সারা বছর কখনও সেভাবে ত্বক ও চুলের আলাদাভাবে যত্ন নেওয়ার কথা না ভাবলেও ঈদ এলে নিজেকে ভিন্ন রূপে দেখতে চান সকলেই। বছরে এক-দুইবার চুলের কাটিং দেওয়া হোক অথবা ত্বকের ক্ষেত্রে ফেসিয়াল করা হোকÑ ঈদের মৌসুমে এই চিত্র অনেকটাই ভিন্ন রকম থাকে। অবশ্য মৌসুমের খাতিরেই হোক বা উৎসবের পালাবদলÑ যত্ন তো নেওয়া উচিত আসলে সব সময়ই। তবে সৌন্দর্য বর্ধনে যে শুধু স্যালুনেই যেতে হবে এমন কিন্তু মোটেই নয়। বরং ঘরে বসেও কিছু কাজ করা যায়। চলুন তবে এই অল্প সময়ে কীভাবে ঈদের জন্য ত্বক ও চুলের যত্ন নেবেন জানা যাক।
চুলের যত্নে ঘরোয়া মাস্ক
পছন্দের পোশাক পরে চুলে সাজ দিতে গিয়ে দেখলেন চুলের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা! না চুলকে বশে আনা যাচ্ছে, না দেওয়া যাচ্ছে পছন্দের কোনো সাজ। এই অবস্থায় পড়তে না চাইলে এই অল্প সময়েই নিয়ে ফেলতে হবে প্রস্তুতি। কেমিক্যালযুক্ত পণ্য ব্যবহার, দূষণ, অপরিষ্কার পানিসহ নানা কারণে চুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব সমস্যা থেকে চুলকে সুরক্ষিত রাখতে ঘরোয়া কিছু মাস্ক ব্যবহার করতে পারেন।
আমন্ড অয়েল ও ডিমের সাদা অংশ
ডিমের সাদা অংশে প্রচুর প্রোটিন থাকে, যা চুলকে মজবুত করে। আমন্ড অয়েল চুল নরম ও মসৃণ রাখতে বিশেষভাবে কার্যকর। একটি ডিমের সাদা অংশের সঙ্গে ২ চা চামচ আমন্ড অয়েল ভালোভাবে মিশিয়ে চুল ও মাথার ত্বকে লাগিয়ে ঘণ্টাখানেক রেখে শ্যাম্পু দিয়ে চুল ধুয়ে ফেলুন। ঈদের আগে অল্প সময়ে এই হেয়ার মাস্ক হতে পারে চুলের জন্য ব্লেসিং।
অলিভ অয়েল ও মধুর মাস্ক
অলিভ অয়েল চুলকে গভীরভাবে পুষ্টি জোগায় এবং মধু চুলের ময়েশ্চার ধরে রাখতে সাহায্য করে। আধা চা চামচ মধুর সঙ্গে ১ চা চামচ অলিভ অয়েল ভালোভাবে মিশিয়ে নিন। এরপর এটি চুল ও মাথার ত্বকে লাগান। ঘণ্টাখানেক পরে শ্যাম্পু দিয়ে চুল ধুয়ে ফেলুন। এই মাস্ক চুলের শুষ্কতা কমিয়ে চুলকে নরম ও স্বাস্থ্যকর করে তোলে। যাদের শুষ্ক চুল, তারা ঈদের আগে এই হেয়ার মাস্কটি ব্যবহার করে দেখতে পারেন।
নারকেল তেল ও পেঁয়াজ তেলের মাস্ক
নারকেল তেল চুলের পুষ্টি জোগাতে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার হয়ে আসছে। এর সঙ্গে পেঁয়াজ তেল মিশিয়ে ব্যবহার করলে চুলের গোড়া আরও শক্ত হয় এবং চুল পড়া কমাতে সাহায্য করে। ২ চা চামচ নারকেল তেলের সঙ্গে ১ চা চামচ পেঁয়াজ তেল মিশিয়ে চুল ও মাথার ত্বকে লাগান। ঘণ্টাখানেক পর শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। এতে চুল হবে নরম, উজ্জ্বল ও স্বাস্থ্যকর।
হেয়ার কেয়ার টিপস
চুলের যত্ন শুধু মাস্ক ব্যবহারেই শেষ নয়। কিছু যত্ন চুলকে আরও সুন্দর করে তুলতে পারে। যেমনÑ
