ফুয়াদ মোহাম্মদ সবুজ, মহেশখালী
প্রকাশ : ২৫ মার্চ ২০২৬ ১৩:২৪ পিএম
আপডেট : ২৫ মার্চ ২০২৬ ১৩:৩৮ পিএম
মহেশখালীর মিঠা পান চাষের ঘর
পাহাড়, সবুজ আর নোনা হাওয়ার দ্বীপ মহেশখালীতে ঢুকলেই চোখে পড়ে বাঁশ, শন আর পাতার জালে ঢাকা এক আশ্চর্য সবুজ জগৎ। ভেতরে ঢুকলে নরম আলোয় ঝুলে থাকে পানের লতা, পাতার ভাঁজে ভাঁজে জমে আছে শত বছরের অভ্যাস। এখানকার পান একটি স্মৃতি, ইতিহাস, আচার আর আত্মপরিচয়ের অংশ। বিয়ে, সালিশ, আপ্যায়ন কিংবা বিদায়ের মুহূর্তে পানের উপস্থিতি যেন অলিখিত নিয়ম। দ্বীপের মানুষ বিশ্বাস করে, এই পাতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাদের পূর্বপুরুষের শ্রম, ঘাম আর নিঃশব্দ সংগ্রামের ইতিহাস। তাই মহেশখালীর মিষ্ট পান জগদ্বিখ্যাত। মহেশখালীকে বলা হয় মিঠা পান বা মিষ্টি পানের ভূ-স্বর্গ।
মহেশখালীর মিষ্টি পানের গল্প মুখে মুখে ফিরেছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। কেউ বলে পাহাড়ের মাটি, কেউ বলে বাতাস, কেউবা বলে মানুষের হাতের মায়াই এর স্বাদের রহস্য। এখানকার পান খেলে জ্বালা নেই, তেতো নেই, আছে একধরনের মৃদু মিষ্টতা। এই স্বাদই একসময় পাড়ি দিয়েছে দূরদেশে। কবিতা, গান আর লোককথায় জায়গা করে নেওয়া এই পান হয়ে উঠেছে অঞ্চলের সাংস্কৃতিক পরিচয়। দ্বীপের প্রবীণরা বলেন, পানের বরজ যেমন আগলে রাখা হয়, তেমনি আগলে রাখা হয় সম্মান আর বিশ্বাস। কিন্তু এমন একটি পণ্য সামান্য অবহেলার কারণে হারিয়ে ফেলেছে ভৌগোলিক নির্দেশক চিহ্ন বা জিআই স্বীকৃতি। মহেশখালীর মিষ্ট পানের খ্যাতি কেড়ে নিয়ে তথাকথিতভাবে ঝাল পান খ্যাত রাজশাহীর পানকে দেওয়া হয় মিষ্টি পানের খ্যাতি। গত ২০২৪ সালের (২৫ এপ্রিল) বৃহস্পতিবার জিআই সনদ লাভ করে রাজশাহী। তবু মানুষের মনে আর হৃদয়ে বুক চিতিয়ে রয়ে গেছে মহেশখালীর মিষ্টি পান।
-69c38d9c61741.jpeg)
ইতিহাস বলছে, মহেশখালীর পান চাষ কয়েক শতাব্দী প্রাচীন। পাহাড়ি দ্বীপ হওয়ার কারণে এখানকার ভূমি পান উৎপাদনের জন্য আলাদা বৈশিষ্ট্য বহন করে। ঢালু পাহাড়, ছায়াযুক্ত পরিবেশ ও আর্দ্রতা পানগাছের জন্য আদর্শ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই দ্বীপে দুটিতে চাষ পদ্ধতি গড়ে উঠেছে। একদিকে পাহাড়ি বরজ, অন্যদিকে বিলভিত্তিক বরজ। পাহাড়ে লাগানো পান দীর্ঘ সময় ফলন দেয়, আর সমতলের বরজ মৌসুমি হলেও দ্রুত বাজারে আসে। এই বৈচিত্র্যই মহেশখালীর পান অর্থনীতিকে বহুমাত্রিক করেছে।
পান চাষ
পান চাষ সহজ কোনো কাজ নয়। জমি প্রস্তুত থেকে শুরু করে লতা বোনা, ছায়া দেওয়া, পানি নিয়ন্ত্রণসহ প্রতিটি ধাপে প্রয়োজন নিখুঁত হিসাব। বরজ তৈরি করতে লাগে বাঁশ, শন, খড়, কাঠ আর শ্রম। একটি বরজ দাঁড় করাতে মাসের পর মাস সময় যায়। অভিজ্ঞ চাষিরা বলেন, পানগাছ মানুষের মতো, একটু অবহেলা সহ্য করে না। অতিরিক্ত রোদ, বৃষ্টি কিংবা অসতর্ক স্পর্শে পুরো বরজ নষ্ট হতে পারে। তাই পান চাষে শুধু টাকা নয়, দরকার ধৈর্য, নিষ্ঠা আর বহু বছরের অভিজ্ঞতা।
মহেশখালীর পান চাষ যেন মহেশখালীর জীবিকা ব্যবস্থার কেন্দ্র। দ্বীপের হাজারো পরিবার এই ফসলের ওপর নির্ভরশীল। কারও ঘরে সন্তান স্কুলে যায় পানের টাকায়, কারও ঘরে চিকিৎসা চলে এই আয়ে। স্থানীয় হিসাব অনুযায়ী, ১৬০০ হেক্টর জমিতে ছড়িয়ে আছে পানের বরজ। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এতে যুক্ত প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিক, ব্যবসায়ী, পরিবহন কর্মী ও আড়তদার। সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে হাট বসে, যেখানে চাষিরা তাদের কষ্টের ফসল বিক্রির আশায় বসেন। এখানেই নির্ধারিত হয় সারা মৌসুমের ভাগ্য।
