রূপবতী রাজকন্যার মাথায় ছিল দীঘল কেশ। কেশগুলো ছিল টকটকে লাল রঙের। লাল চুলের এই রাজকন্যা গোলাপ ফুল খুব পছন্দ করত এবং ভালোবাসত। তাই সবাই তাকে গোলাপকুমারী নামে ডাকত। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর গোলাপকুমারী প্রাসাদের বারান্দায় এসে দাঁড়াত এবং হাততালি দিত। তার হাততালি শুনে একটা সোনালি পাখি উড়ে এসে তার কাঁধে বসত। তখন গোলাপকুমারীর চুল থেকে লাল আভা বেরিয়ে আকাশে ছড়িয়ে পড়ত। পাখিটার সুরে গোলাপকুমারী সুর মেলাত, সেই সুরের মূর্ছনায় রাজ্যবাসী গভীর ঘুমে ডুবে গিয়ে সুন্দর সুন্দর স্বপ্ন দেখত।
এ খবরটা পৌঁছাল রাজ্যের এক জাদুকরের কানে। শুনে তার মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি এলো। সে এক দিন গোলাপকুমারীর সঙ্গে দেখা করল। তখন গোলাপকুমারী তাকে একটা জাদু দেখাতে বলল। সে সঙ্গে সঙ্গে একটা মন্ত্র আওড়ালÑ ‘আবরা-কাবরা, সিম-সালা-সিম’Ñ সঙ্গে সঙ্গে গোলাপকুমারীর লাল চুল কালো হয়ে গেল।
ওইদিন সন্ধ্যা নামতেই প্রতিদিনের মতো গোলাপকুমারী বারান্দায় এসে দাঁড়াল এবং হাততালি দিল। তা শুনে সোনালি পাখি উড়ে এসে তার কাঁধে বসল। তখন গোলাপকুমারীর চুল থেকে লালের বদলে কালো আভা বেরোল। পাখিটার সুরে গলা মেলাতেই সুরটাও বেশ কর্কশ শোনাল। আর সেই কর্কশ সুরে রাজ্যবাসী ঘুমিয়ে পড়লেও সুন্দর স্বপ্নের বদলে দুঃস্বপ্ন দেখল।
রাজ্যবাসীর দুঃস্বপ্নের কথা শুনে গোলাপকুমারীর মন খারাপ হয়ে গেল। তাই ওইদিন সন্ধ্যায় পাখিটা তার কাঁধে এসে বসতেই গোলাপকুমারী তাকে জিজ্ঞেস করল, আমি কীভাবে রাজ্যবাসীদের আবার সুন্দর স্বপ্ন দেখাতে পারি?
তোমার কালো চুল লাল গোলাপের পাপড়ি মিশানো জল দিয়ে ধুয়ে ফেললে তা লাল হয়ে যাবে, আর রাজ্যবাসীও সুন্দর সুন্দর স্বপ্ন দেখতে পারবে।
পাখির কথামতো গোলাপকুমারী তাই করল। আর তার কালো চুল লাল হয়ে গেল। রাজ্যবাসী আবার সুন্দর স্বপ্ন দেখতে লাগল। ইতোমধ্যে জাদুকরের জাদু যে আর কাজ করছে না, সে খবরটিও তার কানে পৌঁছে গেল। তাই জাদুকর রাগে মন্ত্র দিয়ে রাজ্যের সব গোলাপ গাছ মেরে ফেলল।
গোলাপ ফুলের অভাবে গোলাপকুমারী লাল গোলাপের পাপড়ি মিশানো জল দিয়ে চুল ধুতে পারল না। তখন তার চুল আবার কালো হয়ে গেল। রাজ্যবাসীও আর সুন্দর স্বপ্ন দেখল না। মনের দুঃখে গোলাপকুমারী বারান্দায় দাঁড়িয়ে কাঁদতে লাগল।
এমন সময় পাশের রাজ্যের রাজপুত্র ঘোড়ায় চড়ে ওই পথ দিয়ে যাচ্ছিল, গোলাপকুমারীকে কাঁদতে দেখে সে ঘোড়া থেকে নেমে জিজ্ঞেস করল, তুমি কাঁদছ কেন?
গোলাপকুমারী তাকে সব খুলে বলল।
গোলাপকুমারীর মুখে সব শুনে রাজপুত্র তার কোমরে গোঁজা বাক্স খুলে একটা লাল কেশ নিয়ে গোলাপকুমারীর চোখের পাতায় রাখল। তার চোখের জলে কেশটা ধুয়ে যেতেই তা লাল গোলাপে পরিণত হলো। রাজপুত্র গোলাপটা গোলাপকুমারীর হাতে তুলে দিল।
গোলাপকুমারী লাল গোলাপের পাপড়ি মিশানো জল দিয়ে কেশ ধুতেই তার তা থেকে লাল আভা বের হলো, গোলাপকুমারীর কণ্ঠে বাজল পাখির শেখানো সুরেলা গান, আর রাজ্যবাসীও আবার সুন্দর স্বপ্ন দেখতে লাগল।
এ ঘটনা রাজার কানে যেতেই রাজা রাজপুত্রকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, কেশটা সে কোথায় পেয়েছে?
রাজপুত্র বলল, খুব ছোটবেলায় আমরা দুজন যখন বন্ধু ছিলাম। তখন ওর মাথার এই কেশটা ছিঁড়ে আমার কাছে রেখেছিলাম।
তা শুনে গোলাপকুমারী বলল, হ্যাঁ বাবা, ও ঠিক বলেছে। আমিও ওর মাথার একটা কেশ ছিঁড়ে রেখেছিলামÑ বলেই প্রাসাদের ভেতরে ছুটে গিয়ে একটা ছোট বাক্স নিয়ে এসে রাজার হাতে তুলে দিল। রাজা বাক্সটা খুলে রাজপুত্রের কেশ পেয়ে খুব খুশি হলেন।
তিনি বেশি দেরি না করে পাশের রাজ্যের রাজার সঙ্গে কথা বলে দুজনের বিয়ের আয়োজন করলেন। এক দিন মহাধুমধামে তাদের বিয়েও সম্পন্ন হলো।
বিয়ের পর তারা দুজনে মহাসুখে দিন কাটাতে লাগল।
গোলাপকুমারী সন্ধ্যার পর নিয়ম করে সুরেলা কণ্ঠে গান গাইতে লাগল আর তা শুনে রাজ্যবাসী সুখনিদ্রা যেতে লাগল ও সুন্দর স্বপ্ন দেখতে লাগল।
আর ওদিকে জাদুকরের জাদুমন্ত্র ব্যর্থ হওয়ায় সে রাজ্য ছেড়ে হাওয়া হয়ে গেল।