-যদি সম্ভব হয়, এই অল্প সময়ের মধ্যে একবার পার্লারে গিয়ে হেয়ার স্পা করাতে পারেন। এতে চুলের গভীরে পুষ্টি পৌঁছায় এবং চুল দেখতে আরও ঝলমলে লাগে।
- অনেকেই শেষ মুহূর্তে হয়তো চুল কাটানোর কথা ভাবছেন। কাটাতে পারেন, তবে উৎসবের অন্তত সপ্তাহখানেক আগে চুল কাটালে চেহারার সাথে মানানসই হতে সময় লাগে। এখন যেহেতু সেই সময়টুকু পাওয়া যাবে না তাই আপাতত হেয়ার স্ট্রিম করে নিতে পারেন। এতেও চুল অনেকটাই সেট থাকবে।
- আবহাওয়ার পরিবর্তন ইতোমধ্যেই বোঝা যাচ্ছে। বাইরে প্রচুর ধুলোবালির সংস্পর্শে আসছে চুল। এতে চুল পড়া, চুল আঠালো হয়ে যাওয়ার সমস্যা বাড়ছে। তাই বাইরে যাওয়ার আগে সুতি কাপড় দিয়ে চুল ঢেকে বের হতে পারলে ভালো। বাসায় এসে মাইল্ড শ্যাম্পু দিয়ে এক দুই দিন পর পর চুল ধুয়ে নিতে হবে। সাথে কন্ডিশনার ব্যবহার করতে হবে। চুলের ক্ষতি যেন না হয় সেজন্য হেয়ার সিরাম ব্যবহার করতে পারেন। এতে চুল নরমও থাকবে।
- ঈদের সময় যেহেতু চুলে নানা এক্সপেরিমেন্ট চলবে, তাই এখন থেকেই বিশ্রাম দিতে হবে চুলে। অতিরিক্ত কোনোকিছু লাগিয়ে রাখা বা কেমিক্যাল যুক্ত পণ্য ব্যবহার করা, স্ট্রেইটনার বা কার্ল মেশিন দিয়ে চুল বারবার আঁচড়ানো থেকেও বিরত থাকতে হবে।
- যারা স্যালনে যাবেন, তারা ভালোভাবে চুলের যত্নের নিয়ম শুনে আসবেন। যেন ঈদের দিন কোনো বিপত্তিতে পড়তে না হয়।
ত্বকের যত্নে ঘরোয়া ফেসপ্যাক
ঘরে আমরা যে ফেসপ্যাকগুলো বানাই সেগুলো ত্বকের উজ্জ্বলতা যেমন বাড়ায়, ত্বক থাকে কেমিক্যাল ফ্রি। ঈদের সময় উজ্জ্বল ত্বকের জন্য কিছু যত্ন আমাদের শুরু করতে হবে এখনই, কারণ সময় একদমই কম।
পেঁপে মাস্ক
রোজার এই সময় পাকা পেঁপে যেমন শরীর ভালো রাখে, তেমনই ত্বকের মৃত কোষ দূর করতেও এটি খুব কার্যকর। একটি পাকা পেঁপের খানিক অংশ ভালোভাবে ব্লেন্ড করে ১৫-২০ মিনিট মুখে লাগিয়ে রাখুন। পরে পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। এটি ত্বককে নরম, মসৃণ ও সতেজ করে তোলে।
অ্যালোভেরা ও মধু
অ্যালোভেরা ত্বকের জন্য খুবই উপকারী একটি প্রাকৃতিক উপাদান। এটি ত্বককে ঠান্ডা রাখে এবং দাগছোপ কমাতে সাহায্য করে। ১ কাপ অ্যালোভেরার এক-চতুর্থাংশের সঙ্গে ১ টেবিল চামচ মধু মিশিয়ে নিন। এরপর ১০-১৫ মিনিট মুখে লাগিয়ে রাখুন। এই মাস্ক ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়াতে এবং অ্যান্টি-এজিং হিসেবে কাজ করতে সহায়তা করে।
ওটস, শসা ও টক দই মাস্ক
ওটস ত্বক পরিষ্কার করতে সাহায্য করে, শসা ত্বককে ঠান্ডা ও সতেজ রাখে এবং টক দই ত্বককে আর্দ্র করে। ৩ টেবিল চামচ ওটস, ১ টেবিল চামচ শসার রস এবং ১ টেবিল চামচ টক দই ভালোভাবে মিশিয়ে নিন। এরপর এটি মুখে ১৫-২০ মিনিট লাগিয়ে রাখুন। এই মাস্ক ত্বককে সতেজ, কোমল ও আর্দ্র রাখতে সাহায্য করে।