পান চাষে নিয়োজিত শ্রমিক কালারমারছড়ার মোহাম্মদ রিদোয়ান বলেন, সপ্তাহের বৃহস্পতি ও সোমবার বাদে বাকি ৫ দিনই পুরো মহেশখালীজুড়ে পানের হাটবাজার বসে। সরকারি ও বেসরকারি হিসাব অনুযায়ী সপ্তাহের শুক্র-মঙ্গলবার দুদিন গোরকঘাটা মিয়ার বাজার হতে নতুনবাজার, রবি-বুধবার কেরুনতলী হতে হোয়ানক, শনি-মঙ্গলবার, রবি ও বুধবার ডেইল্লাঘোনা হতে আঁধারঘোনা, নোনাছড়ি, কালারমারছড়া, নয়াপাড়া, শুক্রবার সোনারপাড়া, শুক্র-মঙ্গলবার বদরখালী ও রবি-বুধবার ষাইটমারা থেকে শাপলাপুরসহ মোট ১৩ স্থানে পানের হাটবাজার বসে।
একসময় মহেশখালীর পান দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশের বাজারেও পরিচিতি পেয়েছিল। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বাজারে এই মিষ্টি পানের আলাদা কদর ছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক মান ও স্বাস্থ্যগত জটিলতায় একপর্যায়ে রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ বিরতির পর আবারও বিদেশে যাওয়ার পথ খুলেছে পানের জন্য। এই সংবাদে চাষিদের মধ্যে আশার আলো জ্বলে উঠেছে। তারা মনে করেন, নিয়মিত রপ্তানি চালু হলে ন্যায্যমূল্য পাওয়া সম্ভব হবে। তবে রপ্তানির সুযোগ টেকসই করতে হলে মান নিয়ন্ত্রণ ও সরকারি নজরদারি জরুরি। এ আনন্দের সঙ্গে আছে বেদনার চাপও, স্থানীয় রাজনীতিবিদের অবহেলা আর গাফিলতির কারণে পানের বাজারে সবচেয়ে বড় সমস্যা দামের অস্থিরতা। কখনও অস্বাভাবিক উচ্চমূল্য, আবার কখনও ভয়াবহ দরপতন। উৎপাদন বেশি হলে বাজার ভেঙে পড়ে। মধ্যস্বত্বভোগী ও দালালদের প্রভাব এখানে প্রবল। অনেক সময় চাষিরা বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করেন, কারণ সংরক্ষণের সুযোগ নেই। পরিবহন ব্যয়ও একটি বড় বাধা। ফলে লাভের জায়গায় লোকসান গুনতে হয়। বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় চাষির শ্রমের ন্যায্য প্রতিফলন আসে না। এতে অনেকেই ভবিষ্যতে পান চাষ ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন।
পানচাষিদের জীবন সংগ্রাম
এ দ্বীপে জীবন সংগ্রামই যেন পানচাষিদের নিত্যসঙ্গী। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অতিবৃষ্টি কিংবা রোগবালাই মুহূর্তে শেষ করে দিতে পারে বছরের বিনিয়োগ। অনেক চাষি ধারদেনা করে বরজ তৈরি করেন। দাম পড়ে গেলে সেই ঋণের বোঝা ভয়াবহ হয়ে ওঠে। কেউ বরজ তুলে ফেলেন, কেউ বিকল্প পেশার সন্ধান করেন। তরুণ প্রজন্ম ধীরে ধীরে এই পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। অভিজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান সংকট চলতে থাকলে কয়েক দশকের মধ্যে এই ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
তবু এই অন্ধকারের মাঝেও রয়েছে সম্ভাবনার আলো। আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা, সমবায় ভিত্তিক বাজার কাঠামো ও সরকারি ক্রয় ব্যবস্থাপনা চালু হলে পান চাষ ঘুরে দাঁড়াতে পারে। চাষিরা চান সহজ শর্তে ঋণ, ন্যায্যমূল্য এবং স্থিতিশীল বাজার। পাশাপাশি প্রয়োজন প্রশিক্ষণ ও গবেষণা, যাতে রোগ প্রতিরোধ ও উৎপাদন দক্ষতা বাড়ানো যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, মহেশখালীর পানকে ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিলে আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
