই নিজের বাউন্ডারি সেট করুন। প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময় ইন্টারনেট, ডিজিটাল ডিভাইস থেকে দূরে থাকুন। এ সময়টা একান্তই নিজের জন্য রাখুন। এতে মন শান্ত হবে আর নিজের সঙ্গে আত্মসংযোগ বাড়বে।
নিজেকে ভালোবাসুন
অনেক সময়ই আমরা নিজেদের প্রতি কঠোর হয়ে যাই। নিজেদের করা ভুলত্রুটি মেনে নিতে পারি না। একা থাকলে এগুলো আরও বেশি কষ্ট দেয় আমাদের। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে আমরা মানুষ, ভুলত্রুটি আমাদের জীবনেরই অংশ। তাই নিজেকে ক্ষমা করুন। নিজের প্রতি সদয় হন। নিজের ছোট ছোট সাফল্যকে উদযাপন করুন। নিজেকে ভালোবাসলে একা থাকলেও কখনোই একা লাগবে না। নিজেই নিজের সবচেয়ে বড় সঙ্গী হয়ে উঠুন।
থাকার জায়গাকে মনমতো সাজান
আপনি যেখানে থাকেন, সেই পরিবেশটি কেমন, তা আপনার মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বেশ প্রভাব ফেলে। তাই আপনার থাকার জায়গাকে মনমতো সাজান। আপনার যেভাবে থাকতে আরাম লাগে, সেভাবে জায়গাটি তৈরি করে নিন। পছন্দের গাছ লাগাতে পারেন। সাজাতে পারেন পছন্দমতো জিনিস দিয়ে। জায়গা বড় হোক বা ছোট, জিনিস দামি হোক বা না হোক, জায়গাটিতে গেলেই যেন আপনার নিজস্ব জগতের দেখা পান; সেভাবেই গড়ে তুলুন। তাহলে সেখানে থাকার প্রতিটি সময় হবে আনন্দের।
একা থাকা মানেই কোনো শূন্যতা নয়, বরং এটি নিজেকে শক্তিশালী করার একটি বড় সুযোগ। তবে একা একা থাকতে থাকতে কখনও যদি প্রয়োজনবোধ করেন কারও সাহায্যের, অবশ্যই দ্বিধাবোধ করবেন না। কাউন্সেলর, থেরাপিস্ট বা বিশ্বস্ত মানুষের সঙ্গে কথা বললে মানসিক চাপ কমে যায়। এটি কোনো দুর্বলতা নয়, বরং নিজের প্রতি সচেতনতার পরিচয়।