শেহান মালিক
প্রকাশ : ৩০ মার্চ ২০২৬ ১২:৩৯ পিএম
বাংলাদেশ সফরে এসে এখানের সংস্কৃতি, মানুষ আর প্রকৃতির বৈচিত্র্য শ্রীলঙ্কার শেহান মালিককে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে
শ্রীলঙ্কার বহুমাত্রিক প্রতিভা শেহান মালিক- অভিনেতা, কনটেন্ট ক্রিয়েটর, টিভি উপস্থাপক এবং একজন নিবেদিত শিল্পী। একই সঙ্গে ক্রীড়া সাংবাদিকতার জগতেও রয়েছে তার সক্রিয় পদচারণা। সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরে এসে এই দেশের সংস্কৃতি, মানুষ আর প্রকৃতির বৈচিত্র্য তাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। সেই মুগ্ধতার গল্প, অভিজ্ঞতার রঙিন খণ্ডচিত্র আর আবিষ্কারের অনুভূতি নিয়ে আজকের এই ফিচারে তিনি তুলে ধরেছেন তার বাংলাদেশ ভ্রমণের অনন্য কিছু দিক।
বন্ধুত্ব থেকেই শুরু এই যাত্রার গল্প। শ্রীলঙ্কায় আসিফ হাসানের সঙ্গে পরিচয়, আর সেখান থেকেই জন্ম নেয় এক আন্তরিক সম্পর্ক। কনটেন্ট ও সংস্কৃতির প্রতি দুজনের অভিন্ন আগ্রহ খুব দ্রুতই সেই পরিচয়কে পরিণত করে বন্ধনে। পরে আসিফের আমন্ত্রণে বাংলাদেশে আসা, দেশটিকে কাছ থেকে দেখা এবং বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ কভার করার সুযোগÑ সব মিলিয়ে এক নতুন অভিযানের সূচনা। ক্রীড়া সাংবাদিক হিসেবে এমন সুযোগ হাতছাড়া করার প্রশ্নই ওঠে না, তাই কোনো দ্বিধা ছাড়াই যাত্রা শুরু করলাম।

বাংলাদেশে প্রথম পা রাখার অনুভূতিটা ছিল মিশ্র- কৌতূহল, উত্তেজনা আর খানিকটা অনিশ্চয়তা। অনলাইনে দেখা ছবির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা ধারণাগুলো বাস্তবের সঙ্গে মেলেনি একদমই। বিমানবন্দরে নামার পর থেকেই যেন সেই ভুল ধারণাগুলো ভেঙে পড়তে শুরু করে। এই সফরের মূল প্রেরণা ছিল একটাই- ভালোবাসা। বাংলাদেশে আসার আগেই সোশ্যাল মিডিয়ায় পাওয়া অগণিত মানুষের ভালোবাসা সত্যিই বাস্তবে অনুভব করা যায় কি নাÑ সেটাই জানতে চেয়েছিলাম। আর বাংলাদেশে এসে আমি আবিষ্কার করলাম- এই ভালোবাসা কেবল বাস্তবই নয়, বরং প্রত্যাশার চেয়েও গভীর।
প্রথমে ভ্রমণের উদ্দেশ্য ছিল পেশাগত- ক্রিকেট কভার করা। কিন্তু খুব দ্রুতই এই সফর পেশার গণ্ডি ছাড়িয়ে হয়ে ওঠে মানুষের গল্প খোঁজার এক আন্তরিক যাত্রা। দুই সপ্তাহের পরিকল্পনা একসময় গড়িয়ে যায় এক মাসে- শুধু মানুষের অগাধ ভালোবাসার টানে। বাংলাদেশ সম্পর্কে আগে যে ধারণা ছিল, সেটিও আমূল বদলে যায়। অনলাইনের সীমাবদ্ধ ছবির বাইরে এসে খুঁজে পাই এক সমৃদ্ধ দেশ- ইতিহাস, প্রকৃতি, সংস্কৃতি, খাবার আর এক অনন্য আত্মার সমন্বয়ে গড়া। আমার উপলব্ধি- বাংলাদেশ একটি অসাধারণ গন্তব্য, যার প্রয়োজন কেবল সঠিকভাবে বিশ্বের সামনে উপস্থাপন।
এই ভ্রমণের সবচেয়ে মুগ্ধকর অধ্যায় সিলেট। শীতের সময়ের সফরটি আমার জন্য নতুন অভিজ্ঞতা হলেও সিলেটের সবুজ চা বাগান, পাহাড়ি সৌন্দর্য আর শান্ত পরিবেশ আমাকে ফিরিয়ে নেয় শ্রীলঙ্কার স্মৃতিতে। পরিচিতির এক অদ্ভুত উষ্ণতা আর প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্য আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করে। সিলেটের এক রাতের অভিজ্ঞতা আজও আমার মনে গেঁথে আছে- স্থানীয়দের সঙ্গে মধ্যরাতের হাঁটা, রাস্তায় গান, হাসি আর গল্পে ভরা সময়। সেই মুহূর্তগুলো ছিল একেবারে খাঁটি, নিখাদ মানবিক।
আরেকটি ছোট্ট ঘটনা যেন পুরো দেশের আতিথেয়তার প্রতিচ্ছবি- এক দোকানদার শুধু পথ দেখানোর জন্য নিজের দোকান বন্ধ করে প্রায় তিন কিলোমিটার পথ আমার সঙ্গে হেঁটে গিয়েছিলেন। এমন নিঃস্বার্থ আচরণই আমার চোখে বাংলাদেশকে আলাদা করে তুলে ধরে। এই সফরে স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে পাওয়া ভালোবাসা অভিভূত করেছে। অতিথি হিসেবে নয়, বরং পরিবারের সদস্য হিসেবে গ্রহণ করাÑ এই অভিজ্ঞতাই আমার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান। মানুষের সরলতা, আন্তরিকতা ও নিঃস্বার্থ মনোভাব আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে।

ভাষার বৈচিত্র্যও ছিল এক নতুন আবিষ্কার- সিলেট ও ঢাকার ভাষার ভিন্নতা মুগ্ধ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাগুলোতে ঘুরে ১৯৭১ সালের ইতিহাস সম্পর্কে জানার অভিজ্ঞতা আমাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম মনে গভীর ছাপ ফেলেছে। খাবারের প্রসঙ্গে এলে এক কথায় স্পষ্ট- বাংলাদেশে এসে আমার ‘সিক্স-প্যাক’ হারিয়ে গেছে! দেশি মুরগি, বোরহানি, বাকরখানি, মিষ্টি দই, ভুনা খিচুড়ি- সবই ছিল পছন্দের তালিকায়। বিশেষ করে তাজা দুগ্ধজাত খাবার এবং মুরগির বিভিন্ন পদ মুগ্ধ করেছে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশ আমার জন্য হয়ে উঠেছে এক আবেগের নাম- বন্ধুত্ব, ভালোবাসা, সংস্কৃতি, ইতিহাস আর সুস্বাদু খাবারের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। এই সফরে পাওয়া বন্ধুদের স্মৃতিও আমার কাছে অমূল্য। আমি খুব শিগগিরই আবার বাংলাদেশে ফিরব- এটা আমার প্রতিশ্রুতি।