হাইড্রেশন টিপস
ত্বক সুন্দর রাখতে শুধু বাইরের যত্নই যথেষ্ট নয়; শরীরের ভেতর থেকেও যত্ন নেওয়া জরুরি। প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করলে শরীরের পানির ভারসাম্য বজায় থাকে এবং ত্বক থাকে উজ্জ্বল। যদিও রমজানে এটা কিছুটা কষ্টসাধ্য, এক্ষেত্রে ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত পরিমিত পানি পান করতে হবে, তরল খাবার খেতে হবে বেশি বেশি, ভাজাপোড়া কমিয়ে ফেলতে হবে একদম।
-ত্বককে সতেজ রাখতে প্রতিদিন ৩-৪ বার গোলাপ জল ব্যবহার করা যেতে পারে। এটি ত্বককে ঠান্ডা রাখে এবং সতেজ অনুভূতি দেয়। যদি কারও গোলাপ জলে অ্যালার্জি থাকে তাহলে অ্যালোভেরা ব্যবহার করতে পারেন।
-সানট্যান কমাতে লেবু, দুধ ও হলুদের মিশ্রণ ব্যবহার করতে পারেন। এই প্রাকৃতিক উপাদানগুলো ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়াতে সাহায্য করে।
-চোখের নিচের কালো দাগ বা ডার্ক সার্কেল কমাতে টমেটো, লেবু, হলুদ ও বেসনের প্যাক ভালো কাজ করে। নিয়মিত ব্যবহার করলে ধীরে ধীরে চোখের নিচের কালচে ভাব কমে যায়। ঈদের আগে সুন্দর চোখ কে না চায় বলুন?
ত্বকের সতেজতা ধরে রাখতে আরও কিছু পরামর্শ
- সকালে বাইরে যাওয়ার আগে অবশ্যই সানস্ক্রিন লাগিয়ে বের হবেন। বাড়ি ফিরে ভালোভাবে ক্লেনজিং অয়েল, ক্লেনজিং বাম বা মাইসেলার ওয়াটার দিয়ে মুখ ধুয়ে নিবেন। এরপর ত্বকের ধরন অনুযায়ী ময়েশ্চারাইজার লাগিয়ে নিবেন।
- যারা ত্বকের রুক্ষতা নিয়ে ভাবছেন যে ঈদের দিনও ফ্যাকাসে দেখাবে তারা এখন থেকেই ত্বকে তেল, ময়েশ্চারাইজার বা লোশন লাগানো শুরু করুন। ত্বকের কোমল ভাব ফিরে আসবে অল্প সময়েই।
- ঘরোয়া ফেসপ্যাক শুধু মুখে নয়, হাত, গলা ও ঘাড়েও ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে পুরো ত্বকই সমানভাবে উজ্জ্বল দেখায়।
- পার্লারে যদি কোনো ফেসিয়াল বা বিউটি ট্রিটমেন্ট করাতে চান, তাহলে ঈদের অন্তত দুই দিন আগে সেগুলো শেষ করা ভালো। এতে ত্বক স্বাভাবিকভাবে সেট হয়ে যাওয়ার সময় পায়।
-সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পর্যাপ্ত ঘুম। প্রতিদিন ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমালে শরীর ও ত্বক দুটোই সুস্থ থাকে।
ঈদের আগে ত্বক ও চুলের নিয়মিত যত্ন নিলে নিজেকে আরও আত্মবিশ্বাসী, সতেজ ও প্রাণবন্ত মনে হয়। ঘরোয়া উপায়ে সহজ কিছু মাস্ক ব্যবহার, পর্যাপ্ত পানি পান, সুষম খাবার গ্রহণ, নিয়মিত ঘুম এবং সঠিক হেয়ার কেয়ারÑ এই কয়েকটি অভ্যাসই আপনাকে ঈদের দিনে করে তুলতে পারে আরও ঝলমলে ও আকর্ষণীয়। নিজের প্রতি একটু যত্ন আর সচেতনতা থাকলেই উৎসবের দিনে আপনার সৌন্দর্য ফুটে উঠবে স্বাভাবিকভাবেই।