মোস্তাফিজুর রহমান, কয়রা (খুলনা)
প্রকাশ : ১৮ মার্চ ২০২৬ ১২:২৮ পিএম
লবণাক্ত নদী, ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতচিহ্ন আর জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘ ছায়া এই বাস্তবতার মাঝেই দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের জনপদ কয়রা উপজেলা আজ তীব্র সুপেয় পানির সংকটে হাঁসফাঁস করছে। উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের মধ্যে পাঁচটিতে কার্যকর সুপেয় পানির কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নেই; বাকি দুই ইউনিয়নেও রয়েছে মারাত্মক ঘাটতি। ফলে প্রতিদিনের খাবার পানির চাহিদা মেটাতে লড়াই করতে হচ্ছে প্রায় দুই লাখ মানুষকে। ২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, খুলনার কয়রা উপজেলার মোট জনসংখ্যা ২,২০,১০২ জন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও কম নয়Ñ ৪টি কলেজ, ৮টি হাইস্কুল, ২টি কামিল মাদ্রাসা, ৪টি আলিম মাদ্রাসা ও ২১টি দাখিল মাদ্রাসা রয়েছে। কিন্তু এত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঝেও শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
সরেজমিনে ঘুরে জানা গেছে, উপজেলার আমাদী, বাগালি ও মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নে পানির সংকট সবচেয়ে তীব্র। এসব ইউনিয়নে অধিকাংশ নলকূপ অকার্যকর; কোথাও নলকূপ নেই বললেই চলে। বাকি দুই ইউনিয়ন, সদর ও মহারাজপুরের অনেক এলাকাতেও একই চিত্র। কিছু জায়গায় ডিপ টিউবওয়েল থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লবণাক্ত পানি উঠছে। ফলে খাওয়ার উপযোগী পানি হিসেবে অনেকেই পুকুরের পানির ওপর নির্ভর করছেন, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।
স্থানীয়দের দাবি, সাত ইউনিয়নের দুই লাখের অধিক মানুষ সুপেয় পানির সংকটে ভুগছেন। মিঠাপানির অভাবে গৃহপালিত পশু পালনও ছেড়ে দিচ্ছেন অনেকে। আমাদী ইউনিয়নের বামনডাঙ্গা গ্রামে দেখা গেছে একমাত্র মিঠা পানির টিউবওয়েল ঘিরে দীর্ঘ লাইন। বামনডাঙ্গা, দশবাড়িয়া, খেওনা, খিরোল, বালিয়াডাঙ্গা ও পাটুরিয়া- এই ছয় গ্রামের শত শত পরিবার বিকাল হলেই কলস হাতে ভিড় করেন। একটি কলস পানি তুলতে সময় লাগে পাঁচ থেকে দশ মিনিট। গরমের সময় পানির স্তর নেমে গেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেকে খালি হাতে ফেরেন।
গ্রামের বাসিন্দা মো. মিজানুর রহমান বলেন, আমাদের এখানে মিঠাপানির জলাশয় বা পুকুর-টিউবওয়েল কোনোটাই নাই। শুধু একটা টিউবওয়েল, সেখান থেকেও ঠিকমতো পানি ওঠে না। একটা কলস ভরতে পাঁচ-দশ মিনিট লাগে। গরমে পানি ওঠে না। সরকারি একটা পানির প্ল্যান হলে আমরা একটু খেয়ে বাঁচতাম।
আমাদীর আরিফুজ্জামান বলেন, দুপুর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মানুষ সিরিয়াল দিয়ে বসে থাকে। আমাদের টিউবওয়েলের পাশে সরকারি একটা পুকুর আছে। সংস্কার করা হলেও সুফল পাইনি। সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে খনন করলে পানির টেনশন কমত। সীমা রানি জানান, মিঠাপানি খাওয়া আমাদের কাছে স্বপ্নের মতো। আমার বাড়ি থেকে দুই কিলোমিটার দূরে গিয়ে রোদে বসে থাকতে হয়। গরমে পানি না উঠলে ২৫-৩০ টাকা দিয়ে ড্রাম কিনে খেতে হয়।
মহারাজপুর ইউনিয়নের মঠবাড়ী গ্রামের কালি বালা হালদার বলেন, ডিপ টিউবওয়েল থেকেও লবণাক্ত পানি ওঠে। লবণাক্ত পানি খেয়ে নানা সমস্যায় পড়ি। তিন-চার কিলোমিটার দূর থেকে পানি আনতে হয়। আমাদের এখানে একটা মিঠাপানির ব্যবস্থা করলে অনেক উপকার হতো।
