রাসেল আহমদ, মধ্যনগর
প্রকাশ : ২৫ মার্চ ২০২৬ ১৩:২২ পিএম
আপডেট : ২৫ মার্চ ২০২৬ ১৩:৪১ পিএম
মান্দার গাছের বাগান
একসময় সুনামগঞ্জের মধ্যনগরসহ সমগ্র হাওরাঞ্চলে অবহেলায় বেড়ে ওঠা কাঁটাযুক্ত মান্দার গাছ নানা জায়গায় চোখে পড়ত। এখন আর সেভাবে চোখে পড়ে না। হাওরাঞ্চল এলাকা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে এ গাছ।
হাওরাঞ্চলে জ্বালানি কাঠ হিসেবে মান্দার গাছের ব্যাপক ব্যবহার এবং মেহগনি, শিশুগাছসহ অন্যান্য গাছের চাহিদা থাকায় এ গাছ ধীরে ধীরে হাওরের জনপদ থেকে লুপ্ত হওয়ার পথে। তা ছাড়া ইটের ভাটায় কাঠের জোগান ও দিয়াশলাই তৈরিতে ব্যবহৃত হওয়ার ফলেও পরিণত বয়সের কাঁটা মান্দারের দেখা পাওয়াটাও দুর্লভ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জানা গেছে, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মান্দারকে পারিজাত নাম রেখেছিলেন। পৌরাণিক কাহিনী থেকে জানা যায়, ‘অমৃতের সন্ধানে দেবতা ও অসুররা মন্দার পর্বতকে মন্থনদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করে সমুদ্র থেকে তুলে এনেছিলেন একের পরে এক আশ্চর্য সব বস্তু। সেই মন্থনে উদ্ভাসিত হয়েছিলেন লক্ষ্মী দেবী, ঐরাবত হস্তী, উচ্চৈশ্রবা অশ্ব, অপ্সরাকুল, কামধেনু, চন্দ্র ইত্যাদি এবং অবশ্যই হলাহল বিষ ও অমৃত। এসব ছাড়াও সেই মন্থনে উঠে এসেছিল এক আশ্চর্য বৃক্ষ, যার নাম মান্দার বা পারিজাত। পরবর্তীকালে স্বর্গের বর্ণনায় বারবার পুরাণে উল্লিখিত হয়েছে মান্দার বা পারিজাতের নাম। ইন্দ্রের নন্দন কাননে প্রধান গাছটিই হলো মান্দার বা পারিজাত, এমন কথা হিন্দু পুরাণে গভীর বিশ্বাসের সঙ্গে উল্লিখিত। ‘হরিবংশ পুরাণ’-এ উল্লিখিত রয়েছে, মান্দার বা পারিজাত একটি ‘কল্পতরু, এর কাছে যা প্রার্থনা করা যায়, তা-ই নাকি পাওয়া যায়। সেই সঙ্গে এ কথাও বলা হয়েছে, বেশিরভাগ মান্দার/পারিজাত স্বর্গে থাকলেও মর্ত্যভূমে একটি মাত্র গাছ নাকি রয়ে গেছে।’
দেখতে যেমন পলাশের মতো, তেমনি ফাগুন হাওয়ার পলাশ যখন ডালে ডালে আগুন ঝরায় তখন পারিজাতও ফুটতে শুরু করে। গাছের পাতা ঝরে যায় ফুল ফোটার সময় হলেই। পাতাহীন গাছে ফোটে টকটকে লাল পারিজাত।
মধ্যনগরের বিভিন্ন গ্রামের প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গ্রামাঞ্চলে ভিটেবাড়ির ঘেরা-বেড়ার খুঁটি দিতে এ গাছের তুলনা নেই। একবার তৈরি করে দিলে সারাজনম স্থায়ী হয়ে যেত, যেন জীবন্ত ঘেরাবেড়া। প্রতি বছর ভাল কেটে লাখড়ির সংস্থান হতো। মান্দার পাতা ছাগলের খুব পছন্দের খাবার। মান্দারের বিচি দেখতে অনেকটা তেঁতুলের মতোই। তেঁতুলের চেয়ে একটু বড় আর গোটা গোটা। তবে মান্দার খুই নরম কাঠের গাছ হওয়ায় তেমনভাবে কোথাও এর কাঠের ব্যবহার নেই।
তবে মান্দারের ঔষধি গুণের কথা জানালেন উপজেলার বাট্টা গ্রামের কবিরাজ দ্বীনবন্ধু বিশ্বাস। তিনি বলেন, পেটের পীড়ার নানা রোগ নিরাময়ে কাঁটা মান্দার উপকারী উদ্ভিদ। বিশেষ করে রক্তআমাশয় নিরাময়ে এই গাছের ছালের রস দুধের সঙ্গে মিশিয়ে পান করলে রক্ত আমাশয়ের উপশম হয়। এ ছাড়া বাত-ব্যথানাশক ওষুধ হিসেবে মান্দার ফুলের তেল ব্যবহৃত হয়। সিদ্ধ চিকিৎসায় রজঃস্রাব বা মাসিক নিয়মিতকরণসহ প্রায় ৯টি রোগের ঔষধি গুণ রয়েছে মান্দার গাছে।
দেশের প্রখ্যাত উদ্ভিদবিদ দ্বিজেন শর্মা তার ‘ফুলগুলি যেন কথা’ বইতে এই মান্দার সম্পর্কে বলেছেন, ইরিত্রিনা ইডিকা বা পারিজাত মাঝারি আকারের দেশি গাছ। গায়ে কাঁটা থাকে। পত্রমোচী। বসন্তে ফুল ফোটে। মঞ্জরিতে অনেকগুলো ফুল থাকে। ফুল শিমুল ফুলের মতো, ১০ সেন্টিমিটার লম্বা, গাঢ় লাল। বীজ থেকে সহজেই চারা জন্মে। ভাল কেটে লাগালেও বাঁচে।
ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ ও পশুবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এমএ আওয়াল বলেন, ‘মান্দার গাছ প্রধানত দুই ধরনের। কাঁটা মান্দার আর পাইন্যা মান্দার। তবে বেশ কয়েক প্রজাতির মান্দার ছিল আমাদের দেশে। উত্তরাঞ্চলীয় আফ্রিকার দেশগুলো, ভারতীয় উপমহাদেশ, অস্ট্রেলিয়ার উত্তরাঞ্চল, ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জসহ প্রশান্ত মহাসাগর-তীরবর্তী পশ্চিমাঞ্চলীয় এলাকা থেকে শুরু করে ফিজির পূর্বাংশে মান্দার গাছের দেখা মেলে।