মো. নাঈম ইসলাম, শেরপুর জেলা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০২৬ ১৬:৩২ পিএম
আপডেট : ১১ মার্চ ২০২৬ ১৬:৩৩ পিএম
চার শতাধিক বছর ধরে বাংলায় ইসলামের প্রচার ও প্রসারের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঘাঘড়া খানবাড়ি জামে মসজিদ। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার হাতিবান্ধা ইউনিয়নের ঘাঘড়া লস্কর এলাকায় অবস্থিত ‘ঘাঘড়া খানবাড়ি জামে মসজিদ’। মোগল আমলে নির্মিত এই ঐতিহাসিক মসজিদটি দীর্ঘ চার শতাধিক বছর ধরে বাংলায় ইসলামের প্রচার ও প্রসারের এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
ইতিহাস ও স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, বাংলা ১২২৮ সনে (ইংরেজি ১৬০৮ সালে) মসজিদটি নির্মিত হয়। কথিত আছে, ‘পালানো খা’ ও ‘জব্বার খা’ নামের দুই সহোদর ভাই কোনো এক রাজ্যের সেনাপতি ছিলেন। কয়েকশ বছর আগে এক যুদ্ধে পরাজয়ের পর তারা বাংলার ঝিনাইগাতী এলাকায় এসে আশ্রয় নেন। পরে এখানেই তারা এই মসজিদটি নির্মাণ করেন।
মসজিদটির নির্মাণশৈলী ও উপকরণেও রয়েছে বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এর ইটগুলো চারকোণা টালির মতো, যা প্রাচীন স্থাপত্যরীতির একটি দৃষ্টান্ত। ইতিহাসবিদদের মতে, প্রায় ছয়-সাতশ বছর আগে এই ধরনের ইটের ব্যবহার দেখা যেত। মসজিদের গাঁথুনিতে ঝিনুকের চূর্ণ বা ঝিনুকের লালা, সুরকি এবং পাট বা তন্তুজাতীয় আঁশ ব্যবহার করা হয়েছে। এক গম্বুজবিশিষ্ট এই মসজিদের নির্মাণ কৌশলে গ্রিক ও কোরিনথিয়ান স্থাপত্যরীতির প্রভাবও লক্ষ্য করা যায়।
বর্গাকৃতির মসজিদটির দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ প্রায় ৩০ ফুট। মসজিদের দেয়ালের পুরুত্ব প্রায় ৪ ফুট এবং গাঁথুনি করা হয়েছে চুন ও সুরকি দিয়ে। মসজিদের ভেতরে দুটি মজবুত খিলান রয়েছে। ওপরের একমাত্র গম্বুজকে ঘিরে রয়েছে ছোট-বড় মিলিয়ে ১২টি মিনার। ভেতরের মেহরাব ও দেয়ালে বিভিন্ন রঙের ফুল ও ফুলদানির কারুকাজ মসজিদটির সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
মসজিদটির দরজায় একসময় কষ্টিপাথরে খোদাই করা আরবি ভাষায় নির্মাণকাল উল্লেখ ছিল। তবে দুঃখজনকভাবে ২০২৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর রাতে সেই ঐতিহাসিক কষ্টিপাথরটি চুরি হয়ে যায়। স্থানীয়দের দাবি, মোগল আমলের ওই খোদাই করা পাথরের মূল্য কোটি টাকারও বেশি হতে পারে। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও পাথরটি উদ্ধার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মসজিদ কমিটি ও স্থানীয় মুসল্লিরা।
মসজিদটি খানবাড়ির খান বংশের লোকজনের ওয়াকফ করা প্রায় ৫৮ শতাংশ জমির ওপর অবস্থিত। এর মধ্যে মূল ভবন ও বারান্দা রয়েছে প্রায় ১৭ শতাংশ জমির ওপর এবং বাকি ৪১ শতাংশ জায়গাজুড়ে রয়েছে কবরস্থান। তবে দীর্ঘদিন সঠিক পরিচর্যার অভাবে মসজিদটির অবস্থা অনেকটা নাজুক হয়ে পড়েছে। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তত্ত্বাবধানে মসজিদটির সংস্কার ও সৌন্দর্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার কাজ চলছে।
মসজিদের ভেতরে ইমাম ছাড়া তিন কাতারে প্রায় ৩০ থেকে ৩২ জন মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন। তবে বাইরে বারান্দায় আরও প্রায় ১০০ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। সব মিলিয়ে প্রায় দেড়শ মুসল্লি একসঙ্গে এখানে নামাজ আদায় করতে সক্ষম।
মসজিদ কমিটির তৎকালীন কোষাধ্যক্ষ মো. নজরুল ইসলাম বলেন, “২০২৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর রাতে মসজিদের দরজায় থাকা ঐতিহাসিক কষ্টিপাথরটি চুরি হয়ে যায়। পরদিন আমরা বিষয়টি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগকে জানাই। পরে ময়মনসিংহ থেকে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ফিল্ড অফিসার সাবিনা ইয়াসমিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ঝিনাইগাতী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। কিন্তু এরপর আর কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। আমরা প্রশাসনের কাছে দ্রুত পাথরটি উদ্ধারের দাবি জানাচ্ছি”।
মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. ফেরদৌস খান বলেন, “প্রায় সাড়ে চারশ বছর আগে নির্মিত এই মসজিদটি আমাদের বংশপরম্পরায় দেখভাল করা হচ্ছে। এখানে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় হয়। ইমাম ও মুয়াজ্জিন রয়েছেন। মসজিদের নামে দুটি পুকুর রয়েছে, যার আয় দিয়ে বিভিন্ন খরচ বহন করা হয়। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এই ঐতিহাসিক মসজিদটি দেখতে আসেন। কিন্তু প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সংস্কারের সময় ভেতরের পুরোনো রঙ মুছে সাদা রঙ করা হয়েছে, ফলে আগের সৌন্দর্য অনেকটাই হারিয়েছে”।
ভয়েজ অব ঝিনাইগাতীর আহ্বায়ক জাহিদুল হক মনির বলেন, “দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ভ্রমণপিপাসু ও মুসল্লিরা প্রায় ৪১৮ বছরের পুরোনো এই মসজিদটি দেখতে আসেন। কিন্তু এখানে তথ্য সংরক্ষণের জন্য কোনো সংগ্রহশালা নেই। চুরি হওয়া পাথরটিও এখনও উদ্ধার হয়নি। তাই মসজিদের উন্নয়ন ও সংরক্ষণে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন”।
এ বিষয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশন শেরপুরের উপপরিচালক এস এম মোহাই মোনুল ইসলাম বলেন, “শেরপুরের ঐতিহাসিক ইসলামিক নিদর্শনগুলোর মধ্যে খানবাড়ি জামে মসজিদ অন্যতম। এখানে বহু পর্যটক ও গবেষক আসেন। কিন্তু তথ্য সংগ্রহের জন্য কোনো সংগ্রহশালা নেই। স্থানীয়দের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মসজিদটির সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য পর্যটন কর্পোরেশন ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে”।
শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়েও ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ঘাঘড়া খানবাড়ি জামে মসজিদ শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, বরং বাংলার ইসলামি ইতিহাস ও স্থাপত্য ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। যথাযথ সংরক্ষণ ও পরিচর্যা পেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও এই ঐতিহ্য অম্লান হয়ে থাকবে।