উপকূলীয় এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তরে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় ডিপ টিউবওয়েলও সমাধান দিচ্ছে নাÑ এমনটাই বলছেন স্থানীয়রা। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের প্রভাবে মাটির নিচে লবণাক্ততা বেড়েছে, যার প্রভাব পড়ছে পানির উৎসে।
উপকূল ও সুন্দরবন সংরক্ষণ আন্দোলনের সভাপতি সাংবাদিক তরিকুল ইসলাম বলেন, সুপেয় পানির সংকট নিরসনে নেওয়া প্রকল্পগুলো প্রত্যাশিত ফল দিচ্ছে না। রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিংয়ের ট্যাংক বিতরণে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি হচ্ছে। প্রকৃত দরিদ্ররা বঞ্চিত, ট্যাংক যাচ্ছে প্রভাবশালীদের হাতে। তিনি আরও বলেন, পুকুর খনন করে পিএসএফ (পন্ড স্যান্ড ফিল্টার) স্থাপন টেকসই সমাধান হতে পারে। তবে শুধু স্থাপন করলেই হবে না, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।
উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী ইশতিয়াক আহমেদ স্বীকার করেন, কয়রা উপজেলার অধিকাংশ জায়গায় সুপেয় পানির সংকট রয়েছে। ডিপ টিউবওয়েলেও লবণাক্ত পানি ওঠে। তিনি জানান, সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধাপে ডিপ টিউবওয়েল ও পানির ট্যাংক বিতরণ কার্যক্রম চলমান। আশা করি এক-দুই বছরের মধ্যে পানি সংকট কিছুটা হলেও দূর হবে, যোগ করেন তিনি। মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, খুলনা-৬ আসনের সংসদ সদস্য, উপকূলীয় অঞ্চলে সুপেয় পানির দীর্ঘদিনের সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, অতীতে সরকার বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করলেও বাস্তবায়নে অনিয়ম ও সমন্বয়হীনতার কারণে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যায়নি।
বিশেষ করে রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং ট্যাংক বিতরণে প্রকৃত দরিদ্র মানুষ বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগকে তিনি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, কোনোভাবেই প্রভাবশালী বা বিত্তবান ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে না। প্রকৃত উপকারভোগীদের তালিকা যাচাই করে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে বরাদ্দ নিশ্চিত করা হবে।
তিনি আরও বলেন, তীব্র গরমে লবণাক্ত ও আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করে সাধারণ মানুষ পেটের পীড়াসহ নানা স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগামীতে সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
উপকূলবাসীর দাবি, খণ্ডকালীন প্রকল্প নয়, প্রয়োজন বৃহৎ আকারে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পুকুর খনন, পিএসএফ স্থাপন এবং কঠোর তদারকি। অন্যথায় বিশুদ্ধ পানির অভাব স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াবে, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হবে এবং পশুপালনসহ স্থানীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কয়রার বিস্তীর্ণ জনপদে এখন সবচেয়ে বড় চাওয়া, একটু মিঠাপানি। উন্নয়ন পরিকল্পনার কাগজে নয়, বাস্তবের কলস ভরে সেই পানির নিশ্চয়তা চায় উপকূলের মানুষ।