পান ব্যবসায়ী আজগর আলী বলেন, বর্তমানে চট্টগ্রাম-ঢাকা এক বিরা বড় পান বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে ৭৫০ টাকা পর্যন্ত। এভাবে দাম বজায় থাকলে চাষিরা লাভবান যেমন হবেন, তেমনি পান চাষের প্রতি উৎসাহ পাবেন। গত বছর পানের দাম কম পাওয়ায় আমাদের বেশি ক্ষতি হয়েছে। বর্তমানে যে দাম বলবৎ আছে তা আগামী রমজান পর্যন্ত স্থিতিশীল থাকতে পারে। সারা দেশে মহেশখালীর পানের চাহিদা ব্যাপক।
এখানকার পান শুধু অর্থনীতির বিষয় নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। সামাজিক রীতি, আপ্যায়ন, উৎসবÑ সবখানেই এর উপস্থিতি দৃশ্যমান। এই ঐতিহ্য রক্ষার দায় কেবল চাষিদের নয়, রাষ্ট্রেরও। পরিকল্পিত উদ্যোগ ছাড়া এই খাত টিকবে না। স্থানীয় সংগঠনগুলো বলছে, চাষিদের সংগঠিত করা গেলে দালালনির্ভরতা কমবে। বাজারে দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়বে। একই সঙ্গে তরুণদের এই পেশায় আগ্রহী করে তুলতে প্রয়োজন সম্মান ও নিরাপত্তার পরিবেশ।
মহেশখালীর অভিজ্ঞ পানচাষিরা বলছেন, এই ফসল যতটা লাভজনক, ততটাই ঝুঁকিপূর্ণ। লাভ-লোকসানের হিসাব এখানে প্রতিদিন বদলায়। এক মৌসুমে লাভ হলেও পরের মৌসুমে সব শেষ হয়ে যেতে পারে। তাই চাষিরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দাবি জানাচ্ছেন। তারা চান, হঠাৎ বাজার ধসে পড়লে যেন ক্ষতিপূরণ বা সহায়তা পাওয়া যায়। এতে করে কৃষকের আস্থা ফিরবে। নয়তো অনিশ্চয়তার কারণে এই ঐতিহ্যবাহী চাষ ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে।
পান চাষ ঘিরে মহেশখালীর সামাজিক কাঠামোও গড়ে উঠেছে। বরজের কাজ ভাগ করে নেয় পরিবার, প্রতিবেশী ও শ্রমিকরা। এই পারস্পরিক নির্ভরতা সামাজিক বন্ধনকে শক্তিশালী করেছে। কিন্তু অর্থনৈতিক চাপ সেই বন্ধনেও ফাটল ধরাচ্ছে। কেউ শহরে পাড়ি দিচ্ছেন, কেউ ভিন্ন পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। ফলে পান চাষকেন্দ্রিক গ্রামীণ সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে পড়ছে। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই পরিবর্তন শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি সামাজিক রূপান্তরেরও ইঙ্গিত বহন করে।
মহেশখালী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুল গাফ্ফারের তথ্য অনুযায়ী, মহেশখালীতে মোট ১৬০০ হেক্টর জমিতে পান চাষ হয়। আর পান বরজের সংখ্যা ৬ হাজারের বেশি। তিনি বলেন, মহেশখালীতে ৯টি ইউনিয়নের কুতুবজুম, মাতারবাড়ী এবং ধলঘাটা বাদে বাকি ৬ ইউনিয়নে পান চাষ হয়। এ উপজেলায় মূলত তিনটি প্রধান মৌসুমে (রবি (শীতকালীন, ১৬ অক্টোবর-১৫ মার্চ), খরিফ-১ (গ্রীষ্মকালীন, ১৬ মার্চ-১৫ জুলাই) এবং খরিফ-২ (বর্ষাকালীন, ১৬ জুলাই-১৫ অক্টোবর) পান চাষ হয়ে থাকে। আর চাষাবাদ পদ্ধতিও দুই রকমÑ সনাতনী আর আধুনিক পদ্ধতি। পানের দাম নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, বর্তমানে আগের তুলনায় পানের দাম ৩০-৪০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
পরিবেশবিদ ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) নেতা আবু বক্কর ছিদ্দিক বলেন, মহেশখালীর মিষ্টি পান একটি ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবিকার সম্মিলিত প্রতিচ্ছবি। এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। চাষি, বাজার, রাষ্ট্র ও গবেষণাÑ সব পক্ষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। নয়তো এক দিন বিলুপ্তির পথে হাঁটবে পান শিল্প। দ্বীপের চাষিরা বিশ্বাস করেন, সঠিক সিদ্ধান্ত ও নীতিগত সহায়তা পেলে আবারও ফিরবে সেই সুদিন, যে সময় মিষ্টি পান ছিল গর্বের প্রতীক।